খামেনির উত্তরসূরি কে?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরানের পরবর্তী নেতা হিসেবে আলোচনায় (বাঁ থেকে) মুজতবা খামেনি, হাসান খোমেনি, মরিয়ম রাজাভি ও রেজা পাহলভি। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তার মৃত্যুর খবরে ইরান পালটা হামলা ও প্রতিশোধের ঘোষণা দিলেও দেশটির ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে— আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি হবেন কে?

গত কয়েক বছর ধরেই আলি খামেনির স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না। ফলে দীর্ঘ দিন ধরেই তার উত্তরসূরির পরিচয় নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলে আসছে। এবারে যুদ্ধরত অবস্থাতেই তার উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপনীত হয়েছে ইরান।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, নতুন ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেমের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ ইরানের দায়িত্ব পালন করবে। এরপর যথাযথ প্রক্রিয়ায় নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেছে নেওয়া হবে।

খামেনির অনুসারীরা

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে প্রার্থীকে একজন স্বীকৃত আয়াতুল্লাহ হতে হয়। নির্বাচিত হলে তিনি আজীবন দায়িত্বে থাকতে পারেন। রাষ্ট্রের সব কৌশলগত সিদ্ধান্ত— সামরিক, পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা চূড়ান্তভাবে তার হাতেই ন্যস্ত থাকে। একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনী ও আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক।

ইরান রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে একসময় আলি খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় ছিলেন ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ইব্রাহিম রাইসি। ২০২৪ সালের ১৯ মে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থি এই আলেমের মৃত্যু সেই সমীকরণ বদলে দেয়। পরে প্রেসিডেন্ট হন মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি আবার সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তার সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বর্তমানে আলি খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম তারই ছেলে মুজতবা খামেনি। ৫৬ বছর বয়সী এই আলেমকে কট্টরপন্থি ধারার ধারক হিসেবে দেখা হয়। বলা হয়ে থাকে, বাবার মতাদর্শের অনুসারী তিনি।

আলোচনায় আরও রয়েছে হাসান খামেনির নাম। ইরানের এই আলেম তুলনামূলক উদারপন্থি ভাবমূর্তির জন্য পরিচিত। তবে তিনি ইরানের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো ইসলামি বিপ্লবের জনক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির নাতি। ফলে তাকেও অনেকে আলি খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দেখে থাকেন।

এ ছাড়া আলি রেজা আরাফি, মোহসেন কোমি, মোহসেন আরাকি, গোলাম হোসেইন মোহসেনি ও হাশেম হুসেইনি বুশেহরির নামও আলোচনায় রয়েছে বলে বিভিন্ন থিংকট্যাংকের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তারা সবাই আলি খামেনিসহ তার আশপাশের মহলের ঘনিষ্ঠ।

সত্তরের দশকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলনে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি (সামনে) ও তার ঘনিষ্ঠ আায়াতুল্লাহ আলি খামেনি (পেছনে)। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
সত্তরের দশকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলনে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি (সামনে) ও তার ঘনিষ্ঠ আায়াতুল্লাহ আলি খামেনি (পেছনে)। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

আলোচনায় ২ বিরোধী নেতা

ইরানের ক্ষমতার লড়াই শুধু শাসকগোষ্ঠীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক মহলও চলমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতার লড়াইয়ে আলোচনায় রয়েছে। ইরান থেকে নির্বাসিত অনেক নেতাই রয়েছেন, যারা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ইরানের ক্ষমতাবলয়ে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছেন। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তারা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা না হতে পারলেও ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো বদলে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসতে পারেন।

এমন নেতাদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম প্যারিসভিত্তিক ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরানের (এনসিআরআই) মরিয়ম রাজাভি। ইসলামি বিপ্লবপূর্ব সময়ের ‘রাজতন্ত্র’ কিংবা বিপ্লব-পরবর্তী ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী’ কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া এই নেতা গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।

মরিয়মের প্রবাসী এই দল নিজেদের নির্বাসিত ইরান সরকার হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন আয়োজন করে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে ছয় মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ছক তৈরি আছে। মরিয়ম বলেন, ইরানিরা ‘শাহতন্ত্র’ (মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্র) ও মোল্লাতন্ত্র (সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহর অধীনে ধর্মীয় শাসনকাঠামো) উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করছে। এখন সময় জনগণের শাসনের, এখন সময় ঐক্যের।

অন্যদিকে ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রেজা পাহলভিও ইরানের পরবর্তী নেতা হিসেবে রয়েছেন আলোচনায়। রেজা পাহলভি দাবি করেছেন, ইসলামিক শাসনব্যবস্থার পতন হলে তারও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

আছে ট্রাম্পের পছন্দও!

এদিকে ইরানের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীরাও! ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছেন, তেহরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ‘কয়েকজন ভালো প্রার্থী’ রয়েছেন।

ইরানের নেতা হিসেবে কেউ তার পছন্দের তালিকায় আছে কি না— এমন প্রশ্ন রেখে সাংবাদিকরা জোরাজুরি করলে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আছে মনে হয়। কয়েকজন ভালো প্রার্থী আছে।’ তবে চাপাচাপি করলেও তাদের নাম বা পরিচয় নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বাছাই হয় কীভাবে?

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করে থাকে ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ। এই পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন করা হয় প্রতি আট বছর পরপর।

আবার এই পরিষদের সদস্য কারা হবেন, সেটি নির্ধারণ করে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ নামে একটি কমিটি। এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।

অর্থাৎ যে দুটি পরিষদ ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করবে, সেই দুটি পরিষদের ওপরই বর্তমান বা সবশেষ সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে।

ইরানের বিশেষজ্ঞরা বলেন, গত তিন দশক ধরে আলি খামেনি নিশ্চিত করেছেন, বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা যেন রক্ষণশীল হয়, যারা তার উত্তরসূরি নির্বাচনের সময় তারই নির্দেশ মেনে চলবে। নির্বাচিত হওয়ার পর সর্বোচ্চ নেতা তার পদে আজীবন বহাল থাকতে পারেন।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনায় এসেছে ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোর বা ইরানের বিপ্লবী গার্ডও। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধরত পরিস্থিতিতে এই সামরিক বাহিনীও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খামেনির তিন দশকের শাসনে ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেন রক্ষণশীল বলয় প্রাধান্য ধরে রাখতে পারে। ফলে তার উত্তরসূরি বা ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচন কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং পুরো শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, গার্ডিয়ান

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইসরায়েলের বেইত সেমেশে হামলায় নিহত বেড়ে ৮

এমডিএ জানিয়েছে, এদের মধ্যে দুইজন গুরুতর আহত, তিনজন মাঝারি আঘাত পেয়েছেন এবং ১৮ জনের মাইনর ইনজুরি বা স্বল্প আঘাত পেয়েছেন।

৬ ঘণ্টা আগে

ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করল সৌদি আরব

পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরানের নির্লজ্জ আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরবে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। এ আক্রমণ রাজ্য ও একাধিক ভ্রাতৃদেশকে লক্ষ্য করে ছিল’।

৬ ঘণ্টা আগে

ইরানে তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর মৃত্যুর পর দেশটির সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এই কাউন্সিলই দেশ পরিচালনা করবে।

৭ ঘণ্টা আগে

আমিরাতে ১৩৭ ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯ ড্রোন নিক্ষেপ ইরানের

ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ইরান ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৯টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

৮ ঘণ্টা আগে