তাইওয়ান ও মানবাধিকার ইস্যুতে ছাড় নয়— ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে চীন

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ২৭
বেইজিংয়ের ঝংনানহাই গার্ডেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে কথা বলছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ১৫ মে ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত
বেইজিংয়ের ঝংনানহাই গার্ডেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে কথা বলছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ১৫ মে ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

তাইওয়ান ও মানবাধিকার ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘লাল রেখা’ হিসেবে উল্লেখ করে এসব বিষয়ে কোনো ছাড় না দেওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং। ওয়াশিংটনে চলতি সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে বুধবার তিনি এ অবস্থানের কথা জানান।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, শি ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে শিয়ে ফেং দুই দেশের মতপার্থক্য সামাল দিতে পারস্পরিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও জোরপূর্বক শ্রমের মতো বিষয়কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে চীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধ করা উচিত।

শিয়ে ফেং বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করলে দুই দেশই লাভবান হয়, আর সংঘাতে জড়ালে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার ভাষায়, ‘চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থ লঙ্ঘন করা যাবে না। চারটি লাল রেখা— তাইওয়ান ইস্যু, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, উন্নয়নের পথ ও ব্যবস্থা এবং উন্নয়নের অধিকার— চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আশা করে যুক্তরাষ্ট্রও একই পথে এগোবে।’

এদিকে আজ বুধবারই যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। লালগালিচা সংবর্ধনায় তাকে বরণ করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে শি জিনপিংকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে ট্রাম্পের।

এরপর বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজে সামরিক ফ্লাইওভার ও প্রায় ৫০০ সামরিক সদস্যের উপস্থিতিতে আয়োজিত হবে বর্ণিল অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর তার সঙ্গে শি জিনপিংয়ের এটি তৃতীয় বৈঠক। পাশাপাশি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর।

শি জিনপিংয়ের এবারের ওয়াশিংটন সফরে দুই দেশের সম্পর্কের নানা বিরোধপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসার কথা রয়েছে। বাণিজ্য থেকে তাইওয়ান— বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিরোধের কারণে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য।

চীন গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। তবে তাইওয়ানের সরকার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে। দ্বীপটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী ও আন্তর্জাতিক সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র। তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে ওয়াশিংটনের ওপর নিয়মিত চাপ দিয়ে আসছে বেইজিং।

তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা

গত মে মাসে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন একটি অস্ত্র প্যাকেজ তিনি আপাতত স্থগিত রেখেছেন। তিনি এটিকে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

তাইওয়ানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, চীনের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহে যেকোনো বিলম্ব তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর গতি কমানোর সরাসরি সুযোগ তৈরি করে। এতে তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনের আশপাশে চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের হাতে আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য কেনা অথবা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার মতো বিভিন্ন প্রণোদনার প্রস্তাব দিতে পারে চীন। এর মাধ্যমে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করা হতে পারে যে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা কমানো হলে বেইজিংয়ের কাছ থেকে আরও বিস্তৃত সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের আশপাশে চীনের সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও গবেষণাজাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে— এমন তথ্যও এসব জাহাজের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগের তার বা সাবমেরিন কেব্‌ল সম্পর্কিত তথ্যও রয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তাদের ‘দৃঢ় বিরোধিতার’ কথা আবারও জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়টি বলেছে, তাইওয়ান ইস্যু চীনের ‘মূল স্বার্থেরও মূল’ এবং এটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে জড়িত।

তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে শক্তি প্রয়োগের পথ চীন কখনোই পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। তবে বেইজিং বলে আসছে, তারা ‘শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন’কেই অগ্রাধিকার দিতে চায়।

বেইজিংয়ে চীনের তাইওয়ানবিষয়ক কার্যালয়ের এক মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, তাইওয়ানই ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত বাড়িয়ে তুলছে। মুখপাত্র ঝু ফেংলিয়ান বলেন, ‘স্বাধীনতার জন্য ষড়যন্ত্রই তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট এবং বর্তমান পরিস্থিতি দুর্বল করার প্রধান কারণ।’

চীন সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভুল ধারণা’

বুধবার চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত পৃথক এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন সম্পর্কে ওয়াশিংটনের ‘ভুল ধারণা’ এবং ‘কৌশলগত প্রতিযোগিতা’র ধারণা থেকে সরে আসতে না পারাই দুই দেশের জটিল সম্পর্কের মূল কারণ।

পিপলস ডেইলির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যে জটিল পথ পাড়ি দিয়েছে, তাতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে এ দাবির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

‘ঝং শেং’ ছদ্মনামে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে পিপলস ডেইলি এই ছদ্মনাম ব্যবহার করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বড় মূল্য’ দিয়ে অর্জিত দুই দেশের সম্পর্কের অনুকূল গতি ধরে রাখা, সঠিক পথে থাকা এবং বিভিন্ন ধরনের বাধা দূর করার বিষয়ে উভয় পক্ষের মনোযোগী হওয়া উচিত।

এতে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নীতিতে ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং দুই দেশের সম্পর্কে অনিশ্চয়তার পরিবর্তে স্থিতিশীলতা আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement