বেলিংহামের জোড়া গোলে থামল নরওয়ের বিশ্বকাপযাত্রা, সেমিতে ইংল্যান্ড

ক্রীড়া ডেস্ক
বেলিংহামের জোড়া গোল সেমিতে পৌঁছে দিয়েছে ইংল্যান্ডকে। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের শেষ ষোলো পর্যন্ত চমক দেখিয়ে আসা নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালেও লিড পেল ম্যাচের ৩৬ মিনিটে। ইংল্যান্ডকে দারুণ আটকেও রেখেছিল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুড বেলিংহামকে ঠেকানো যায়নি। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিট শেষে ইনজুরি টাইমে একবার, আরেকবার ৯০ মিনিটের খেলা শেষে অতিরিক্ত সময়ে— বেলিংহামের দুই গোলেই স্বপ্ন ভেঙেছে নরওয়ের। শেষ আটে এসে থেমেছে বিশ্বকাপের স্বপ্নযাত্রা। ইংল্যান্ড পৌঁছে গেছে সেমিফাইনালে। অবশ্য ইংল্যান্ডের প্রথম গোলের আগে বল তারে লেগে দিক পরিবর্তন হওয়া আর নরওয়ের একটি গোল বাতিল নিয়ে ‘বিতর্ক’ ম্যাচ শেষেও রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সময় রোববার (১২ জুলাই) রাত ৩টায় যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি স্টেডিয়ামে তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। ২-১ গোলে জয় পেয়ে সে ম্যাচে জিতল টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। সেমিফাইনালে তাদের মুখোমুখি হতে হবে আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচে বিজয়ী দলের সঙ্গে।

শুরু থেকেই ম্যাচটি ছিল দুই ভিন্ন ধাঁচের লড়াই। বলের দখল ও আক্রমণ গড়ার চেষ্টা ছিল ইংল্যান্ডের, আর নরওয়ে অপেক্ষা করছিল দ্রুত পালটা আক্রমণের সুযোগের। প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দুই দলই শুরুতে কিছুটা সতর্ক ফুটবল খেললেও ম্যাচের গতি পালটে যায় প্রথমার্ধের মাঝামাঝি।

৩৩ মিনিটে ইংলিশ ডিফেন্ডার জন স্টোনসের ভুল ব্যাকপাস প্রায় কাজে লাগিয়ে ফেলেছিলেন আর্লিং হাল্যান্ড। যদিও জর্ডান পিকফোর্ড বিপদ সামলে দেন। সেই মুহূর্ত থেকেই আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় নরওয়ে। কিছুক্ষণ পর হাল্যান্ডের হেড সরাসরি পিকফোর্ডের হাতে জমা পড়লেও ৩৬ মিনিটে আর ভুল করেনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা।

প্যাট্রিক বের্গের চাপে হ্যারি কেইনের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণ গড়ে নরওয়ে। বাঁ প্রান্তে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ বল পেয়ে ক্রস করতে চেয়েছিলেন হাল্যান্ডের উদ্দেশে। কিন্তু সেই বলই সবাইকে অবাক করে দূরের ওপরের কোণে জড়িয়ে যায়। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় নরওয়ে।

গোল হজমের পর সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। এর মধ্যে নরওয়েও ছেড়ে কথা বলছিল না। আলেক্সান্ডার সোরলথ ভালো একটি বল পেয়েও উঁচুতে শট মারলে সুযোগ নষ্ট হয়। মার্টিন ওডেগার্ডও পরীক্ষা নেন পিকফোর্ডের, কিন্তু গোল হয়নি। আরেকটি আক্রমণে সোরলথের সামনে হাল্যান্ড থাকলেও জন স্টোনস অসাধারণ রক্ষণে নিশ্চিত বিপদ সামাল দেন।

ম্যাচ শেষে ইংলিশ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আর্লিং হাল্যান্ডের বিদায় আলিঙ্গন। ছবি: সংগৃহীত
ম্যাচ শেষে ইংলিশ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আর্লিং হাল্যান্ডের বিদায় আলিঙ্গন। ছবি: সংগৃহীত

চাপের মুখে ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ফেরান জুড বেলিংহাম। প্রথমার্ধের শেষদিকে অ্যান্থনি গর্ডনের পাস ধরে দুর্দান্ত গতিতে ডি-বক্সে ঢুকে টরবইয়র্ন হেগেমকে কাটিয়ে নিচু শটে সমতা ফেরান তিনি। ১-১ গোলের সমতায় স্বস্তি পায় ইংল্যান্ড শিবির। বিরতির আগে বেলিংহামের পাস থেকে হ্যারি কেইনও বল জালে জড়িয়েছিলেন, কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়।

তবে বেলিংহামের সমতায় ফেরা গোল নিয়ে পালটা দাবি তোলে নরওয়ে। গোলরক্ষক নিল্যান্ড ও হাল্যান্ডরা দাবি করেন, গোলের আক্রমণের সূচনায় নিল্যান্ড যখন বলটি ছেড়েছিলেন, সেটি মাঠে থাকা স্পাইক্যামের তারে জড়িয়ে দিক দিক পরিবর্তন করে। নিয়ম অনুযায়ী তখন খেলা থেমে যাওয়ার কথা। তবে রেফারি সে দাবি বাতিল করে দেন। ফিফাও জানায়, বলে থাকা সেন্সরের তথ্য বলছে, বলটি কোথাও বাধা পেয়ে দিক পরিবর্তন করেনি।

সমতায় ফেরার পর দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক পরিবর্তন আনেন টমাস টুখেল। বুকায়ো সাকা ও এবেরেচি এজেকে নামিয়ে মাঝমাঠে নতুন ছন্দ আনার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু উলটো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় নরওয়ে। হাল্যান্ডের একটি হেড পিকফোর্ড ঠেকিয়ে দেন। এরপর কর্নার থেকে টরবইয়র্ন হেগেম বল জালে পাঠালেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) সিদ্ধান্তে গোল বাতিল হয়, কারণ হাল্যান্ড ইংল্যান্ডের এক ডিফেন্ডারকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। নরওয়ে এ গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানিয়ে আসছে।

অবশ্য ৭৬ মিনিটে ফের গোল আর লিডের কাছে চলে গিয়েছিল নরওয়ে। কর্নারের দ্বিতীয় বল থেকে ক্রিস্টোফার আয়েরের হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ভাগ্য তখন ইংল্যান্ডের পক্ষেই ছিল।

নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল ইংল্যান্ড। হ্যারি কেইনের হেড দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন ওরইয়ান নিল্যান্ড। কিন্তু ৯৮ মিনিটে সেই নিল্যান্ডই বড় ভুল করে বসেন। বদলি খেলোয়াড় মরগান রজার্সের দূরপাল্লার শট তিনি ঠিকমতো তালুবন্দি করতে পারেননি। ফিরতি বলে সবার আগে পৌঁছে সহজ ফিনিশে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন বেলিংহাম। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। বেলিংহামের এটি চলতি বিশ্বকাপে ষষ্ঠ গোল। ৬ গোল রয়েছে ইংলিশ ক্যাপ্টেন হ্যারি কেইনেরও।

এরপরও হাল ছাড়েনি নরওয়ে। আন্তোনিও নুসার শট মার্ক গেহি ব্লক করেন, অস্কার ববও ভালো জায়গা থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। অন্যদিকে ইংল্যান্ড ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। একবার স্পেন্সের ওপর ফাউলে পেনাল্টি দিলেও ভিএআরের সহায়তায় সিদ্ধান্ত বদলান রেফারি। পরে নিল্যান্ড সাকা ও স্পেন্সের পরপর কয়েকটি শট ঠেকিয়ে ব্যবধান আর বাড়তে দেননি।

শেষ পর্যন্ত আর সমতায় ফিরতে পারেনি নরওয়ে। ইংল্যান্ডকে পুরো ম্যাচে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেও অতিরিক্ত সময়ে একটি ভুলই তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। জোড়া গোলে দলের ত্রাতা হয়ে বেলিংহাম ইংল্যান্ডকে পৌঁছে দেন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।

সেই সঙ্গে থামে নরওয়ের স্বপ্নযাত্রা। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল নর্ডিকরা। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটেও দুটি জয় তুলে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। ৭ গোল করা আর্লিং হাল্যান্ডের দানবীয় পারফরম্যান্সে শেষ ষোলোতে ব্রাজিলকে পর্যন্ত হারিয়েছিল তারা। বিশ্বকাপের মাঠে কল্পিত লংশিপ ভাসিয়ে হাজার বছরের পুরনো ভাইকিংস স্মৃতিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। শেষ পর্যন্ত ইংলিশদের সামনে থামল হাল্যান্ড-ওডেগার্ডদের বিশ্বকাপযাত্রা।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

ডারউইন টেস্টে বাঘের থাবা, বাংলাদেশের অজি বধের দাপুটে গল্প

ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগতে থাকা বাংলাদেশ দ্বিতীয় টেস্টে কেমন করবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা মুহূর্ত জন্ম নিলো যে ডারউইনে, সেই আনন্দটুকুই না হয় উপভোগ করি সবাই প্রাণ খুলে।

২ দিন আগে

ডারউইনে অবিশ্বাস্য বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াকে নাস্তানাবুদ করে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়

বাংলাদেশ গড়ে ফেলল এক অনন্য ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে তাদের মাটিতেই ক্যাঙ্গারুদের ধসিয়ে দেওয়ার দারুণ ও স্মরণীয় এক স্বাদ পেল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

২ দিন আগে

অস্ট্রেলিয়ায় ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে বাংলাদেশের টার্গেট ৫৭

শেষ উইকেট হিসেবে নাথান লায়নকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। রিভিউ নিয়েও তাতে কোনো লাভ হয়নি তার। লায়নকে ফিরিয়ে ৫ উইকেট শিকার করে অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট করেন মিরাজ।

২ দিন আগে

ডারউইনে তৃতীয় দিন শেষে জয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ

১৫৩ রানের লিড নিয়ে দিনের খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। মেহেদি হাসান মিরাজের দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি টেলএন্ডারদের দৃঢ়তায় সে লিড থামে ২২৮ রানে। এরপর আবার হাসান মাহমুদের তোপে দুই ওপেনার সাজঘরে৷ পরে তাইজুল ইসলাম আর মিরাজ যথাক্রমে মারনাস লাবুশেন আর স্টিভেন স্মিথের উইকেট তুলে নিলে বাংলাদেশের হাসিটা চওড়া হয়েছে।

৩ দিন আগে