প্রথম সেমিতে মুখোমুখি ফ্রান্স-স্পেন— এমবাপ্পের গতির ঝড় নাকি ইয়ামালের নিয়ন্ত্রণ

ক্রীড়া ডেস্ক
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৫: ৫১
ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে বলের দখল নিয়ে লড়াইয়ে স্পেনের লামিন ইয়ামাল ও ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও দুই তারকার দ্বৈরথে থাকবে সবার নজর। ছবি: সংগৃহীত

১০৪ ম্যাচের মধ্যে ১০০ ম্যাচই শেষ। এবার শেষ চার ম্যাচে বিশ্বকাপের যবনিকা পতনের পালা। আর সেই শেষ অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে এবার আর্লিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স আর লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি দুই দলই ইউরোপের হলেও তাদের ফুটবল দর্শনের কারণেই সেমিফাইনালের মুখোমুখি লড়াই পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

এই লড়াইয়ের একদিকে রয়েছে ফ্রান্সের গতির ঝড়। ‘ডিরেক্ট ফুটবল’ ধারণায় দিদিয়ের দেশমের দল বলের দখল হারালেও বিচলিত হয় না। বরং প্রতিপক্ষকে ওপরে তুলে এনে দ্রুত ট্রানজিশনে আঘাত হানাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বিশেষ করে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিস ট্রায়ো গতির ঝড়ে যেকোনো ম্যাচের চিত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বদলে দিকে পারে।

অন্যদিকে ভিন্ন এক ফুটবল দর্শনের ধারক স্পেন। লা ফুয়েন্তের এই দল বলের দখল, দ্রুত পাস বিনিময় আর পজেশনাল ফুটবলের ওপর ভর করে প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে চাপে ফেলে। লামিনে ইয়ামাল, দানি অলমো, পেড্রি, রদ্রিদের বলের ওপর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিপক্ষকে হতাশায় ‍ডুবিয়ে ম্যাচের লাগাম হাতে ধরে রাখতে সহায়তা করে। সে নিয়ন্ত্রণে প্রতিপক্ষের হাসফাঁস তুলে দিয়ে অ্যাটাকিং থার্ডে গিয়ে ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং খেলায় এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা।

কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ডি-বক্সের বাইরে থেকে নিচু শটে ফ্রান্সের দ্বিতীয় গোলটি করেন উসমান দেম্বেলে। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু বল স্পর্শ করলেও তা ঠেকাতে পারেননি। ছবি: রয়টার্স
কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ডি-বক্সের বাইরে থেকে নিচু শটে ফ্রান্সের দ্বিতীয় গোলটি করেন উসমান দেম্বেলে। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু বল স্পর্শ করলেও তা ঠেকাতে পারেননি। ছবি: রয়টার্স

এই দুই ভিন্ন দর্শনের সংঘর্ষই সেমিফাইনালটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। স্পেন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই নিজেদের পরিকল্পনা কার্যকর করে এখানে এসেছে। অনেক ম্যাচের স্কোরলাইনে প্রতিফলন না থাকলেও মাঠে তাদের নিয়ন্ত্রণের দাপট ছিল চেনা দৃশ্য। অন্যদিকে ফ্রান্স যথাসম্ভব প্রতিপক্ষগুলোকে গতির ঝড়ে উড়িয়েই এসেছে শেষ চারে।

আর সে কারণেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের এই লড়াই কেবল স্পেন বনাম ফ্রান্সের লড়াই কিংবা এমবাপ্পে বনাম ইয়ামালের লড়াই নয়, এটি নিয়ন্ত্রণ বনাম ট্রানজিশন, সমষ্টিগত ছন্দ বনাম ব্যক্তিগত বিস্ফোরণ আর পজেশনাল ফুটবল বনাম ভার্টিক্যাল ফুটবলেরও লড়াই। এই লড়াই তাই শুধু ফাইনালের একটি টিকিট নয়, পরীক্ষা হবে দুই কোচের কৌশল, দুই দলের মানসিক দৃঢ়তা আর দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও।

কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্সের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচের শেষ দিকে জয়সূচক গোল করেন স্পেনের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো। ছবি: রয়টার্স
কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্সের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচের শেষ দিকে জয়সূচক গোল করেন স্পেনের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো। ছবি: রয়টার্স

কোথায় এগিয়ে স্পেন, কোথায় ফ্রান্স?

সেমিফাইনালে ওঠা দুই দলের কোনো বিভাগকেই বিশ্বসেরার চেয়ে কম বলার সুযোগ নেই। তাই এই ম্যাচে কে এগিয়ে, তার উত্তর খুঁজতে শুধু তারকা খেলোয়াড়ের নাম দেখলে চলবে না, বরং খুঁজতে হবে— কোন দল নিজেদের শক্তিকে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে।

আক্রমণভাগ: গতি বনাম সমন্বয়

ফ্রান্সের আক্রমণের সবচেয়ে বড় শক্তি গতি। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে গড়ে ওঠা আক্রমণভাগ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রক্ষণ থেকে আক্রমণে রূপ নিতে পারে। প্রতিপক্ষের রক্ষণ যদি একটু ওপরে উঠে আসে, তাহলে গড়ির ঝড় তোলা এমবাপ্পকে থামানো বিশ্বের যেকোনো দলের জন্যই কঠিন।

তার সঙ্গে উসমান দেম্বেলের ওয়ান-টু-ওয়ান দক্ষতার সঙ্গে রয়েছে মাইকেল ওলিসের মতো মাঝমাঠের সেনানীর সৃজনশীলতা। সেই সঙ্গে আদ্রিয়েন র‌্যাবিও কিংবা মানু কোনের মতো মিডফিল্ডারদের উপস্থিতি ফ্রান্সের মাঝমাঠকেই রূপ দিয়েছে অনন্য এক আক্রমণভাগে।

অন্যদিকে স্পেনের আক্রমণ অনেক বেশি সমষ্টিনির্ভর। তারা একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং বলের গতি, পজিশন বদল এবং ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক তৈরি করে। উইঙ্গাররা ভেতরে ঢুকে জায়গা তৈরি করেন, ফুল-ব্যাকরা ওভারল্যাপ করেন, আর মিডফিল্ড থেকে নিয়মিত দ্বিতীয় সারির রান আসে।

মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

ফ্রান্স-স্পেন ম্যাচে সবচেয়ে বড় লড়াই হতে পারে মাঝমাঠে। স্পেনের মিডফিল্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বল ধরে রাখার ক্ষমতা। প্রতিপক্ষ প্রেস করলেও তারা ছোট পাসে চাপ ভাঙতে পারে। বল হারানোর পর দ্রুত ‘কাউন্টার-প্রেস’ করে আবার দখল ফিরিয়ে নেওয়াও তাদের অন্যতম অস্ত্র।

ফ্রান্সের মিডফিল্ডের চরিত্র কিছুটা ভিন্ন। তারা সব সময় বলের দখল চায় না। বরং মাঝমাঠের লক্ষ্য থাকে বল জিতে দ্রুত সামনে পাঠানো। তাই ফ্রান্সের মিডফিল্ডকে সফল হতে হলে স্পেনের পাসিং রিদম ভাঙতে হবে।

যদি স্পেন আরামে বল ঘোরাতে পারে, তাহলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতেই থাকবে। কিন্তু ফ্রান্স যদি মাঝমাঠে শারীরিক লড়াই জিতে বল দ্রুত সামনে পাঠাতে পারে, তাহলে স্পেনের রক্ষণ কঠিন পরীক্ষায় পড়বে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে এই বিশ্বকাপেই দুজনে মিলে ১৯টি গোলের সুযোগ তৈরি করা দেম্বেলে-এমবাপ্পে জুটির বোঝাপড়া ফ্রান্সকে দিতে পারে বাড়তি সুবিধা।

রক্ষণের দর্শনেও ভিন্নতা

স্পেন রক্ষণ শুরু করে আক্রমণভাগ থেকেই। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রেস করে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে উঠতেই দিতে চায় না। ফলে অনেক সময় তাদের সেন্টার-ব্যাকদের সরাসরি চাপ সামলাতে হয় কম। তবে স্পেনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এমবাপ্পের গতি সামলানো। কারণ ফুলব্যাকরা যখন ওপরে উঠবেন, তখন পেছনের ফাঁকা জায়গাই হবে ফ্রান্সের প্রধান লক্ষ্য।

ফ্রান্সের রক্ষণ তুলনামূলকভাবে নিচু ব্লকে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তারা জায়গা বন্ধ করে প্রতিপক্ষকে বাইরে খেলতে বাধ্য করে, তারপর বল জিতে দ্রুত পালটা আক্রমণে যায়। সেক্ষেত্রে ফ্রান্সের লেফট ব্যাক-রাইট ব্যাকরাও পরিস্থিতির প্রয়োজনে উইংগারে পরিণত হন। তবে ফ্রান্সকে সতর্ক থাকতে হবে স্পেনের ‘থার্ড-ম্যান রান’ আর বক্সের সামনে দ্রুত পাসের কম্বিনেশন নিয়ে।

বেঞ্চ: ম্যাচ ঘোরানোর অস্ত্র

নকআউট ফুটবলে শুরুর একাদশ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বেঞ্চও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনের বেঞ্চে এমন খেলোয়াড় আছেন, যারা ম্যাচের গতি বাড়াতে পারেন বা মাঝমাঠে নতুন শক্তি যোগ করতে পারেন। তাদের বিকল্পগুলো মূল পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। বিশেষ করে পর্তুগাল আর বেলজিয়াম ম্যাচে মিকেল মেরিনো বদলি হিসেবে নেমেই গোল করে নিজেকে ‘সুপার সাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেই ফেলেছেন।

কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমার্ধের হাইড্রেশন বিরতিতে লামিন ইয়ামালকে নির্দেশনা দিচ্ছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ছবি: রয়টার্স
কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমার্ধের হাইড্রেশন বিরতিতে লামিন ইয়ামালকে নির্দেশনা দিচ্ছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ছবি: রয়টার্স

ফ্রান্সের বেঞ্চেও আবার রয়েছে ম্যাচের চেহারা বদলে দেওয়ার মতো প্রতিভা। শুয়োমেনি, মার্কাস থুরামের মতো তারকারাও দলের প্রয়োজনে যেকোনো সময় নেমেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন। বিশেষ করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে বেঞ্চের গভীরতা বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

২ কোচের কৌশলের লড়াই

এই ম্যাচ শুধু খেলোয়াড়দের নয়, দুই কোচেরও পরীক্ষা। লুইস দে লা ফুয়েন্তে পরিকল্পনা অনুযায়ী ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চান। তার দল সাধারণত নিজেদের খেলার ধরন বদলায় না, বরং প্রতিপক্ষকে নিজেদের ছন্দে খেলতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।

সুইডেনের বিপক্ষে গোল করে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের সঙ্গে উদ্‌যাপন করছেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। ছবি: রয়টার্স
সুইডেনের বিপক্ষে গোল করে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের সঙ্গে উদ্‌যাপন করছেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। ছবি: রয়টার্স

দিদিয়ের দেশম আবার বরাবরই গতিশীল ও ‘ডিরেক্ট ফুটবলে’ বিশ্বাসী। তিনি প্রয়োজন হলে বলের দখল ছেড়ে দিতেও রাজি, যদি সেটি প্রতিপক্ষের পেছনের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে। দুই কোচের এই ভিন্ন দর্শনই ম্যাচটিকে কৌশলগতভাবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন যারা

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে সব আলো সাধারণত বড় তারকাদের দিকেই থাকে। ফ্রান্স আর স্পেন দলে তেমন তারকারও অভাব নেই। একদিকে এমবাপ্পে, দেম্বেলে, অলিজে; অন্যদিকে ইয়ামাল, অলমো, পেদ্রি। এমন হাইভোল্টেজ ম্যাচের মধ্যেও থাকে নানা ডুয়েলের লড়াই।

কিলিয়ান এমবাপ্পে বনাম স্পেনের ডান প্রান্ত

ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় অস্ত্র এখনো কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৮ গোল আর ৩ অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুট তো বটেই, গোল্ডেন বলের দৌড়েও এগিয়ে রয়েছেন তিনি। এমবাপ্পে শুধু গোলই করছেন না, প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দিচ্ছেন। তার সঙ্গে উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল অলিজের গতি ফ্রান্সের আক্রমণকে আরও বৈচিত্র্য দিয়েছে। ফলে স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে— এমবাপ্পেকে থামানো হবে কীভাবে?

এমবাপ্পেকে শুধু একজন ফুলব্যাকের দায়িত্বে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই স্পেনকে ডান প্রান্তে ডাবল কভার দিতে হতে পারে। ফুলব্যাকের পাশাপাশি নিকটবর্তী সেন্টারব্যাক কিংবা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে দ্রুত সরে এসে সহায়তা করতে হবে। কারণ এমবাপ্পেকে একবার খোলা জায়গা দেওয়া মানেই ম্যাচের চিত্র কয়েক সেকেন্ডে বদলে যেতে পারে। ফলে এ ম্যাচের একাদশে থাকলে স্প্যানিশ রক্ষণের পেদ্রো পোরো ও কুবার্সি থেকে শুরু করে ডিফেন্সিভ মিডের রদ্রির মনোযোগেরও বড় অংশ জুড়ে থাকতে পারেন এমবাপ্পে।

লামিন ইয়ামাল বনাম ফ্রান্সের রক্ষণ

ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি যদি হয়ে থাকেন এমবাপ্পে, স্পেনের ক্ষেত্রে সে নামটি হতে পারে লামিনে ইয়ামাল। গোটা বিশ্বকাপ জুড়েই সৃজনশীল ফুটবলের পসরা সাজিয়েছেন তিনি। একের পর এক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন সতীর্থদের জন্য।

ইয়ামালের বড় শক্তি তার ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে পড়া, ছোট জায়গায় বল ধরে রাখা এবং ভালো অবস্থানে থাকা খেলোয়াড়টির দিকে নিখুঁত থ্রু-পাস বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে ইয়ামালকে আটকাতে হলে ফ্রান্সের ডান দিকের রক্ষণকেও বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। থিও হার্নান্দেজ কিংবা উপমেকানোর ওপর দায়িত্ব পড়তে পারে তাকে আটকানোর। এমনকি বার্সেলোনার সতীর্থ জুলিয়াস কুন্দেকেও হয়তো বড় সময় কাটাতে হবে ইয়ামালের সামনেই।

র‌্যাবিও-কোনে বনাম রদ্রি-পেদ্রি

ফ্রান্স-স্পেন ম্যাচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত লড়াই হয়ে উঠতে পারে মাঝমাঠে র‌্যাবিও-কোনের সঙ্গে আর রদ্রি-পেদ্রির মধ্যে। স্পেনের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নির্ভর করবে রদ্রি আর পেদ্রির ওপরে। আর সেখানে তার মূল লড়াইটা হবে ফ্রান্সের র‌্যাবিও আর মানু কোনের সঙ্গে।

রদ্রি-পেদ্রিরা যখন বল পেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলা গড়তে পারবেন, তখন স্পেন নিজের ছন্দে খেলবে। ফ্রান্সের দায়িত্ব হবে সেই ছন্দ ভেঙে দেওয়া। গত কয়েকটি ম্যাচে র‌্যাবিও আর মানু কোনের শারীরিক উপস্থিতি ও বল পুনরুদ্ধারের দক্ষতা স্প্যানিশ মাঝমাঠের জন্য বড় সতর্কবার্তাই হয়ে এসেছে। ম্যাচে স্পেনের নিয়ন্ত্রণ আর ফ্রান্সের দ্রুত ট্রানজিশনের মূল লড়াইটা সম্ভবত এই চারজনের লড়াইয়ের ওপরেই নির্ভর করবে।

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালকে সামনে রেখে টেক্সাসের ডালাসে সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটিতে অনুশীলনে ব্যস্ত ফ্রান্সের ফুটবলাররা। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বকাপ সেমিফাইনালকে সামনে রেখে টেক্সাসের ডালাসে সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটিতে অনুশীলনে ব্যস্ত ফ্রান্সের ফুটবলাররা। ছবি: রয়টার্স

গতিশীল ফ্রান্সে সৃজনশীল অলিজে

এমবাপ্পে ও দেম্বেলের আড়ালে অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছেন মাইকেল অলিজে। কিন্তু এই টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের আক্রমণে তিনি অন্যতম সৃজনশীল খেলোয়াড়। গোল তৈরির শেষ পাস, দুই লাইনের মাঝখানে জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা তৈরি— এই তিন ক্ষেত্রেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

ফলে স্পেন যদি এমবাপ্পে আর দেম্বেলেকে নিয়ে বেশি মনোযোগী হয় এবং তাদের দুজনকে আটকেও রাখে, সেক্ষেত্রে ফ্রান্সের ত্রাণকর্তা হয়ে উঠতে পারেন অলিজে। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৬ ম্যাচে তার ৫টি অ্যাসিস্ট সেটিই প্রমাণ করে।

স্পেনের ‘সংযোগ-সেতু’ দানি অলমো

স্পেনের দুর্দান্ত আক্রমণভাগের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে উঠতে পারেন দানি অলমো, যিনিও অলিজের মতোই অনেক সময় ইয়ামাল-রদ্রিদের তারকাখ্যাতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যান। তিনি কখনো মিডফিল্ডে নেমে আসেন, কখনো দুই সেন্টার-ব্যাকের মাঝখানে জায়গা তৈরি করেন, আবার কখনো উইঙ্গারদের জন্য করিডোর খুলে দেন।

ফ্রান্সের সেন্টার-ব্যাকদের সামনে যে ছোট ছোট জায়গা তৈরি হবে, সেগুলো যদি অলমো কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে স্পেনের আক্রমণ আরও ধারালো হবে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে নামের পাশে একটি অ্যাসিস্ট থাকলেও ৮টি ‘বিগ চান্স’ ক্রিয়েট করেছেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও তার শট থিবো কোর্তোয়া ঠেকিয়ে দিলে ফিরতি বলে গোল পান ফাবিয়ান রুইজ। ফলে দানি অলমোও হয়ে উঠতে পারেন স্পেনের তুরুপের তাস।

সেমিফাইনালের প্রস্তুতিতে টেক্সাসের ডালাসে কটন বোল স্টেডিয়ামে অনুশীলনে ব্যস্ত স্পেনের ফুটবলাররা। ছবি: রয়টার্স
সেমিফাইনালের প্রস্তুতিতে টেক্সাসের ডালাসে কটন বোল স্টেডিয়ামে অনুশীলনে ব্যস্ত স্পেনের ফুটবলাররা। ছবি: রয়টার্স

ফ্রান্স-স্পেনের এই হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের রেজাল্ট তাই মূলত পাঁচটি ট্যাকটিক্যাল দ্বৈরথের ওপর নির্ভর করতে পারে অনেকটাই—

  • স্পেন কি এমবাপ্পেকে খোলা জায়গা দিতে বাধ্য হবে, নাকি ডাবল-মার্কিংয়ে আটকে রাখতে পারবে?
  • ফ্রান্সের প্রেসিং আর শারিরিক সক্ষমতার চাপের মধ্যেও কি রদ্রি স্পেনের পাসিং ছন্দ ধরে রাখতে পারবেন?
  • ইয়ামালকে খোলসবন্দি করে রাখতে পারবে ফ্রান্সের রক্ষণভাগ?
  • ফ্রান্স কি বল ছাড়াই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, নাকি স্পেনের দীর্ঘ পজেশন তাদের ক্লান্ত করে দেবে?
  • র‌্যাবিও আর কোনের সঙ্গে রদ্রি আর পেদ্রির মাঠ দখলের লড়াইয়ে কে এগিয়ে থাকবে?

রোড টু সেমিফাইনাল

স্পেন ও ফ্রান্স— দুই দলই বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নিলেও তাদের যাত্রাপথ ছিল দুই রকম। বিশ্বকাপ জুড়ে ফ্রান্স ছিল ধারাবাহিকতার আরেক নাম। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ফ্রান্স নিজেদের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০ আর নরওয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শতভাগ সাফল্য নিয়ে নকআউটে ওঠে দিদিয়ের দেশমের দল। তিন ম্যাচে ১০ গোল করে তারা টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নকআউটের প্রথম ম্যাচে সুইডেনও তেমন কোনো হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেনি ফ্রান্সের বিপক্ষে। শেষ ষোলোতে কেবল লো-ব্লকে খেলা প্যারাগুয়ে ফ্রান্সকে কিছুটা আটকে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ৭০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল এনে এমবাপ্পে উদ্ধার করেন ফ্রান্সকে। কোয়ার্টার ফাইনালেও মরক্কোর জমাট রক্ষণ ফ্রান্সকে অপেক্ষায় রেখেছিল এক ঘণ্টা। এরপর ৬ মিনিটের ব্যবধানে এমবাপ্পে আর দেম্বেলের জোড়া গোলে নিশ্চিত হয় সেমিফাইনাল।

শিরোপার লড়াইয়ে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন-ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। ছবি: সংগৃহীত
শিরোপার লড়াইয়ে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন-ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে স্পেনের এবারের বিশ্বকাপযাত্রা অনেকটাই ছিল ধৈর্যশীলতার চূড়ান্ত উদাহরণ। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল শুরু থেকেই নিজেদের পরিচিত ফুটবল খেলেছে— বলের নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ও অবস্থানগত শৃঙ্খলা। শুরুটা অবশ্য সুখকর হয়নি কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল বের করতে না পেরে ড্র করায়। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে সৌদি আরবের জালে ৪ গোল দেয় তারা। তৃতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষেও জয় আসে ১ গোলে, তবে বলের দখল ছিল ম্যাচে ৬৮ শতাংশ।

নকআউটের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩ গোল দিয়েছিল স্প্যানিশরা। শেষ ষোলোতে তাদের দিতে হয় ধৈর্যের পরীক্ষা। মিকেল মেরিনো বদলি হিসেবে নেমে ইনজুরি টাইমে উদ্ধার করেন স্পেনকে। কোয়ার্টার ফাইনালেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে বড় পরীক্ষা দিতে হয় তাদের। ম্যাচ জুড়ে বলের দখল, শট আর সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত হয় ৮৮তম মিনিটে, সেই বদলি হিসেবে নামা মেরিনোর গোলে।

কে হাসবে শেষ হাসি?

ফ্রান্স আর স্পেনের সেমিফাইনালে ওঠার গল্পে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট— ফ্রান্স এসেছে গতির ঝড় আর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে, যেখানে স্পেনের অস্ত্র ধৈর্যশীলতা আর শৃঙ্খলা। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দুই দল যখন সেমিফাইনালে মুখোমুখি, তখন সব কলাকৌশলের তাত্ত্বিক হিসাব মাঠে প্রতিফলিত হবে— এমনটা বলা যায় না।

সেমিফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে সাধারণত একটি বড় ভুল, একটি দুর্দান্ত মুহূর্ত বা একটি ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্তই পার্থক্য গড়ে দেয়। ফ্রান্সের ট্রানজিশনাল আর স্পেনের পজেশনাল ফুটবলের লড়াইয়ে তেমন পার্থক্য গড়ে দেওয়ার মতো ফুটবলারের ঘাটতি নেই, দেশম বা ফুয়েন্তেরও ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস দেখানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। আর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ডালাস স্টেডিয়ামেই উত্তর মিলবে— এমবাপ্পে নাকি ইয়ামাল— ফাইনাল ম্যাচে দেখা যাবে কাকে।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

ভিএআরের সিদ্ধান্তে কেন লাল কার্ড দেখলেন এমবোলো

ঘটনাটি ঘটে ম্যাচের ৭২তম মিনিটে, যখন দুই দল ১-১ সমতায় ছিল। বল নিয়ে আর্জেন্টিনার বাইলাইনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এমবোলো। এ সময় তাকে আটকাতে চ্যালেঞ্জ করেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস।

২ দিন আগে

ইতিহাসে প্রথমবার র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৪ চার দল সেমিফাইনালে

ফিফার সবশেষ আপডেট অনুযায়ী, পুরুষ ফুটবল দলগুলোর মধ্যে র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স। দ্বিতীয় স্থান লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। অন্যদিকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে লামিনা ইয়ামালের স্পেন। আর হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড রয়েছে চতুর্থ স্থানে। সে হিসাবে র‍্যাংকিংয়ের প্রথম ও তৃতীয় দল মুখোমুখি হ

২ দিন আগে

আলভারেজ-লাউতারোতে স্বস্তি, সুইসদের কাঁদিয়ে সেমিতে আর্জেন্টিনা

মেসির কর্নার থেকে হেড করে দলকে এগিয়ে নিলেন ম্যাক আলিস্টার। এরপর পুরো ম্যাচে মেসি যেন ঘুরলেন নিজের ছায়া হয়ে। আর্জেন্টিনাকেও মনে হলো অনেকটাই ছন্নছাড়া। এর মধ্যে সমতায় ফিরল সুইজারল্যান্ড। এক সুইস ফুটবলার লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলায় গিয়ে শেষ ৮ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ আ

২ দিন আগে

৯০ মিনিটে সমতায় আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড, খেলা গড়াল অতিরিক্ত সময়ে

ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটেই মেসির দারুণ এক কর্নারে হেড করে লিড এনে দিয়েছিলেন ম্যাক আলিস্টার। এরপর আর আক্রমণে সমন্বয় ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। উলটো ৬৭ মিনিটে পালটা আক্রমণ থেকে গোল খেয়ে বসে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সমতায় ফেরার পর সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলো লাল কার্ড খেয়ে মাঠ ছাড়েন। কিন্তু ৯০ মিনিটের খেলা

২ দিন আগে