অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে মার্কিন নাগরিক নিহত

বিবিসি বাংলা

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন বিভাগের এক কর্মকর্তার গুলিতে মিনিয়াপোলিসে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

৩৭ বছর বয়সী নিহত নারীর নাম রেনি নিকোল গুড। তিনি মার্কিন নাগরিক ছিলেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, ওই নারী একজন 'সহিংস দাঙ্গাবাজ' ছিলেন এবং ঘটনার সময় তিনি ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট – আইসিই'র এজেন্টদের গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময় এক এজেন্ট তার গাড়ির দিকে 'আত্মরক্ষামূলক গুলি' ছোড়েন।

তবে শহর ও অঙ্গরাজ্যের নেতৃত্বসহ জাতীয় পর্যায়ের ডেমোক্র্যাটরা ঘটনার এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করছেন।

মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেছেন, "এটি ছিল একজন এজেন্টের বেপরোয়া ক্ষমতার ব্যবহার, যার ফলে একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে"। তিনি আইসিই এজেন্টদের উদ্দেশে বলেন, "আমাদের শহর ছেড়ে চলে যাও"।

বিভিন্ন দিক থেকে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২৫ মিনিটের দিকে মিনিয়াপোলিসের একটি আবাসিক সড়কে একটি গাঢ় লাল রঙের এসইউভি রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে ছিল। এসময় ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষকে দেখা গেছে, যাদের বিক্ষোভকারীদের মতো মনে হচ্ছে।

আশেপাশে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি অবস্থান করছিল।

মার্কিন অভিবাসন বিভাগ ইমিগ্রেসন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট - আইসিই'র কর্মকর্তারা রাস্তার মাঝখানে পার্ক করা গাড়িটির কাছে এসে ট্রাক থেকে নামেন এবং গাড়ির ভেতরে থাকা নারীকে এসইউভি থেকে নামতে নির্দেশ দেন। এক এজেন্ট চালকের পাশের দরজার হাতল টানতে দেখা যায়।

আরেক এজেন্ট গাড়ির সামনের দিকে অবস্থান নেন। তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে ঠিক কোথায় ওই কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তা বিবিসির কাছে স্পষ্ট নয়। ঠিক সেই সময় গাঢ় লাল রঙের এসইউভিটি চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে ওই এজেন্ট গুলি চালান।

তিনটি গুলির শব্দ শোনা যায় এবং গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের রাস্তায় পার্ক করা একটি সাদা গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খায়।

গুড গাড়ি চালিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে, গাড়ির সামনের দিকে থাকা এক এজেন্ট নিজের অস্ত্র বের করে টানা তিনটি গুলি ছোড়েন।

মিনিয়াপোলিসে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিচালিত এক বড় ধরনের অভিবাসন দমন অভিযানের মধ্যেই এই গুলির ঘটনা ঘটল।

অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং মিনিয়াপোলিসের বাইরেও বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওই কর্মকর্তা "নিজেকে রক্ষার জন্য আত্মরক্ষামূলকভাবে গুলি চালান" এবং যাকে গুলি করা হয়েছে তিনি তার গাড়িটিকে "অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন"।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন আইসিই কর্মকর্তার পদক্ষেপকে 'আত্মরক্ষা' হিসেবে সমর্থন করেছেন।

অন্যদিকে, মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে ফেডারেল কর্মকর্তাদের বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করে শহর থেকে আইসিই এজেন্টদের চলে যাওয়ার দাবি জানান।

যদিও ওই নারীর মৃত্যু 'প্রতিরোধযোগ্য' ছিল স্বীকার করে নিলেও আইসিইর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন নোয়েম।

ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ ঘটনাটিকে 'প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড' হিসেবে উল্লেখ করে এর নিন্দা করেছেন।

গুলির ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ অভিযোগ করেছেন, ঘটনার পর ফেডারেল এজেন্টরা গাড়িটি স্পর্শ করায় ঘটনাস্থলের প্রমাণ প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে।

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম বলেন, নিহত নারীর কর্মকাণ্ড 'অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ'-এর শামিল এবং শহরে আইসিইর অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, এক আইসিই কর্মকর্তাকে 'নৃশংসভাবে; গাড়িচাপা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "তিনি বেঁচে আছেন—এটা বিশ্বাস করা কঠিন, তবে তিনি এখন হাসপাতালে সুস্থ হয়ে উঠছেন"।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, "র‍্যাডিক্যাল লেফট" প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আইসিই এজেন্টদের "হুমকি দিচ্ছে, হামলা চালাচ্ছে এবং লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে"।

এদিকে ক্রিস্টি নোয়েম জানান, ঘটনার বিস্তারিত এখনো এফবিআইয়ের তদন্তাধীন।

তিনি আরও বলেন, বুধবার যে এজেন্ট আহত হয়েছেন, তিনি এর আগেও জুন মাসে দায়িত্ব পালনের সময় একটি গাড়ির ধাক্কায় আহত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে, মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিল বলেছে, গুড কেবল "নিজের প্রতিবেশীদের খেয়াল রাখছিলেন" এবং ওই সময় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজও ঘটনার বিষয়ে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের বর্ণনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

গুলির ঘটনা নিয়ে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির এক পোস্টের জবাবে ওয়ালজ লেখেন, "এই প্রোপাগান্ডা যন্ত্রে বিশ্বাস করবেন না"। তিনি আরও বলেন, "দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অঙ্গরাজ্য একটি পূর্ণাঙ্গ, ন্যায্য ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করবে"।

বুধবার সন্ধ্যায় শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট নেতারাও বিবৃতি দেন। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস ট্রাম্প প্রশাসনের ঘটনার বর্ণনাকে 'গ্যাসলাইটিং' (যখন নিপীড়নকারী তার দোষ এড়াতে ভিকটিমকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলার চেষ্টা করে) বলে আখ্যা দেন।

প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু দলনেতা হাকিম জেফ্রিসও বিবৃতি দেন।

গুলির ঘটনার প্রতিবাদে মিনিয়াপোলিস শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শহর থেকে আইসিই এজেন্টদের চলে যাওয়ার দাবি তুলেছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মূল সমাবেশটি গুলির স্থানে স্থাপিত অস্থায়ী স্মরণসভা কেন্দ্রকে ঘিরে হচ্ছে।

সেখানে তুষারের ওপর ফুল ও মোমবাতি দিয়ে একটি অস্থায়ী স্মরণবেদি তৈরি করা হয়। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন এবং বক্তব্য রাখেন।

মিনিয়াপোলিস স্টার-ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারী একটি ফেডারেল আদালতের প্রবেশপথে মানববন্ধন গড়ে তোলেন, যেখানে ভেতরে আইসিই কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন। তারা রেনি গুডের নাম ধরে স্লোগান দেন। একটি কাচের জানালা ভাঙার পর তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।

মিনিয়াপোলিসের বাইরেও বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নিউ অরলিন্স, মায়ামি ও নিউইয়র্ক সিটিতে সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে।

মিনিয়াপোলিসে আইসিই কেন?

যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসি'র পার্টনার প্রতিষ্ঠান সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে কল্যাণ ভাতার জালিয়াতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন মিনিয়াপোলিসে অতিরিক্ত দুই হাজার ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করেন।

বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, আইসিই শহরকে আরও নিরাপদ করছে না, "তারা পরিবারগুলোকে ছিন্নভিন্ন করছে, আমাদের রাস্তায় বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে"।

রোববার থেকে শুরু হওয়া এই মোতায়েন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শহরে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জনবলের সবচেয়ে বড় সমাবেশগুলোর একটি।

এর আগে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে আইসিই মিনিয়াপোলিসে শুরু হওয়া অভিবাসন আইনপ্রয়োগ অভিযানের অংশ, যেখানে বহিষ্কারের আদেশ জারি হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে শহরের সোমালি সম্প্রদায়ের সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

এই সোমালি সম্প্রদায়টি প্রায়ই ট্রাম্পের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তিনি তাদের 'আবর্জনা' বলে অভিহিত করেছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, "আমি তাদের আমাদের দেশে চাই না। আমি আপনাদের কাছে সৎ থাকছি। তাদের দেশের কোনো ভালো কারণ নেই। তাদের দেশ দুর্গন্ধময়"।

পরবর্তী সময়ে এক রক্ষণশীল অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতার ইউটিউব ভিডিওতে সোমালি পরিচালিত ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনার পর ট্রাম্প তার মন্তব্যে আরও কঠোর অবস্থান নেন।

ডিসেম্বরে ট্রুথ সোশালে তিনি লেখেন, "ওরা যেখান থেকে এসেছে, সেখানেই ফেরত পাঠাও"।

এর পাশাপাশি তিনি মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের জন্য ফেডারেল শিশু পরিচর্যা তহবিল স্থগিত রাখেন।

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও আইসিই এজেন্ট পাঠিয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি দেশজুড়ে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক বিস্তৃত দমন অভিযানের অংশ।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে ইরানে নিহত ১২ হাজার

সিবিএস নিউজ জানায়, টেলিফোন লাইনের সংযোগ ধীরে ধীরে সচল হওয়ায় এখন যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। এরমধ্যে দুটি সূত্র জানায়, গত কয়েকদিনের বিক্ষোভে অন্তত ১২ হাজার মানুষ মারা গেছে। তবে এ সংখ্যা ২০ হাজার হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

৬ ঘণ্টা আগে

বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রয়েছে: ভারতের সেনাপ্রধান

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সামরিক যোগাযোগ স্বাভাবিক ও অক্ষুণ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তিন বাহিনীর সঙ্গে ভারতের নিয়মিত যোগাযোগ আছে এবং কোনো স্তরেই যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়— সে লক্ষ্যেই এ যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে।

২১ ঘণ্টা আগে

ইরান সরকারের দিন শেষ হয়ে আসছে: জার্মান চ্যান্সেলর

চলমান আন্দোলনের জের ধরে ইরান সরকারের দিন শেষ হয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস। তিনি বলেছেন, পতনের মুখে থাকা ইরান সরকারের শেষ দিন ও সপ্তাহগুলো তারা দেখতে পাচ্ছেন।

১ দিন আগে

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত অন্তত ২০০০

রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনায় ‌‌‘‘সন্ত্রাসীরা’’ দায়ী। তবে বিক্ষোভ-সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক কতজন রয়েছেন, সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য দেননি তিনি।

১ দিন আগে