বিজয়ের ৪৮ ঘণ্টা আগে যেভাবে ‘মগজশূন্য’ করা হয় জাতিকে

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০: ৩৭
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আল-বদর, আল-শামসরা বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। ছবি সংগৃহীত

আজ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ৫৪ বছর আগে ঠিক এই দিনটিতেই ঢাকার বুকে নেমে এসেছিল এক গাঢ় অন্ধকার। যখন দেশের মানুষ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে, যখন জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার দ্বিধায় ভুগছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই পর্দার আড়ালে ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য এক হত্যাযজ্ঞ।

পাকিস্তানি জেনারেলরা বুঝতে পেরেছিলেন যে মানচিত্রের দখল তারা হারাচ্ছেন, তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয়— এই মানচিত্র স্বাধীন হলেও যেন তা দাঁড়াতে না পারে। সেই নীলনকশা বাস্তবায়নে বেছে বেছে হত্যা করা হয় জাতির বিবেক ও মস্তিষ্করূপী শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে, বধ্যভূমি রয়েরবাজার আর মিরপুরে রচিত হয় এক মেধা-গণহত্যার উপাখ্যান, যার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ।

একাত্তরের ডিসেম্বরের শুরু থেকেই যখন রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে আসছিল, তখনই গভর্নর হাউসের অন্দরমহলে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এক ভয়ংকর নীলনকশা চূড়ান্ত করেন। তাঁর ডায়েরিতেই পাওয়া যায় সেই মৃত্যু-তালিকা, যেখানে লেখা ছিল দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের নাম।

পাকিস্তানি বাহিনী নিশ্চিত ছিল যে তাদের সময় শেষ, তাই তারা নিজেরা সরাসরি মাঠে না নেমে ব্যবহার করে তাদের এদেশীয় দোসর— রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীকে। ১৪ ডিসেম্বর সকাল থেকেই কারফিউর সুযোগ নিয়ে ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে কাদালেপা মাইক্রোবাস এবং জিপের বহর। এই গাড়িগুলোর ভেতরে ছিল যমদূতসম ঘাতকরা, আর তাদের হাতে ছিল সেই তালিকা।

তারা বাসা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী-সহ শত শত বুদ্ধিজীবীকে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে, যা ছিল আল-বদরদের প্রধান নির্যাতন কেন্দ্র বা টর্চার সেল।

এই হত্যাযজ্ঞে যারা জল্লাদের ভূমিকা পালন করেছিল, তারা কেউ ভিনগ্রহের প্রাণী ছিল না; তারা ছিল এই মাটিরই সন্তান, এমনকি নিহতদের অনেকের ছাত্র বা পরিচিতজন। এই পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দেওয়া কুখ্যাত দুই ঘাতকের নাম ইতিহাসের পাতায় ঘৃণার সঙ্গে লেখা রয়েছে, চৌধুরী মঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খান।

আল-বদর বাহিনীর ‘অপারেশন ইনচার্জ’ চৌধুরী মঈনুদ্দীন ছিল এই অপহরণ ও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন। অন্যদিকে ‘চিফ এক্সিকিউশনার’ বা প্রধান জল্লাদ আশরাফুজ্জামান খান নিজে গাড়িতে করে গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের তুলে আনত এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করত।

স্বাধীনতার পর তার ডায়েরি থেকে পাওয়া গিয়েছিল সেই তালিকা, যেখানে ২০ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও চিকিৎসকের নাম ছিল। আরও এক জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতার নাম মাওলানা মান্নান। ডা. আলীম চৌধুরী, যিনি একাত্তরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে চিকিৎসা দিতেন, তাকে তার নিজের বাসা থেকেই ধরিয়ে দিয়েছিল এই মান্নান। অথচ যুদ্ধের সময় ডা. আলীম চৌধুরী এই মান্নানকেই তার বাসায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে মান্নান সেদিন আল-বদরদের হাতে তুলে দিয়েছিল তার আশ্রয়দাতাকে।

মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে আটকে রাখা বুদ্ধিজীবীদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমির সন্ধান মেলে, তখন স্বজনরা সেখানে গিয়ে থমকে যান। ডা. ফজলে রাব্বীর বুক চিরে ফেলা হয়েছিল, যেন তার হৃৎপিণ্ডটা উপড়ে নিতে চেয়েছিল ঘাতকরা।

প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরীর চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছিল, যিনি মানুষকে দৃষ্টি দিতেন, তাকেই অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর লাশ এতটাই বিকৃত ছিল যে, তা শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে যখন পাওয়া যায়, তখন দেখা যায় বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। অনেকের আঙুল কেটে ফেলা হয়েছিল, যাতে তারা আর কোনোদিন লিখতে না পারেন। এই নৃশংসতা প্রমাণ করে যে, ঘাতকরা কেবল মানুষ মারতে চায়নি, তারা চেয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার মূলে আঘাত করতে।

আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো প্রযুক্তির উৎকর্ষে অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু ১৪ ডিসেম্বরের সেই শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। মুনীর চৌধুরীর নাটক, জহির রায়হানের চলচ্চিত্র কিংবা শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাসের যে ধারাটি স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তা আর আগের গতিতে ফিরে আসেনি। চৌধুরী মঈনুদ্দীন বা আশরাফুজ্জামানের মতো ঘাতকরা বিচার এড়িয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকলেও, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তারা চিরকাল ঘৃণিত খুনি হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে। ১৪ ডিসেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা বা ভূখণ্ড পাওয়ার নাম নয়; স্বাধীনতা মানে সেই মেধা ও মননের মুক্তি, যার জন্য জীবন দিয়েছিলেন আমাদের সূর্যসন্তানরা। রায়েরবাজারের স্মৃতিসৌধের ইটগুলো আজ ৫৪ বছর পরও সেই নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করছে।

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

৭৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার ‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এ পাকিস্তান

আনিকা মেরাজ শুধু সৌন্দর্যেই নয়, মেধার দিক থেকেও অনন্য। তিনি ব্যবসায় প্রশাসন (বিবিএ) এবং অর্থনীতিতে সফলতার সাথে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি অডিটিং এবং অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করছেন। পেশাদার ক্যারিয়ারে একজন রাষ্ট্রীয় অনুমোদিত পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার স্ব

১৩ দিন আগে

‘জুরাসিক পার্ক’ তারকা স্যাম নিল মারা গেছেন

১৯৯৩ সাল ছিল স্যাম নিলের জন্য দারুণ একটি বছর। সে বছরই মুক্তি পায় ‘দ্য পিয়ানো’, যেখানে অন্যতম চরিত্রে ছিলেন স্যাম। এ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পায়। ওই বছরই মুক্তি পায় স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘জুরাসিক পার্ক’। এ সিনেমার ড. অ্যালান গ্র্যান্ট চরিত্রটি বিশ্ব জুড়ে ব্যা

১৭ দিন আগে

মিসরে মরুর বুকে লুকিয়ে ছিল ১৬০০ বছরের পুরোনো বাইজান্টাইন যুগের শহর

মিসরের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব মন্ত্রণালয় বলছে, নতুন এই আবিষ্কারগুলো শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং বাইজান্টাইন শাসনামলে মিসরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, ধর্মীয় চর্চা এবং নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আনবে।

০৫ জুলাই ২০২৬

বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ পপ তারকা টেলর সুইফট ও এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসি

মার্কিন পপ তারকা টেলর সুইফট ও এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাঁকজমকপূর্ণ এক আয়োজনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বহুল আলোচিত এই বিয়েকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাজকীয় বিয়ে’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

০৫ জুলাই ২০২৬