ডিসেম্বরের দিনলিপি: ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

‘মানচিত্রে নতুন দেশ’— চূর্ণ দখলদার বাহিনীর মেরুদণ্ড

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৪: ২৫

৬ ডিসেম্বর সকালটি এসেছিল ইতিহাসের এক ভিন্ন বাঁক নিয়ে। একাত্তরের রণাঙ্গনে তখন বারুদের ধোঁয়ার চেয়েও ভারী হয়ে উঠছিল বিজয়ের সুবাস। আগের দিনগুলোতে যেখানে কেবল যুদ্ধের দামামা বাজছিল, এই দিনটিতে সেখানে যোগ হলো এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভূমিকম্প। এদিন বিশ্ব মানচিত্রে প্রথমবারের মতো একটি নতুন রাষ্ট্রের নাম খোদাই করা হলো, ‘বাংলাদেশ’। একদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের মিথ্যাচারের ফানুস ফুটো হয়ে গেল, অন্যদিকে রণাঙ্গনে ভেঙে পড়ল তাদের অহংকারের প্রতীক ‘যশোর ক্যান্টনমেন্ট’। কোনো বড় যুদ্ধ ছাড়াই পাকিস্তানের এই শক্তিশালী ঘাঁটি পতনের ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, দখলদার বাহিনীর মেরুদণ্ড চূর্ণ হয়ে গেছে।

৬ ডিসেম্বর তারিখটি বাঙালির জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন, কারণ এদিনই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ইতিহাসের এই অধ্যায়টি অত্যন্ত নাটকীয়। এতদিন ধরে পাকিস্তান প্রচার করে আসছিল যে এটি তাদের ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ বা ‘গৃহযুদ্ধ’। কিন্তু ৬ ডিসেম্বর সেই দাবি আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়।

সকালবেলাই তারবার্তা আসে হিমালয়ের কোলঘেঁষা ছোট্ট দেশ ভুটান থেকে। ভুটানের রাজা জিগমে দর্জি ওয়াংচুক এক জরুরি তারবার্তায় মুজিবনগর সরকারকে জানান যে, তার দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। অনেক ঐতিহাসিক ও দলিল-দস্তাবেজ মতে, ভারতের কয়েক ঘণ্টা আগেই ভুটান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। এর কিছুক্ষণ পরেই ভারতের লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেন, “আজ থেকে বাংলাদেশে ‘পাকিস্তান’ নামের অধ্যায় সমাপ্ত। এখন থেকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ ভারতের কাছে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত।”

এই দুটি স্বীকৃতি ছিল রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক বিশাল টনিক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রেঞ্চে ট্রেঞ্চে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। এতদিন তারা ছিলেন ‘বিদ্রোহী’, আজ থেকে তারা হলেন ‘রাষ্ট্রস্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা’। পাকিস্তানের জন্য এটি ছিল কফিনে শেষ পেরেকের মতো, কারণ স্বীকৃতি পাওয়ার অর্থই হলো পাকিস্তান এখন একটি ভিনদেশি দখলদার বাহিনী, যারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পিছু হটতে বাধ্য।

রণাঙ্গনে ৬ ডিসেম্বরের সবচেয়ে বড় চমক ছিল পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরের সদর দপ্তর, যশোর ক্যান্টনমেন্টের পতন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১০৭ পদাতিক ব্রিগেডের সদর দপ্তর ছিল এখানে। তারা যশোরকে বানিয়েছিল ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’। তাদের দম্ভ ছিল, এই দুর্গ ভাঙতে যৌথ বাহিনীর অন্তত এক মাস লাগবে এবং হাজার হাজার সৈন্য মারা যাবে।

কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। মেজর জেনারেল ডি.কে. পালিতের ‘দ্য লাইটনিং ক্যাম্পেইন’ বইয়ের তথ্যমতে, ৬ ডিসেম্বর দুপুরের পর থেকেই যশোর ক্যান্টনমেন্টে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। পাকিস্তানি ১০৭ ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান বুঝতে পারেন, মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষমতা তার নেই। তিনি তার হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে রাতের আঁধারে ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে খুলনার দিকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই পতন কতটা বিশৃঙ্খল ও লজ্জাজনক ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন মুক্তিযোদ্ধারা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, অফিসার্স মেসের ডাইনিং টেবিলে তখনো দুপুরের খাবার সাজানো ছিল। ভাতের প্লেট, গরম মাংসের ঝোল, আর অর্ধেক খাওয়া রুটি টেবিলে রেখেই পাকিস্তানি অফিসাররা জীবন বাঁচাতে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছে। তারা এতটাই ভীত ছিল যে, নিজেদের গোপন নথিপত্র বা ম্যাপগুলোও পুড়িয়ে ফেলার সময় পায়নি। যশোর ক্যান্টনমেন্টের এই পতন ছিল প্রতীকী। এটি প্রমাণ করেছিল যে, পাকিস্তানি বাহিনী আর যুদ্ধের মুডে নেই, তারা এখন কেবল পালানোর পথ খুঁজছে। যশোর মুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল কার্যত শত্রুমুক্ত হয়ে যায়।

৬ ডিসেম্বরই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ছবি: সংগৃহীত
৬ ডিসেম্বরই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ছবি: সংগৃহীত

পূর্ব রণাঙ্গনে ৬ ডিসেম্বর ছিল কৌশলগত বিজয়ের দিন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ফেনী শহর এদিন শত্রুমুক্ত হয়। ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের (বীর বিক্রম) নেতৃত্বে ২য় এবং ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া সীমান্ত দিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। পাকিস্তানি ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশনের সৈন্যরা ফেনীর শুভপুর ব্রিজের কাছে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে তারা টিকতে না পেরে ব্রিজটি উড়িয়ে দিয়ে কুমিল্লার দিকে পালিয়ে যায়। ফেনী পতনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর এবং সেখান থেকে আসা রসদ সরবরাহের পথটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি হাইকমান্ড কার্যত একটি দ্বীপে আটকা পড়ে, কারণ তাদের পালানোর বা রসদ পাওয়ার প্রধান রাস্তাটিই মুক্তিযোদ্ধারা কেটে দেয়। ফেনীর মাটিতে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা, আর স্থানীয় জনতা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলে।

উত্তরাঞ্চলের ৬ নম্বর সেক্টরেও এদিন বিজয়ের জয়োল্লাস। উইং কমান্ডার এম.কে. বাশারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা লালমনিরহাট জেলা ও কুড়িগ্রামের বড় অংশ শত্রুমুক্ত করেন। তিস্তা নদীর ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী রংপুরের দিকে পিছু হটে। লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি অক্ষত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে, যা পরবর্তীতে মিত্রবাহিনীর রসদ সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখে। কুড়িগ্রাম মুক্ত হওয়ার পর সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা উত্তরের জনমানুষের মনে এক বিশাল স্বস্তি এনে দেয়।

৬ ডিসেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশের আকাশে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর (PAF) কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তেজগাঁও বিমানবন্দর রানওয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের ১১টি সেভার জেট মাটিতেই অকেজো হয়ে পড়ে। ভারতের বিমান বাহিনী এবং আমাদের ‘কিলো ফ্লাইট’-এর অকুতোভয় পাইলটরা এদিন নিশ্চিত করেন যে, দিনের আলোতে কোনো পাকিস্তানি সামরিক কনভয় যেন রাস্তায় চলাচল করতে না পারে।

অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরেও পাকিস্তানি নৌবাহিনী কোণঠাসা। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের প্রবেশমুখে মাইন পুঁতে রাখা হয় এবং মিত্রবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো কড়া অবরোধ বা ‘নেভাল ব্লকেড’ তৈরি করে। পাকিস্তানের পালানোর শেষ পথ সমুদ্রপথও এদিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ছিল সেই দিন, যেদিন যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে গিয়েছিল। ভুটান ও ভারতের স্বীকৃতি প্রমাণ করল যে এই যুদ্ধ আর কোনো গৃহযুদ্ধ নয়, এটি দুটি রাষ্ট্রের লড়াই। আর পাকিস্তানি বাহিনীর নৈতিক পরাজয়ের সাক্ষী হয়ে রইল যশোর ক্যান্টনমেন্টের সেই অর্ধেক খাওয়া খাবারের টেবিলটি। অস্ত্র ছিল, গোলাবারুদ ছিল, কিন্তু যা ছিল না তা হলো সাহস। ৬ ডিসেম্বরের সূর্যাস্ত দেখার সময় মুক্তিযোদ্ধারা জানতেন, ঢাকা এখন আর বেশি দূর নয়।

তথ্যসূত্র ও রিসোর্স:

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ খণ্ড) – তথ্য মন্ত্রণালয়
  • দ্য লাইটনিং ক্যাম্পেইন (The Lightning Campaign) – মেজর জেনারেল ডি.কে. পালিত
  • উইটনেস টু সারেন্ডার (Witness to Surrender) – ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক
  • লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে – মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম
  • মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ – মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বীর উত্তম
  • একাত্তরের দিনগুলি– জাহানারা ইমাম
  • মূলধারা ’৭১ – মঈদুল হাসান
  • আনন্দবাজার পত্রিকা ও দ্য স্টেটসম্যান আর্কাইভ
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

৯ মার্চ ১৯৭১: টিক্কা খানকে শপথ পড়াতে অপারগতা প্রধান বিচারপতির

সকালে পিআইএ’র বাঙালি কর্মচারীরা তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে মিছিল করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে এলে বঙ্গবন্ধু তাদের সাক্ষাৎ দেন। ওদিকে চট্টগ্রামে দুপুরে অবাঙালিরা রেলওয়ে কলোনি এবং এ কে খান রোডে সংঘর্ষে জড়ায়। বিকালে হালিশহর থেকে দেওয়ানহাট হয়ে আগ্রাবাদ পর্যন্ত সশস্ত্র অবাঙালিরা মিছিল করে।

৬ দিন আগে

৮ মার্চ ১৯৭১: আর দূরে নয় স্বাধীন বাংলাদেশ

গতকালের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অধিবেশনে যোগ দিতে যে পূর্বশর্ত দিয়েছেন, পাকিস্তান সরকারের পক্ষে তা মানা সম্ভব হবে না। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে সামরিক প্রেসিডেন্টকে মূলত উপেক্ষা করেছেন। এ কারণেই হয়তো মার্কিন গোপন দলিলে বলা হয়েছে, ৭ মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণ স্বাধীনতা ঘোষণার তুল্য।

৭ দিন আগে

৭ মার্চ ১৯৭১— রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সংরক্ষণ ইতিহাসের অনন্য দলিল

একটি বিষয় এখানে গুরুত্ব পেতে পারে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের আলোকচিত্র এবং অডিও-ভিডিও ধারণ করে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান— চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) ও বাংলাদেশ বেতার। দুটি প্রতিষ্ঠানই এ কাজ করেছে সরকারের কোনো অনুমতি ছাড়াই। সেটি না করলে পরবর্তী কোনো প্রজন্ই আর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভ

৮ দিন আগে

ঈদে আসছে ‘ফ্রেমে বাঁধা বন্ধুত্ব’

গল্পটি নিয়ে পরিচালক নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল বলেন, ‘এই টেলিছবির মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। যে হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে নানা অজানা গল্প। আশা করছি, প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা ও মুখোশের নিচে লুকানো বেদনা নিয়ে নির্মিত টেলিছবিটি দর্শকদের পছন্দ হবে।’

৯ দিন আগে