ফিচার

হাত ও পায়ের পাতা জ্বলে কেন, সমাধান কী

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
প্রতিকী ছবি। ছবি : এআইয়ের তৈরি।

হাত ও পায়ের পাতা জ্বলা অনেকের কাছেই এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। অনেকে একে গুরুত্ব দেন না, আবার কেউ কেউ এটিকে কোনো গুরুতর অসুখের লক্ষণ হিসেবে ভাবেন। আসলে এই সমস্যার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে—শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি, স্নায়ুর রোগ, ডায়াবেটিস, হরমোনের সমস্যা, এমনকি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা হাঁটার কারণেও এই অনুভূতি হতে পারে। মেডিকেল ভাষায় একে “বার্নিং ফিট সিনড্রোম” বা “বার্নিং হ্যান্ড অ্যান্ড ফিট” বলা হয়, কিন্তু এই নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা।

প্রথমেই বলা দরকার, অনেক সময় হাত বা পায়ের পাতায় জ্বালাপোড়া আসলে স্নায়ুর ক্ষতির ফল। স্নায়ু ক্ষতি বা “নিউরোপ্যাথি” হতে পারে ডায়াবেটিসের কারণে, আবার দীর্ঘ সময় শরীরে উচ্চ রক্তশর্করার মাত্রা থাকলে স্নায়ুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেই দুর্বলতা থেকেই তৈরি হয় জ্বালার অনুভূতি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিকাল ডিসঅর্ডার্স অ্যান্ড স্ট্রোক-এর (National Institute of Neurological Disorders and Stroke) তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বিশ্বে প্রায় ৫০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে দেখা যায় এবং এর অন্যতম লক্ষণ হাত-পায়ের জ্বালাপোড়া।

তবে শুধুমাত্র ডায়াবেটিসই নয়, শরীরে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, বি৬ ও বি১-এর ঘাটতিও এই সমস্যা তৈরি করতে পারে। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্স বিভাগের গবেষক ড. মারিয়া সান্তিয়াগো বলেন, “যখন শরীরে ভিটামিন বি১২-এর অভাব হয়, তখন স্নায়ুর চারপাশের সুরক্ষামূলক আবরণ বা মাইলিন শিথ নষ্ট হতে শুরু করে। এর ফলে স্নায়ু সঠিকভাবে সিগন্যাল পাঠাতে পারে না এবং হাত-পায়ের পাতায় অস্বাভাবিক উত্তাপ বা জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।” তিনি মনে করিয়ে দেন, এই অবস্থায় শুধু খাবারের পরিবর্তনই নয়, অনেক সময় সাপ্লিমেন্টও প্রয়োজন হতে পারে।

আরেকটি সাধারণ কারণ হলো থাইরয়েড সমস্যা। শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়, যা হাত-পায়ের পাতায় অতিরিক্ত উষ্ণতা ও জ্বালা তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্যের লন্ডন এন্ডোক্রাইন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ ড. জন অ্যান্ড্রুজ বলেন, “হাইপোথাইরয়েড বা হাইপারথাইরয়েড—দুটো অবস্থাতেই স্নায়ুর ওপর প্রভাব পড়ে। এই প্রভাব যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে হাত-পায়ের পাতায় স্থায়ী জ্বালাপোড়া হতে পারে।”

অনেক সময় আবার এই জ্বালা হয় গরম আবহাওয়ায় বা দীর্ঘ সময় হাঁটার পরে। বিশেষ করে যাদের পায়ের ঘাম বেশি, তারা এই সমস্যায় ভোগেন বেশি। ঘামের কারণে ত্বক ভিজে থাকে এবং ঘর্ষণের ফলে জ্বালা বেড়ে যায়। ভারতীয় ত্বক বিশেষজ্ঞ ড. আরবিন্দা রাও বলেন, “এটা অনেকটা যেমন ঘর্ষণে ত্বকে লালচে ভাব আসে, তেমনি দীর্ঘ সময় ভেজা ও গরম পরিবেশে পায়ের ত্বক সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় সঠিক ফিটের জুতো ও সুতি মোজা ব্যবহার অনেক উপকারী।”

এছাড়া কিছু ওষুধও হাত-পায়ের পাতায় জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কিছু কেমোথেরাপি ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক এবং এইচআইভি চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের ড. থমাস গ্রীন বলেন, “ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা অনেক সময় উল্টানো যায় না। তাই এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।”

এই সমস্যার সমাধানে প্রথমেই মূল কারণ খুঁজে বের করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি ডায়াবেটিস থাকে, তবে রক্তশর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে সঠিক খাবার ও প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে। থাইরয়েড সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ওষুধ খেতে হবে।

প্রাথমিকভাবে হাত-পায়ের পাতার জ্বালা কমাতে কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতি উপকারী হতে পারে। যেমন—গরম দিনে বা হাঁটার পরে ঠান্ডা পানিতে কয়েক মিনিট পা ডুবিয়ে রাখা। এটি রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে এবং জ্বালা কমায়। আরামদায়ক ও বায়ু চলাচল হয় এমন জুতো ব্যবহার করাও জরুরি। যাদের পায়ের ঘাম বেশি, তাদের দিনে একাধিকবার মোজা বদলানো উচিত।

খাবারের দিক থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার যেমন—ডিম, মাছ, দুধ, মাংস খেতে হবে। যারা নিরামিষভোজী, তারা ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নিতে পারেন। পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি, কারণ পানিশূন্যতা হাত-পায়ের জ্বালা বাড়াতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যদি এই জ্বালাপোড়া দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, বা তার সঙ্গে অসাড়তা, ঝিনঝিনে অনুভূতি, বা ব্যথা যুক্ত হয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। কারণ এগুলো অনেক সময় বড় কোনো স্নায়ুরোগের লক্ষণ হতে পারে, যা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, হাত-পায়ের পাতার জ্বালা অনেক সময় সাময়িক অস্বস্তি হলেও, এর পেছনে থাকা কারণটি গুরুতর হতে পারে। তাই অবহেলা না করে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। যেমন ড. মারিয়া সান্তিয়াগো বলেছেন, “শরীর আমাদের সঙ্গে কথা বলে নানা উপায়ে। হাত-পায়ের পাতার জ্বালা সেই ভাষারই একটি রূপ—যা শুনে আমাদের সাড়া দেওয়া উচিত।”

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

জোছনা আর হারিকেন-কুপির আলোয় জমল হারানো পুঁথি পাঠের আসর

বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমেও মানুষের আগ্রহে কমতি নেই। আয়োজকরা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ, আর উঠোনে কুপি ও হারিকেনের আলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক আবহ।

১৮ দিন আগে

প্রেমের নাটক-সিনেমার নির্মাণ-সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে আইনি নোটিশ

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সামাজিক নৈরাজ্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দেশে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং পারি

১৯ দিন আগে

এথিকের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়ন ২২ আগস্ট, বিশেষ প্রদর্শনী

এথিকের প্রথম প্রযোজনা ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ নতুন আঙ্গিকে নির্দেশনা দিয়েছেন মিন্টু সরদার। নাটকটির শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে মঞ্চ ও নেপথ্যে যুক্ত থাকা ১০০ জন কলাকুশলীকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে।

২০ আগস্ট ২০২৬

বাংলা নাটকের রূপকার সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯৪৯ সালের এ দিনে সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা মরহুম ফিরোজা খাতুন।

১৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement