ভাষা ও রাজনীতি— কী শেখাচ্ছেন এই প্রজন্মকে?

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৮: ২০
মেহের আফরোজ শাওন (বাঁয়ে) ও সেলিম রেজা নিউটন (ডানে)। ছবি: কোলাজ

রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু জনপরিসরের ভাষা কি ঘৃণা, যৌন ইঙ্গিত ও অপমানের অভিধানে পরিণত হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে ভাষার নৈতিকতা, নতুন প্রজন্মের শিক্ষা ও সভ্য বিতর্কের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

একটি জাতির সভ্যতা শুধু তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা আকাশচুম্বী ভবনে নয়; তার মানুষের ভাষায়ও প্রতিফলিত হয়। এই কথাটি কেবল সাহিত্যিক অলংকার নয়, সমাজবিজ্ঞানেরও একটি মৌলিক সত্য। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের শিক্ষা-সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও অন্যের প্রতি সম্মানবোধের পরিচয় বহন করে। তাই একটি সমাজের ভাষা যত সংযত ও মানবিক হয়, সেই সমাজও তত বেশি সহনশীল হয়ে ওঠে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন এক প্রবণতা চোখে পড়ছে। রাজনৈতিক মতভেদ, সামাজিক বিতর্ক কিংবা ব্যক্তিগত সমালোচনা— সব ক্ষেত্রেই যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ, নারীবিদ্বেষী উপমা ও অশালীন ভাষার ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো— এই ভাষা কেবল বেনামি অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পী, শিক্ষক, লেখক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও জনপ্রিয় অনলাইন ব্যক্তিত্বদের মধ্যেও এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে কী ধরনের ভাষা ও সংস্কৃতির উদাহরণ রেখে যাচ্ছি?

চব্বিশের জুলাই আন্দোলন ঘিরে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত কিছু শব্দ ও বক্তব্য ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শব্দগুলোর অর্থ জানার পর অনেকেই বিস্মিত, বিব্রত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আলোচনায় এসেছে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটনের কিছু বক্তব্য। তাদের বক্তব্য বড় একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে— জনপরিসরে আমরা কী ধরনের ভাষাকে স্বাভাবিক করে তুলছি?

গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিরোধিতা বা মতের পার্থক্য প্রকাশ করতে গিয়ে যদি ধর্ষণ, নারীর শরীর বা যৌন সহিংসতাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি পক্ষকে আঘাত করে না; বরং পুরো সমাজের ভাষাকে দূষিত করে।

এমন ভাষা নারীর প্রতি সহিংসতাকে তুচ্ছ করে এবং একটি অপরাধকে রাজনৈতিক বিদ্রূপের উপাদানে পরিণত করে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী— যাকে কেউ ফ‍্যাসিস্ট, কেউ রক্তপিপাসু, কেউ কেউ স্বৈরাচারসহ নানা বিশেষণ দেন— তাকে নিয়ে সেলিম রেজা নিউটন যে পোস্ট দিলেন তা একজন অধ‍্যাপক দিতে পারেন না। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় শত্রুও এমন শব্দ উচ্চারণ করবেন না। আবার যে আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের বেনিফিশিয়ারিরা ছাড়া বাকি সবাই কমবেশি একাত্ম হয়েছিলেন, সেই আন্দোলন নিয়েও মেহের আফরোজ শাওনের মতো একজন শিল্পী ও সংস্কৃতি কর্মীর বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্য মনে করার কারণ নেই।

অথচ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্য আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়। কাজী নজরুল ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কলমকে বিদ্রোহের অস্ত্র বানিয়েছেন, কিন্তু কখনো অশ্লীলতাকে প্রতিবাদের ভাষা করেননি। বিশ্ব ইতিহাসেও নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা মহাত্মা গান্ধীর মতো নেতাদের ভাষা আমাদের শেখায়— প্রতিপক্ষকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা যায়, কিন্তু মানুষের মর্যাদাকে আঘাত না করেও তা সম্ভব।

বাংলাদেশের ইতিহাসও আত্মত্যাগের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বিভিন্ন গণআন্দোলন— প্রতিটি অধ্যায়ে অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে। একজন মায়ের কাছে সন্তান কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের নয়, সে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিস কিংবা শিশু রিয়া গোপের পরিবারের বেদনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের আড়ালে থাকে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত শোকের ইতিহাস। সেই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা বা ব‍্যর্থতা নিয়ে নানা সমালোচনা আছে, আরও হতে পারে। কিন্তু সেই আন্দোলনকে এভাবে অশ্লীল এবং উচ্চারণ অযোগ‍্য শব্দে বন্দী করা যায় না।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলি নিয়েও রাজনৈতিক মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে। ইতিহাস একদিন তার নিজস্ব মূল্যায়ন করবে। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য— সেই সময় বহু পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে, বহু মানুষ আহত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষের জীবনে অকারণে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। তাই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন ভাষা ব্যবহার, যা শোককে আঘাত করে বা যৌন সহিংসতার ইঙ্গিত বহন করে, কোনোভাবেই সুস্থ জনপরিসরের লক্ষণ হতে পারে না।

মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার সোশ‍্যাল লার্নিং থিওরি বলছে, শিশু ও কিশোররা কেবল উপদেশ শুনে নয়, বড়দের আচরণ অনুকরণ করেও শেখে। যাদের তারা অনুসরণ করে, তাদের ভাষা ও আচরণও অজান্তেই গ্রহণ করে। তাই শিক্ষক, শিল্পী, সাংবাদিক, রাজনীতিক কিংবা জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রতিটি শব্দের সামাজিক দায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি যুক্তিবোধ ও সহনশীলতারও শিক্ষক। একইভাবে একজন শিল্পী শুধু বিনোদন দেন না, তিনি সামাজিক সংস্কৃতিরও অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম প্রায়ই উত্তেজনাপূর্ণ ভাষাকে বেশি ছড়িয়ে দেয়। ফলে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, শালীনতার চেয়ে বিতর্কই জনপ্রিয়তার সহজ পথ। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ভাইরাল পোস্ট নয়, দায়িত্বশীল ভাষাকেই মনে রাখে।

আজ আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখা দরকার— আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে রাজনৈতিক বিতর্ক মানেই হবে ব্যক্তিগত অপমান, গালাগাল কিংবা নারীর শরীরকে অবমাননার উপমা? নাকি আমরা এমন একটি জনপরিসর চাই, যেখানে কঠোর সমালোচনাও হবে তথ্য, যুক্তি ও শালীন ভাষায়?

মতের পার্থক্য থাকবে, তর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে— এগুলোই গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি শালীনতার সীমা অতিক্রম করে, তবে একজন ব্যক্তি কেবল নন, আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং আগামী প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সভ্যতা কেবল আইন দিয়ে গড়ে ওঠে না, গড়ে ওঠে ভাষা-সংস্কৃতি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ দিয়ে। তাই আজ প্রয়োজন কোনো ব্যক্তি, দল বা আন্দোলনকে হেয় করা নয়; বরং ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা। কারণ আমরা আজ যে ভাষা ব্যবহার করছি, আগামী প্রজন্ম সেই ভাষাতেই তাদের সমাজ নির্মাণ করবে।

প্রশ্নটি তাই কেবল একটি বা দুটি শব্দের নয়, প্রশ্নটি আমাদের মূল্যবোধের। আমরা আমাদের সন্তানদের কী শিখিয়ে যেতে চাই— যুক্তির ভাষা, নাকি ঘৃণার ভাষা? উত্তরটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্বের মধ্যেই নিহিত।

লেখক: সাংবাদিক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বই কেনা নয়, পড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে

বই আমাদের জীবনের কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঘরের সাজসজ্জার অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বইকে এমন এক ধরনের ‘সামাজিক আসবাব’ হিসেবেও ব্যবহার করেন, যা ঘরের রুচি ও সামাজিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। হকিংয়ের বই নিয়ে পুরোনো এক প্রতিবেদনে প্রকাশকরাই এমন বইকে ‘সোশ্যাল ফার্নিচার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

৪ দিন আগে

ভূমিকম্পের পরে উদ্ধার নয়, বিপর্যয়ের আগেই জীবন বাঁচাতে হবে

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন— বড় ভূমিকম্পে ঢাকার বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো কঠিন হবে, কোথাও কোথাও উদ্ধার অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তার এ বক্তব্যকে একটি সংস্থার সীমাবদ

৫ দিন আগে

জ্বালানি সংকট: সাময়িক সমাধানের চেয়ে প্রয়োজন আরও বেশি কিছু

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি মিলেই বারবার এই সংকট তৈরি করছে।

৬ দিন আগে

শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির বাণিজ্যের পথ যেন সুগম না হয়

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার বিকল্প নেই। এনটিআরসিএ’র বিদ্যমান কাঠামোর কোনো দুর্বলতা থাকলে তা পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই প্রক্রিয়াকে পেছনে ঠেলে দিয়ে আবার ব্যক্তি বা কমিটির দুর্নীতির সুযোগ করে

৬ দিন আগে