
এ কে এম মাহফুজুর রহমান

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা পুরো জাতিকে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতন কিংবা কিশোরী ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই অপরাধের শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু ও কিশোরীরা। সম্প্রতি ঢাকায় ছোট্ট শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর আর্তনাদ আজ জাতির বিবেককে প্রশ্ন করছে— এই সমাজে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম সহিংসতা। একটি শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন শুধু তার শরীর নয়, তার মানসিক জগৎ, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্নও ধ্বংস হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশু বয়সে যৌন সহিংসতার শিকার হলে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা, ভয়, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারে না। তাই এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শত শত নারী ও শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্যতম বড় শিকার মেয়েশিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি; কারণ সামাজিক ভয়, লজ্জা, পারিবারিক চাপ এবং বিচারহীনতার আশঙ্কায় বহু পরিবার অভিযোগ পর্যন্ত করে না।
রামিসার ঘটনাটি আমাদের বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতাকে আবারও নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজধানী ঢাকার মতো একটি শহরে যদি একটি শিশু নিরাপদ না থাকে, তবে গ্রামের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নাজুক, তা সহজেই অনুমান করা যায়। রামিসার পরিবার আজ শুধু একটি শিশুকে হারায়নি; তারা হারিয়েছে স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার সাহস। অথচ বহু ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যান। এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন হত্যা, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে তনু হত্যা, নুসরাত জাহান রাফির নৃশংস হত্যাকাণ্ড কিংবা সাম্প্রতিক শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলো মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। প্রতিবারই মানুষ রাস্তায় নেমেছে, বিচার দাবি করেছে; কিন্তু দীর্ঘসূত্রিতা ও বিচারহীনতার কারণে অপরাধীরা বারবার সাহস পেয়েছে।
সমাজের একটি বড় অংশ এখন মনে করে, শিশু ধর্ষণ ও নির্মম যৌন সহিংসতার মতো অপরাধে আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রকাশ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা উচিত। যুক্তি হলো, অপরাধীরা দেখবে এমন অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর ও লজ্জাজনক, তখন অন্যরা ভয় পাবে এবং অপরাধ কমে আসবে। বিশ্বের কিছু দেশে কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার কারণে যৌন অপরাধ তুলনামূলকভাবে কম বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া এবং কিছু এশীয় দেশে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর দণ্ডবিধি কার্যকর রয়েছে। কোথাও দীর্ঘ কারাদণ্ড, কোথাও রাসায়নিক শাস্তি, আবার কোথাও দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির রয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, বিচার অবশ্যই আদালত ও আইনের মাধ্যমেই হতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতিশোধ নয়, বরং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জায়গা। কারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। তাই প্রয়োজন দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাক্ষী সুরক্ষা এবং দ্রুত রায় কার্যকর করা।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে বিচার প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘ হয়ে যায়। বহু মামলায় বছরের পর বছর কেটে যায়। সাক্ষীরা ভয় পান, প্রমাণ নষ্ট হয়, ভুক্তভোগীর পরিবার হুমকির মুখে পড়ে। অনেক সময় তদন্তে গাফিলতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মামলার গতি থেমে যায়। এর ফলে অপরাধীরা সাহস পায় এবং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। তাই শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না; সেই আইন বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু নির্যাতনের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বিকৃত মানসিকতা নয়, সামাজিক অবক্ষয়ও দায়ী। পর্নোগ্রাফির অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, নারীর প্রতি অসম্মান, নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক দায়িত্বহীনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট— সব মিলিয়ে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। পরিবারে ছেলেশিশুকে ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি সম্মান, মানবিকতা ও নৈতিক আচরণ শেখাতে হবে। স্কুলে নিরাপত্তা শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে।
নারী ও শিশু সুরক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, দ্রুত পুলিশি সাড়া, নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র বৃদ্ধি, অনলাইন যৌন অপরাধ পর্যবেক্ষণ এবং শিশু সুরক্ষা হটলাইন কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য মানসিক চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।
আজ দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ, কারণ তারা বারবার একই ধরনের ঘটনা দেখছে। ইয়াসমিন, তনু, নুসরাত, রামিসা— নামগুলো বদলাচ্ছে, কিন্তু অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে না। প্রতিবারই মানুষ রাস্তায় নামেন, প্রতিবাদ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল হয়; কিন্তু কিছুদিন পর সব আবার নীরব হয়ে যায়। এই নীরবতাই অপরাধীদের সাহস জোগায়।
আমাদের সমাজে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব— সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক ইস্যু নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ কিংবা ক্ষমতার প্রভাবে রক্ষা না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রকে এখন ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। আদালতের রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি থানায় শিশু-বান্ধব অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। স্কুল, মাদরাসা ও কোচিং সেন্টারগুলোতেও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো, সেখানে নারী ও শিশুরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। যদি একটি শিশুও নিরাপদ না থাকে, তবে উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কোনো মূল্য নেই। আজ রামিসার কান্না সমগ্র বাংলাদেশের কান্না। এই কান্না থামাতে হলে কঠোর আইন, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ— সবকিছু এক সঙ্গে প্রয়োজন।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কোনো শিশুকে আর ধর্ষণের শিকার হতে হবে না, কোনো মা তার সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে বিচার চাইবে না, এবং কোনো অপরাধী আইনের ফাঁক গলে পালিয়ে যেতে পারবে না। মানবতার স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই সময় কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে রামিসার পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা প্রদান এবং দোষীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘোষণা দিয়ে এক বিরল মানবিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই উদ্যোগ শুধু শোকাহত পরিবারকেই সাহস জোগায়নি, বরং পুরো জাতির মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বাংলাদেশের মানুষ আজ বিশ্বাস করতে চায়, এখান থেকেই শুরু হবে একটি নতুন দৃষ্টান্তের বাংলাদেশ, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র থাকবে কঠোর, মানবিক এবং আপসহীন। যেখানে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা ক্ষমতার প্রভাবে পার পাবে না; বরং দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন এবং মানবতার মর্যাদা।
লেখক: কলামিস্ট; সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি এবং ডেপুটি ডিরেক্টর-ফ্যাকাল্টি এইচআর, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা পুরো জাতিকে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতন কিংবা কিশোরী ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই অপরাধের শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু ও কিশোরীরা। সম্প্রতি ঢাকায় ছোট্ট শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর আর্তনাদ আজ জাতির বিবেককে প্রশ্ন করছে— এই সমাজে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম সহিংসতা। একটি শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন শুধু তার শরীর নয়, তার মানসিক জগৎ, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্নও ধ্বংস হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশু বয়সে যৌন সহিংসতার শিকার হলে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা, ভয়, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারে না। তাই এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শত শত নারী ও শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্যতম বড় শিকার মেয়েশিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি; কারণ সামাজিক ভয়, লজ্জা, পারিবারিক চাপ এবং বিচারহীনতার আশঙ্কায় বহু পরিবার অভিযোগ পর্যন্ত করে না।
রামিসার ঘটনাটি আমাদের বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতাকে আবারও নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজধানী ঢাকার মতো একটি শহরে যদি একটি শিশু নিরাপদ না থাকে, তবে গ্রামের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নাজুক, তা সহজেই অনুমান করা যায়। রামিসার পরিবার আজ শুধু একটি শিশুকে হারায়নি; তারা হারিয়েছে স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার সাহস। অথচ বহু ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যান। এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন হত্যা, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে তনু হত্যা, নুসরাত জাহান রাফির নৃশংস হত্যাকাণ্ড কিংবা সাম্প্রতিক শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলো মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। প্রতিবারই মানুষ রাস্তায় নেমেছে, বিচার দাবি করেছে; কিন্তু দীর্ঘসূত্রিতা ও বিচারহীনতার কারণে অপরাধীরা বারবার সাহস পেয়েছে।
সমাজের একটি বড় অংশ এখন মনে করে, শিশু ধর্ষণ ও নির্মম যৌন সহিংসতার মতো অপরাধে আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রকাশ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা উচিত। যুক্তি হলো, অপরাধীরা দেখবে এমন অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর ও লজ্জাজনক, তখন অন্যরা ভয় পাবে এবং অপরাধ কমে আসবে। বিশ্বের কিছু দেশে কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার কারণে যৌন অপরাধ তুলনামূলকভাবে কম বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া এবং কিছু এশীয় দেশে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর দণ্ডবিধি কার্যকর রয়েছে। কোথাও দীর্ঘ কারাদণ্ড, কোথাও রাসায়নিক শাস্তি, আবার কোথাও দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির রয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, বিচার অবশ্যই আদালত ও আইনের মাধ্যমেই হতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতিশোধ নয়, বরং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জায়গা। কারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। তাই প্রয়োজন দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাক্ষী সুরক্ষা এবং দ্রুত রায় কার্যকর করা।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে বিচার প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘ হয়ে যায়। বহু মামলায় বছরের পর বছর কেটে যায়। সাক্ষীরা ভয় পান, প্রমাণ নষ্ট হয়, ভুক্তভোগীর পরিবার হুমকির মুখে পড়ে। অনেক সময় তদন্তে গাফিলতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মামলার গতি থেমে যায়। এর ফলে অপরাধীরা সাহস পায় এবং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। তাই শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না; সেই আইন বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু নির্যাতনের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বিকৃত মানসিকতা নয়, সামাজিক অবক্ষয়ও দায়ী। পর্নোগ্রাফির অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, নারীর প্রতি অসম্মান, নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক দায়িত্বহীনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট— সব মিলিয়ে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। পরিবারে ছেলেশিশুকে ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি সম্মান, মানবিকতা ও নৈতিক আচরণ শেখাতে হবে। স্কুলে নিরাপত্তা শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে।
নারী ও শিশু সুরক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, দ্রুত পুলিশি সাড়া, নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র বৃদ্ধি, অনলাইন যৌন অপরাধ পর্যবেক্ষণ এবং শিশু সুরক্ষা হটলাইন কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য মানসিক চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।
আজ দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ, কারণ তারা বারবার একই ধরনের ঘটনা দেখছে। ইয়াসমিন, তনু, নুসরাত, রামিসা— নামগুলো বদলাচ্ছে, কিন্তু অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে না। প্রতিবারই মানুষ রাস্তায় নামেন, প্রতিবাদ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল হয়; কিন্তু কিছুদিন পর সব আবার নীরব হয়ে যায়। এই নীরবতাই অপরাধীদের সাহস জোগায়।
আমাদের সমাজে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব— সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক ইস্যু নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ কিংবা ক্ষমতার প্রভাবে রক্ষা না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রকে এখন ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। আদালতের রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি থানায় শিশু-বান্ধব অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। স্কুল, মাদরাসা ও কোচিং সেন্টারগুলোতেও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো, সেখানে নারী ও শিশুরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। যদি একটি শিশুও নিরাপদ না থাকে, তবে উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কোনো মূল্য নেই। আজ রামিসার কান্না সমগ্র বাংলাদেশের কান্না। এই কান্না থামাতে হলে কঠোর আইন, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ— সবকিছু এক সঙ্গে প্রয়োজন।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কোনো শিশুকে আর ধর্ষণের শিকার হতে হবে না, কোনো মা তার সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে বিচার চাইবে না, এবং কোনো অপরাধী আইনের ফাঁক গলে পালিয়ে যেতে পারবে না। মানবতার স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই সময় কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে রামিসার পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা প্রদান এবং দোষীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘোষণা দিয়ে এক বিরল মানবিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই উদ্যোগ শুধু শোকাহত পরিবারকেই সাহস জোগায়নি, বরং পুরো জাতির মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বাংলাদেশের মানুষ আজ বিশ্বাস করতে চায়, এখান থেকেই শুরু হবে একটি নতুন দৃষ্টান্তের বাংলাদেশ, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র থাকবে কঠোর, মানবিক এবং আপসহীন। যেখানে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা ক্ষমতার প্রভাবে পার পাবে না; বরং দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন এবং মানবতার মর্যাদা।
লেখক: কলামিস্ট; সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি এবং ডেপুটি ডিরেক্টর-ফ্যাকাল্টি এইচআর, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
৯ দিন আগে
প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ
১১ দিন আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১১ দিন আগে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।
১২ দিন আগে