বারান্দার ঘুঘু: এক শহুরে সংসারের নীরব অতিথি

শাহরিয়ার শরীফ
খড়কুটো জড়ো করে বারান্দায় বাসা বানিয়েছিল এক জোড়া ঘুঘু।

ঘুঘু আর ফাঁদ দুই ভাই। কী একটা কাজে দুই ভাইয়ের লাগল মারামারি। ফাঁদ রাগিয়া বলিল, ‘তুই ঘুঘু দেখিয়াছিস, কিন্তু ফাঁদ দেখিস নাই।’

শৈশবে পড়া সেই গল্পটি এখনও মনে আছে। বাংলা ভাষায় ঘুঘুকে নিয়ে আরও কত প্রবাদ— ‘ভিটেয় ঘুঘু চড়ানো’, ‘ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখোনি’। কখনও চালাকির, কখনও অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে ঘুঘুর নাম উচ্চারিত হয়েছে। অথচ বাস্তবের ঘুঘু একেবারেই অন্য রকম। নিরীহ, শান্ত, নির্জনতা-প্রিয় এই পাখিটি মানুষের কোলাহল এড়িয়ে চলে। তার একটানা করুণ সুরের ডাক শুনলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের ভাষায় ধীরলয়ের কোনো গান গেয়ে চলেছে।

ঢাকার মতো দ্রুত বদলে যাওয়া, প্রায় বৃক্ষহীন নগরে এক জোড়া তিলা ঘুঘু এসে আশ্রয় নিল আমাদের ফ্ল্যাটের বারান্দায়। কখনও গ্রিলের ওপর, কখনও টবে লাগানো গাছের ডালে বসে তারা ডাকত। সেই ডাক শুনে কখনও গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ত, কখনও আবার শহরের ব্যস্ততার মাঝেও অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করতাম।

অবশ্য প্রতিটি ভোর এমন প্রশান্ত ছিল না। গ্রীন রোডের ব্যস্ত সড়কের পাশে বাসা হওয়ায় দিনের শুরুই হয় অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, বাস-ট্রাকের হর্ন আর ছুটে চলা শহরের শব্দে। তার ওপর বিছানা থেকে কয়েক হাত দূরে বসে একটানা ঘুঘুর ডাক। একদিন বিরক্ত হয়ে কাচের জানালায় টোকা দিয়ে বলে ফেললাম, ‘এবার একটু থামো রে বাবা।’

ঘুঘুটি সঙ্গে সঙ্গে উড়ে গেল।

মুহূর্তের মধ্যেই নিজের ওপর রাগ হলো। ও তো তার স্বভাবসিদ্ধ কাজটাই করছিল। পরদিন সকালে স্ত্রী বলল, ‘তোমার বকা খেয়ে ঘুঘু কিন্তু আর ডাকেনি।’

কথাটা শুনে মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। পরে দেখলাম, ও আসে, যায়, কিন্তু আগের মতো আর ডাকে না। মনে হলো, মানুষ আর পাখির মাঝেও হয়তো এক ধরনের অভিমান জন্মায়।

ঘুঘুর ডাক শুনলেই আমার মনে পড়ে যায় বাগেরহাটের সাতশৈয়া গ্রামের বাড়ি। অলস দুপুর, বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা বাতাস, ফলের বাগান আর দূরে কোথাও একটানা ঘুঘুর ডাক— গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা দৃশ্য যেন আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছোটবেলায় নিজে কখনও ঘুঘু শিকার করিনি, তবে শিকারিদের পেছনে পেছনে ঘুরেছি। আমাদের গ্রামের সামাদ দাদা একটি পোষা ঘুঘু দিয়ে খাঁচা পেতে বুনো ঘুঘু ধরতেন। তখন সেটি দেখে বিস্মিত হতাম, আনন্দও পেতাম। আজ এত বছর পরে মনে হয়, সেই আনন্দের ভেতরেও এক ধরনের নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে ছিল। পাখির জন্য খাঁচা নয়, আকাশই সবচেয়ে উপযুক্ত ঠিকানা।

আমাদের বারান্দার অতিথি তিলা ঘুঘু। ইংরেজিতে যার নাম Spotted Dove। বৈজ্ঞানিক নাম Spilopelia chinensis। বাদামি রঙের শরীর, ডানায় ছিট কাপড়ের মতো নকশা আর ঘাড়ের দুপাশে কালো পটভূমির ওপর সাদা ফোঁটার মালা— এই সৌন্দর্যের জন্য অনেক এলাকায় একে ছিটা ঘুঘুও বলা হয়। বাংলাদেশে রাজঘুঘু, লাল ঘুঘু, সবুজ ঘুঘুসহ আরও কয়েকটি প্রজাতি থাকলেও তিলা ঘুঘুই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

পাখিবিদদের মতে, ঘুঘুরা সাধারণত দীর্ঘদিন একই সঙ্গীর সঙ্গে থাকে। বাবা-মা দুজনই ডিমে তা দেয়, ছানাদের খাওয়ায় এবং উড়তে শেখায়। তাদের বাসা খুবই সাধারণ— কয়েকটি শুকনো ডালপালা দিয়ে বানানো একটি অগভীর মঞ্চ। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, বুঝি যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে। অথচ সেই সরল বাসাতেই জন্ম নেয় নতুন জীবন।

একদিন দেখি, বারান্দার এসির অ্যাঙ্গেলের পাশে খড়কুটো দিয়ে বাসা প্রায় তৈরি। এত খোলা জায়গায় বাসা দেখে মনে হলো, একটি মাটির পাতিল ঝুলিয়ে দিলে হয়তো নিরাপদ হবে। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা মনে পড়ল। হাতিরপুলের বাসায় একবার চড়ুইয়ের জন্য এমন পাতিল ঝুলিয়েও কোনো লাভ হয়নি। পাখিরা মানুষের পরিকল্পনা নয়, নিজেদের পছন্দমতো জায়গাই বেছে নেয়।

কিছুদিন পর বাসায় ঢুকে খবর পেলাম, ঘুঘু ডিম পেড়েছে। সেদিনই সিদ্ধান্ত হলো, সামনের বারান্দায় আর কাপড় শুকানো হবে না। গৃহপরিচারিকাকেও বলে দেওয়া হলো, ওদের যেন বিরক্ত না করা হয়। ধীরে ধীরে বারান্দাটি যেন আমাদের নয়, ঘুঘু পরিবারের হয়ে গেল। আমরা অন্য বারান্দা ব্যবহার করতে শুরু করলাম।

তারপরও একটি ডিম বাসা থেকে পড়ে ভেঙে গেছে। কষ্ট পেলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো আর একটি ছানাই পৃথিবীর আলো দেখবে। কিন্তু প্রকৃতি আবারও বিস্মিত করল। দুই সপ্তাহ পর দেখা গেল, বাসায় দুটি ছোট্ট ছানা। অর্থাৎ ঘুঘু তিনটি ডিম পেড়েছিল। একটি নষ্ট হলেও বাকি দুটি ফুটেছে।

এরপর প্রতিদিনই মনে হতো, ছানা দুটি যেন চোখের সামনেই বড় হয়ে উঠছে।

২৪ দুলাই দূর থেকে ছানা দুটিকে দেখলাম। মনে হলো, আর বেশি দিন নয়, শিগগিরই ডানা মেলে উড়ে যাবে।

পাখির ছানারা যেমন একদিন বাসা ছেড়ে আকাশে উড়ে যায়, সন্তানেরাও তেমনি একদিন নিজের পৃথিবী গড়তে বেরিয়ে পড়ে। বাবা-মা শুধু বাসাটা আগলে রাখেন, যতদিন দরকার। তারপর একদিন বারান্দা খালি হয়ে যায়। থেকে যায় কয়েকটি শুকনো খড়কুটো, কিছু পালক, কিছু নীরবতা আর ভোরবেলার সেই বিষণ্ন অথচ মধুর ঘুঘুর ডাক।

হয়তো প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই— ভালোবাসা মানে সব সময় ধরে রাখা নয়। কখনও কখনও ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো, ডানা শক্ত হলে উড়ে যাওয়ার জন্য আকাশটুকু খুলে দেওয়া।

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

রাঙা ঠোঁটের মোহনীয়তা— আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিপ্লবেরও প্রতীক

হঠাৎ করে লিপস্টিক নিয়ে পড়ার কারণ হলো— প্রতি বছরের ২৯ জুলাই দিনটিকে বিশ্ব জুড়ে পালন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস’ হিসেবে। না, এ দিবসে নেই কোনো সরকারি ছুটি। তবে বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যপ্রেমী, মেকআপ শিল্পী আর কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রির কাছে দিনটির অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

১৬ দিন আগে

রবীন্দ্রনাথ-ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে ২৫ জুলাই শিল্পকলায় ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্যে কাটানো দুই মাসের স্মৃতি, অনুভূতি, নীরবতা ও অন্তর্জগতের আবেগকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ম্যাড থেটারের দ্বিতীয় প্রযোজনা ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’। শনিবার (২৫ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকটির একাদশ প্রদর্শনী অনু

২২ দিন আগে

অস্কারজয়ী প্রথম আইরিশ অভিনেত্রী ব্রেন্ডা ফ্রিকারের প্রয়াণ

১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাই লেফট ফুট’ ছবিতে ক্রিস ব্রাউনের মায়ের (ব্রিজেট ফ্যাগন ব্রাউন) মর্মস্পর্শী চরিত্রে অভিনয় করে তিনি একাডেমি পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্য তৎকালীন আইরিশ চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছিল, যা দেশটির পরবর্তী সিনেমা

১৮ জুলাই ২০২৬

৭৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার ‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এ পাকিস্তান

আনিকা মেরাজ শুধু সৌন্দর্যেই নয়, মেধার দিক থেকেও অনন্য। তিনি ব্যবসায় প্রশাসন (বিবিএ) এবং অর্থনীতিতে সফলতার সাথে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি অডিটিং এবং অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করছেন। পেশাদার ক্যারিয়ারে একজন রাষ্ট্রীয় অনুমোদিত পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার স্ব

১৭ জুলাই ২০২৬