
ক্রীড়া ডেস্ক

বিউ ওয়েবস্টার বলটি করেছিলেন অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে। জায়গা পেয়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট বরাবর কাট করলেন মুমিনুল হক। মুহূর্তের মধ্যে বল পেরিয়ে গেল বাউন্ডারি। অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে সৃষ্টি হলো এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েই জয় তুলে নিলো টাইগাররা। তাও যে সে জয় নয়, প্রায় প্রতিটি সেশনেই দাপট দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো পর্যদুস্ত করে এলো এ ঐতিহাসিক জয়। দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটিই সম্ভবত ডারউইনে জন্ম দিলেন হাসান মাহমুদ-তানজিদ তামিম-মেহেদি হাসান মিরাজরা।
অথচ এ সফর শুরুর আগে প্রত্যাশার পারদটা ছিল অনেকটাই নিম্নমুখী। ২৩ বছর পর বাংলাদেশকে টেস্ট খেলতে ডেকে পূর্ণশক্তির দল ঘোষণা করল অস্ট্রেলিয়া। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যার বোলিং দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, সেই নাহিদ রানা জিম্বাবুয়েতে সিরিজ খেলতে গিয়ে ইনজুরড! একই কারণে দলে নেই আরেক বাঁহাতি পেস সেনসেশন শরিফুল ইসলামও। স্বাভাবিকভাবেই যে বোলিং ইউনিট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ‘ভালো কিছু’ করার আশা ছিল, তা বিনষ্ট অঙ্কুরেই।
তারপরও দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন লড়াইয়ের। বাংলাদেশি দর্শকদের প্রত্যাশাও সম্ভবত ছিল ‘সম্মানজনক পরাজয়’। তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস পরাজয় টাইগার সমর্থকদের প্রত্যাশার পারদ আরও এক দফা নামিয়ে আনে।

কিন্তু ডারউইনে টেস্ট শুরু হতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। সদ্যই কাউন্টি মাতিয়ে আসা হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশি পেসাররা একের পর এক তুলে নিতে লাগলেন উইকেট। ট্রাভিস হেড, মারনাস লাবুশেন, স্টিভ স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারির মতো ব্যাটারদের নিয়ে সাজানো ব্যাটিং লাইনআপ ধরে পড়ল তাসের ঘরের মতো। প্রথম দিনেই অস্ট্রেলিয়া অলআউট ১৯৮ রানে! হাসান মাহমুদের ঝুলিতে ৬ উইকেট!
অথচ মিচেল স্টার্ক-জশ হ্যাজেলউড-প্যাট কামিন্সরা ছুড়বেন পেসের গোলা, তার বিপরীতে খাবি বাংলাদেশি ব্যাটাররা— এমন চিত্রই সম্ভবত ছিল সবচেয়ে বেশি অনুমিত। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা উলটে গেল। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সব উইকেট পেসারদের। টাইগার ফ্যানরাও মজা করে ফেসবুকে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া ‘পরীক্ষা’র প্রস্তুতি নিয়েছিল নাহিদ রানাকে ঘিরে, কিন্তু প্রশ্নে এলো হাসান মাহমুদ!
টাইগার পেসারদের এমন সাফল্য আবার উলটো কাঁপন ধরিয়েছিল বাংলাদেশি ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে। হাসান-তাসনিক-এবাদতই যখন ডারউইনে আগুন ঝরাচ্ছেন, স্টার্ক-হ্যাজেলউড-কামিন্সরা না জানি কী করেন!

এবারও উলটে গেল পাশার দান। এবারে নেতৃত্বে তানজিদ তামিম, ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছেন যিনি। স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক মানসিকতাকে দারুণভাবে লুকিয়ে রেখে বলের মেরিট বিবেচনায় নিয়ে ‘প্রোপার টেস্ট মেজাজ’ দেখিয়ে তুলে নিলেন অনন্য এক শতক। পাশে পেলেন ‘টেস্ট স্পেশালিস্ট’ মুমিনুল হক আর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে। এই তিনজনের ব্যাটে ভর করেই লিড পেয়ে গেল বাংলাদেশ।
তবু শঙ্কা, অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়িয়ে টেস্ট ছিনিয়ে নেওয়ার নজির তো কম নেই। কিন্তু ডারউইনে এ যেন অন্য বাংলাদেশ। যে অস্ট্রেলিয়া টেস্টে টেলএন্ডারদের ব্যাটিংয়ের জন্য বিখ্যাত, সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন বাংলাদেশের টেলএন্ডাররা। সেই পর্বে নেতৃত্ব দিলেন অলরাউন্ডার মিরাজ।
বল হাতে আগুন ঝরানো হাসান মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ৩০ ওভার উইকেটে কাটিয়ে দিলেন মিরাজ। ৪৬ রানের সে জুটি অস্ট্রেলিয়াকে হতাশায় পুড়িয়েছে দীর্ঘসময় ধরে। তাইজুলের সঙ্গে এলো আরও ১৮ রান, তাসকিনের সঙ্গে মিরাজের জুটি ৪৬ রানে। মিরাজ নবম ব্যাটার হিসেবে আউট হয়ে গেলে এলো আরও ৮ রান।
সবমিলিয়ে শেষ ৪ উইকেটে এলো ১১৮ রান। দলের লিড গিয়ে ঠেকল ২২৮ রানে! অস্ট্রেলিয়ার ‘বাউন্স-ব্যাক’ মানসিকতা মাথায় রেখেও তখন জয়ের সুবাস বাংলাদেশের পক্ষে ছড়াতে শুরু করেছে ডারউইনে।

দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিংয়ে নেমে আবারও হাসানের দাপট। প্রথম ইনিংসের মতোই তুলে নিলেন দুই ওপেনারকে। এবার প্রতিরোধের পালা অস্ট্রেলিয়ার। লাবুশেন আর স্মিথ দলকে টেনে নিয়ে গেলেন ১০ ওভারের মতো। ডারউইনের উইকেট ততক্ষণে কথা বলতে শুরু করেছে স্পিনারদের পক্ষেও। অস্ট্রেলিয়ার সে প্রতিরোধ ভাঙতে প্রথম আঘাতটাও তাই করলেন তাইজুল ইসলাম। লাবুশেনকে বোল্ড করে দিলেন এক স্পিন ইয়র্কারে।
কিন্তু স্মিথ আর গ্রিন নাছোড়বান্দা। প্রায় ১৮ ওভার কাটিয়ে দিলেন উইকেটে। বাংলাদেশের লিড তখন কমছে। শেষ পর্যন্ত আরেক স্পিনার মিরাজ এনে দিলেন আনন্দের উপলক্ষ্য। প্রথম ইনিংসকে অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ ধস ঠেকিয়ে রাখা একমাত্র ব্যাটার স্মিথকে কট অ্যান্ড বোল্ড করে ফিরিয়ে দিলেন। জয়ের পাল্লা তখন বাংলাদেশের পক্ষে অনেকটাই হেলে পড়েছে।
ক্যামেরন গ্রিন আর অ্যালেক্স ক্যারি হাল ছাড়লেন না। তৃতীয় দিন কাটিয়ে চতুর্থ দিনেও প্রতিরোধ ধরে রাখলেন। কিন্তু মিরাজ যেখানে তৃতীয় দিন শেষ করেছিলেন, চতুর্থ দিন যেন শুরু করলেন সেখান থেকেই। অ্যালেক্স ক্যারির ৭২ বলের প্রতিরোধ ভাঙলেন লিটনের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে। ওয়েবস্টারকে করলেন বোল্ড। কামিন্সকে ফেরালেন সাদমানের হাতে ক্যাচ বানিয়ে। তাসকিনও বোলিংয়ে ফিরে তুলে নিলেন স্টার্ককে।
কিন্তু অন্য পাশে ক্যামেরন গ্রিন তখনো অবিচল। দেখতে দেখতে শতক তুলে নিলেন তিনি। ততক্ষণে অস্ট্রেলিয়ার লিড ৫০ পেরিয়ে গেছে। নাথান লায়ন আর জশ হ্যাজেলউডকে নিয়ে গ্রিন অস্ট্রেলিয়ার লিড তিন অঙ্কে পৌঁছে দেবেন— এমন আশা বুনতে শুরু করেছেন অজি ফ্যানরা।
না, সে স্বপ্ন ডালপালা মেলার সুযোগ পায়নি। কিছু সময়ের বিরতি দিয়ে যখন বোলিংয়ে ফিরলেন হাসান মাহমুদ, তখনই শেষ গ্রিনের প্রতিরোধ। তার ব্যাক অব লেন্থের বল খেলতে গিয়ে স্টাম্পের দিকে টেনে নিলেন গ্রিন। এলোমেলো হয়ে গেল স্টাম্প। ২০১ বলে ১০৪ রান করে সাজঘরে ফিরলেন গ্রিন, বাংলাদেশের জয় তখন অনেকটাই নিশ্চিত। ৬ রান পরে নাথান লায়নকেও লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেললেন মিরাজ, স্পর্শ করলেন ৫ উইকেটের ম্যাজিক ফিগার!
ফলাফল— অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট ২৮৪ রানে। ঐতিহাসিক এক জয়ের সাক্ষী হতে বাংলাদেশের টার্গেট ৫৭!
প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানে অলআউটের স্মৃতি এমন সহজ টার্গেটেও স্বস্তি দিচ্ছিল না। মাত্র ৪ রানের মাথায় প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদের বিদায় শঙ্কার কালো মেঘও ছড়িয়েছিল টাইগার ভক্তদের মধ্যে। কিন্তু না, ডারউইনে অন্য গল্প লেখার পণ করেই যেন গিয়েছিলেন টাইগাররা। আরেক ওপেনার সাদমানের সঙ্গে জুটি বাঁধলেন মুমিনুল। প্রথম ইনিংসে যেমন তানজিদকে সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বোলিংকে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, এবার সেটি করলেন সাদমানকে নিয়ে।
হ্যাঁ, ১৪ ওভার সময় লাগল, কিন্তু পথ হারাল না বাংলাদেশ। ৩৯ বলে ৩০ রানে অপরাজিত থাকলেন মুমিনুল, ৪২ বলে ২৫ করে অপর প্রান্তে অপরাজিত সাদমান। পঞ্চদশ ওভারের দ্বিতীয় বলেই বিউ ওয়েবস্টারের অফস্টাম্পের বাইরের সেই বল কাট করে সীমানাছাড়া করে মুমিনুল নিশ্চিত করলেন— ডারউইনে বাংলাদেশই ইতিহাস গড়ছে।
মাঝের জিম্বাবুয়ে সিরিজ বাদ দিলে বছর দুয়েক ধরে টেস্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স আশা জাগানিয়া। এর মধ্যে পাকিস্তানকে হোম ও অ্যাওয়ে দুই সিরিজেই হোয়াইটওয়াশের গৌরবও রয়েছে। বিশেষ করে নাহিদ রানা, হাসান মাহমুদ, শরিফুল হাসানের মতো তরুণ পেসাররা ‘প্রকৃত টেস্ট দল’ হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে যাওয়ার গতি বেড়েছে বাংলাদেশের।
ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের সেই ‘টেস্ট দল হয়ে ওঠা’র স্মারকেরই সাক্ষী। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যেখানে নিজেদের সেরা দলগুলো নিয়েও ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা-ভারত-নিউজিল্যান্ডের মতো দলকে খাবি খেতে হয়, সেখানে বাংলাদেশের টানা সেশনের পর সেশন দাপট ধরে রেখে জয় তুলে নেওয়ার ঘটনাকে অবিশ্বাস্য বললেও ভুল মনে হয় না।
এমনকি যে লড়াকু মানসিকতার জন্য ক্রিকেটবিশ্বে বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়া, ডারউইনে সেই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদেরই সময়ে সময়ে দেখা গেল হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে। ম্যাচের বিভিন্ন মুহূর্তে মেজাজ হারালেন কেউ কেউ। কিছু কিছু সময় ড্রেসিং রুমে অবিশ্বাস দেখা গেল তাদের কারও চোখে। ধারাভাষ্যকাররাও স্বীকার করে নিলেন, বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের সামনে অসহায় বোধ করছেন অজি ব্যাটার-বোলাররা।
প্রবল পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে জয় তুলে নেওয়ার মতো তৃপ্তিদায়ক মুহূর্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটে খুব বেশি নেই। ডারউইন টেস্ট সেই স্বাদ এনে দিলো বাংলাদেশকে, যেখানে বাংলাদেশের হাতেই ম্যাচের ছড়ি, বাংলাদেশই ম্যাচের নিয়ন্ত্রা।
ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগতে থাকা বাংলাদেশ দ্বিতীয় টেস্টে কেমন করবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা মুহূর্ত জন্ম নিলো যে ডারউইনে, সেই আনন্দটুকুই না হয় উপভোগ করি সবাই প্রাণ খুলে।

বিউ ওয়েবস্টার বলটি করেছিলেন অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে। জায়গা পেয়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট বরাবর কাট করলেন মুমিনুল হক। মুহূর্তের মধ্যে বল পেরিয়ে গেল বাউন্ডারি। অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে সৃষ্টি হলো এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েই জয় তুলে নিলো টাইগাররা। তাও যে সে জয় নয়, প্রায় প্রতিটি সেশনেই দাপট দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো পর্যদুস্ত করে এলো এ ঐতিহাসিক জয়। দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটিই সম্ভবত ডারউইনে জন্ম দিলেন হাসান মাহমুদ-তানজিদ তামিম-মেহেদি হাসান মিরাজরা।
অথচ এ সফর শুরুর আগে প্রত্যাশার পারদটা ছিল অনেকটাই নিম্নমুখী। ২৩ বছর পর বাংলাদেশকে টেস্ট খেলতে ডেকে পূর্ণশক্তির দল ঘোষণা করল অস্ট্রেলিয়া। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যার বোলিং দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, সেই নাহিদ রানা জিম্বাবুয়েতে সিরিজ খেলতে গিয়ে ইনজুরড! একই কারণে দলে নেই আরেক বাঁহাতি পেস সেনসেশন শরিফুল ইসলামও। স্বাভাবিকভাবেই যে বোলিং ইউনিট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ‘ভালো কিছু’ করার আশা ছিল, তা বিনষ্ট অঙ্কুরেই।
তারপরও দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন লড়াইয়ের। বাংলাদেশি দর্শকদের প্রত্যাশাও সম্ভবত ছিল ‘সম্মানজনক পরাজয়’। তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস পরাজয় টাইগার সমর্থকদের প্রত্যাশার পারদ আরও এক দফা নামিয়ে আনে।

কিন্তু ডারউইনে টেস্ট শুরু হতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। সদ্যই কাউন্টি মাতিয়ে আসা হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশি পেসাররা একের পর এক তুলে নিতে লাগলেন উইকেট। ট্রাভিস হেড, মারনাস লাবুশেন, স্টিভ স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারির মতো ব্যাটারদের নিয়ে সাজানো ব্যাটিং লাইনআপ ধরে পড়ল তাসের ঘরের মতো। প্রথম দিনেই অস্ট্রেলিয়া অলআউট ১৯৮ রানে! হাসান মাহমুদের ঝুলিতে ৬ উইকেট!
অথচ মিচেল স্টার্ক-জশ হ্যাজেলউড-প্যাট কামিন্সরা ছুড়বেন পেসের গোলা, তার বিপরীতে খাবি বাংলাদেশি ব্যাটাররা— এমন চিত্রই সম্ভবত ছিল সবচেয়ে বেশি অনুমিত। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা উলটে গেল। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সব উইকেট পেসারদের। টাইগার ফ্যানরাও মজা করে ফেসবুকে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া ‘পরীক্ষা’র প্রস্তুতি নিয়েছিল নাহিদ রানাকে ঘিরে, কিন্তু প্রশ্নে এলো হাসান মাহমুদ!
টাইগার পেসারদের এমন সাফল্য আবার উলটো কাঁপন ধরিয়েছিল বাংলাদেশি ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে। হাসান-তাসনিক-এবাদতই যখন ডারউইনে আগুন ঝরাচ্ছেন, স্টার্ক-হ্যাজেলউড-কামিন্সরা না জানি কী করেন!

এবারও উলটে গেল পাশার দান। এবারে নেতৃত্বে তানজিদ তামিম, ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছেন যিনি। স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক মানসিকতাকে দারুণভাবে লুকিয়ে রেখে বলের মেরিট বিবেচনায় নিয়ে ‘প্রোপার টেস্ট মেজাজ’ দেখিয়ে তুলে নিলেন অনন্য এক শতক। পাশে পেলেন ‘টেস্ট স্পেশালিস্ট’ মুমিনুল হক আর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে। এই তিনজনের ব্যাটে ভর করেই লিড পেয়ে গেল বাংলাদেশ।
তবু শঙ্কা, অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়িয়ে টেস্ট ছিনিয়ে নেওয়ার নজির তো কম নেই। কিন্তু ডারউইনে এ যেন অন্য বাংলাদেশ। যে অস্ট্রেলিয়া টেস্টে টেলএন্ডারদের ব্যাটিংয়ের জন্য বিখ্যাত, সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন বাংলাদেশের টেলএন্ডাররা। সেই পর্বে নেতৃত্ব দিলেন অলরাউন্ডার মিরাজ।
বল হাতে আগুন ঝরানো হাসান মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ৩০ ওভার উইকেটে কাটিয়ে দিলেন মিরাজ। ৪৬ রানের সে জুটি অস্ট্রেলিয়াকে হতাশায় পুড়িয়েছে দীর্ঘসময় ধরে। তাইজুলের সঙ্গে এলো আরও ১৮ রান, তাসকিনের সঙ্গে মিরাজের জুটি ৪৬ রানে। মিরাজ নবম ব্যাটার হিসেবে আউট হয়ে গেলে এলো আরও ৮ রান।
সবমিলিয়ে শেষ ৪ উইকেটে এলো ১১৮ রান। দলের লিড গিয়ে ঠেকল ২২৮ রানে! অস্ট্রেলিয়ার ‘বাউন্স-ব্যাক’ মানসিকতা মাথায় রেখেও তখন জয়ের সুবাস বাংলাদেশের পক্ষে ছড়াতে শুরু করেছে ডারউইনে।

দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিংয়ে নেমে আবারও হাসানের দাপট। প্রথম ইনিংসের মতোই তুলে নিলেন দুই ওপেনারকে। এবার প্রতিরোধের পালা অস্ট্রেলিয়ার। লাবুশেন আর স্মিথ দলকে টেনে নিয়ে গেলেন ১০ ওভারের মতো। ডারউইনের উইকেট ততক্ষণে কথা বলতে শুরু করেছে স্পিনারদের পক্ষেও। অস্ট্রেলিয়ার সে প্রতিরোধ ভাঙতে প্রথম আঘাতটাও তাই করলেন তাইজুল ইসলাম। লাবুশেনকে বোল্ড করে দিলেন এক স্পিন ইয়র্কারে।
কিন্তু স্মিথ আর গ্রিন নাছোড়বান্দা। প্রায় ১৮ ওভার কাটিয়ে দিলেন উইকেটে। বাংলাদেশের লিড তখন কমছে। শেষ পর্যন্ত আরেক স্পিনার মিরাজ এনে দিলেন আনন্দের উপলক্ষ্য। প্রথম ইনিংসকে অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ ধস ঠেকিয়ে রাখা একমাত্র ব্যাটার স্মিথকে কট অ্যান্ড বোল্ড করে ফিরিয়ে দিলেন। জয়ের পাল্লা তখন বাংলাদেশের পক্ষে অনেকটাই হেলে পড়েছে।
ক্যামেরন গ্রিন আর অ্যালেক্স ক্যারি হাল ছাড়লেন না। তৃতীয় দিন কাটিয়ে চতুর্থ দিনেও প্রতিরোধ ধরে রাখলেন। কিন্তু মিরাজ যেখানে তৃতীয় দিন শেষ করেছিলেন, চতুর্থ দিন যেন শুরু করলেন সেখান থেকেই। অ্যালেক্স ক্যারির ৭২ বলের প্রতিরোধ ভাঙলেন লিটনের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে। ওয়েবস্টারকে করলেন বোল্ড। কামিন্সকে ফেরালেন সাদমানের হাতে ক্যাচ বানিয়ে। তাসকিনও বোলিংয়ে ফিরে তুলে নিলেন স্টার্ককে।
কিন্তু অন্য পাশে ক্যামেরন গ্রিন তখনো অবিচল। দেখতে দেখতে শতক তুলে নিলেন তিনি। ততক্ষণে অস্ট্রেলিয়ার লিড ৫০ পেরিয়ে গেছে। নাথান লায়ন আর জশ হ্যাজেলউডকে নিয়ে গ্রিন অস্ট্রেলিয়ার লিড তিন অঙ্কে পৌঁছে দেবেন— এমন আশা বুনতে শুরু করেছেন অজি ফ্যানরা।
না, সে স্বপ্ন ডালপালা মেলার সুযোগ পায়নি। কিছু সময়ের বিরতি দিয়ে যখন বোলিংয়ে ফিরলেন হাসান মাহমুদ, তখনই শেষ গ্রিনের প্রতিরোধ। তার ব্যাক অব লেন্থের বল খেলতে গিয়ে স্টাম্পের দিকে টেনে নিলেন গ্রিন। এলোমেলো হয়ে গেল স্টাম্প। ২০১ বলে ১০৪ রান করে সাজঘরে ফিরলেন গ্রিন, বাংলাদেশের জয় তখন অনেকটাই নিশ্চিত। ৬ রান পরে নাথান লায়নকেও লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেললেন মিরাজ, স্পর্শ করলেন ৫ উইকেটের ম্যাজিক ফিগার!
ফলাফল— অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট ২৮৪ রানে। ঐতিহাসিক এক জয়ের সাক্ষী হতে বাংলাদেশের টার্গেট ৫৭!
প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানে অলআউটের স্মৃতি এমন সহজ টার্গেটেও স্বস্তি দিচ্ছিল না। মাত্র ৪ রানের মাথায় প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদের বিদায় শঙ্কার কালো মেঘও ছড়িয়েছিল টাইগার ভক্তদের মধ্যে। কিন্তু না, ডারউইনে অন্য গল্প লেখার পণ করেই যেন গিয়েছিলেন টাইগাররা। আরেক ওপেনার সাদমানের সঙ্গে জুটি বাঁধলেন মুমিনুল। প্রথম ইনিংসে যেমন তানজিদকে সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বোলিংকে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, এবার সেটি করলেন সাদমানকে নিয়ে।
হ্যাঁ, ১৪ ওভার সময় লাগল, কিন্তু পথ হারাল না বাংলাদেশ। ৩৯ বলে ৩০ রানে অপরাজিত থাকলেন মুমিনুল, ৪২ বলে ২৫ করে অপর প্রান্তে অপরাজিত সাদমান। পঞ্চদশ ওভারের দ্বিতীয় বলেই বিউ ওয়েবস্টারের অফস্টাম্পের বাইরের সেই বল কাট করে সীমানাছাড়া করে মুমিনুল নিশ্চিত করলেন— ডারউইনে বাংলাদেশই ইতিহাস গড়ছে।
মাঝের জিম্বাবুয়ে সিরিজ বাদ দিলে বছর দুয়েক ধরে টেস্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স আশা জাগানিয়া। এর মধ্যে পাকিস্তানকে হোম ও অ্যাওয়ে দুই সিরিজেই হোয়াইটওয়াশের গৌরবও রয়েছে। বিশেষ করে নাহিদ রানা, হাসান মাহমুদ, শরিফুল হাসানের মতো তরুণ পেসাররা ‘প্রকৃত টেস্ট দল’ হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে যাওয়ার গতি বেড়েছে বাংলাদেশের।
ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের সেই ‘টেস্ট দল হয়ে ওঠা’র স্মারকেরই সাক্ষী। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যেখানে নিজেদের সেরা দলগুলো নিয়েও ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা-ভারত-নিউজিল্যান্ডের মতো দলকে খাবি খেতে হয়, সেখানে বাংলাদেশের টানা সেশনের পর সেশন দাপট ধরে রেখে জয় তুলে নেওয়ার ঘটনাকে অবিশ্বাস্য বললেও ভুল মনে হয় না।
এমনকি যে লড়াকু মানসিকতার জন্য ক্রিকেটবিশ্বে বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়া, ডারউইনে সেই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদেরই সময়ে সময়ে দেখা গেল হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে। ম্যাচের বিভিন্ন মুহূর্তে মেজাজ হারালেন কেউ কেউ। কিছু কিছু সময় ড্রেসিং রুমে অবিশ্বাস দেখা গেল তাদের কারও চোখে। ধারাভাষ্যকাররাও স্বীকার করে নিলেন, বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের সামনে অসহায় বোধ করছেন অজি ব্যাটার-বোলাররা।
প্রবল পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে জয় তুলে নেওয়ার মতো তৃপ্তিদায়ক মুহূর্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটে খুব বেশি নেই। ডারউইন টেস্ট সেই স্বাদ এনে দিলো বাংলাদেশকে, যেখানে বাংলাদেশের হাতেই ম্যাচের ছড়ি, বাংলাদেশই ম্যাচের নিয়ন্ত্রা।
ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগতে থাকা বাংলাদেশ দ্বিতীয় টেস্টে কেমন করবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা মুহূর্ত জন্ম নিলো যে ডারউইনে, সেই আনন্দটুকুই না হয় উপভোগ করি সবাই প্রাণ খুলে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ডারউইনে দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই তানজিদ আর মুমিনুল হক দেখেশুনে শুরু করেছিলেন। প্রথম দুই সেশনেই ছিল বাংলাদেশি ব্যাটারদের দাপ এরপর নতুন বল হাতে তুলে নিয়ে অজি বোলাররা ১১ রানের মধ্যে ৩ উইকেট তুলে নেন। পরে মিরাজ-হাসানের দৃঢ়তায় ৬ উইকেটে ৩৫১ রান নিয়ে দিন শেষ করেছে টাইগাররা।
২ দিন আগে
দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনে নাথান লায়নের বল লং অফ দিয়ে ঠেলে এক রান নিয়ে তিন অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলেন তানজিদ।
২ দিন আগে
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের এই সুবিধাজনক অবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান পেসারদের। অস্ট্রেলিয়ার ১০ উইকেটই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে বাংলাদেশের পেসারদের সব ১০ উইকেট নেওয়ার ঘটনা এটি দ্বিতীয়বার। নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলামের অনুপস্থিতি বুঝতেই দেননি হাসান মাহম
৩ দিন আগে
টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পরও বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেন্থের সামনে স্বাগতিক ব্যাটাররা স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেননি। মাত্র ৭৪ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া।লাঞ্চের আগেই তাদের টপ অর্ডারকে ধসিয়ে দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিজেদের হাতে তুলে নেয় বাংলাদেশ।
৩ দিন আগে