নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় ঈদমেলা পরিণত বাংলাদেশিদের মিলনমেলায়

জাকিয়া আহমেদ, নিউইয়র্ক থেকে
আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১০: ৫১
নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় ঈদুল ফিতর সামনে রেখে হয়ে গেছে দুই দিনের ঈদমেলা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

১৫ মার্চ, সময় সন্ধ্যা। স্থান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক মেগাসিটির জ্যামাইকার হিলসাইড এলাকা। ইফতার শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। আল আকসা পার্টি হল থেকে দলবেঁধে বেরিয়ে আসছে মানুষ। কমবেশি সবার হাতেই শপিং ব্যাগ। বোঝাই যাচ্ছে, ঈদ শপিং করেই বের হচ্ছেন সবাই। আরেকটু খেয়াল করতে আরও বোঝা গেল, হল থেকে শপিং ব্যাগ হাতে বেরিয়ে আসা সবাই মূলত বাংলাদেশি!

একটু এগিয়ে একজনের কাছে এগিয়ে যেতেই উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ’ভেতরে যান। সব পেয়ে যাবেন এক জায়গায়। বাংলাদেশি প্রোডাক্টসও আছে।’

হিলসাইডে যাওয়াটা অবশ্য জেনেশুনেই। ফেসবুকে প্রচার চলছিল আগে থেকেই।নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও কয়েকদিন ধরে আলোচনার ইস্যু একটিই— আল আকসার রেস্টুরেন্ট কমপ্লেক্সের নিচতলায় বসছে ঈদমেলা, যেখানে পাওয়া যাবে বাংলাদেশি পণ্য, দেখা মিলবে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদেরও।

’সব বাংলাদেশি’র সঙ্গে দেখা হওয়ার ’লোভ’ই টেনে নিয়ে গেল আল আকসার ঈদমেলায়। প্রত্যাশাতেও ছিল সে মেলায় থাকবে বাংলাদেশি আবহ। ভেতরে পা রাখতেই যে চিত্র ভেসে উঠল, তা ছাপিয়ে গেল কল্পনাকেও। একনজর তাকিয়ে চোখ কচলে আবার তাকাতে হলো— নিউইয়র্ক থেকে এক মুহূর্তে বেইলি রোডের কোনো মেলায় চলে এলাম কি না!

আল আকসা রেস্টুরেন্টের নিচতলার বিশাল পার্টি হলের চারপাশ জুড়ে ছোট ছোট স্টল। শিশুদের বাহারি পোশাক থেকে শুরু করে সালোয়ার কামিজ, শাড়ি, জুতা, গয়না— কী নেই! আর গোটা জায়গা জুড়ে শত শত বাংলাদেশি। পা ফেলার জায়গা নেই যেন।

ফেসবুক গ্রুপ ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’ প্রতিবছর এ মেলা আয়োজন করে। ছবি: রাজনীতি ডটকম
ফেসবুক গ্রুপ ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’ প্রতিবছর এ মেলা আয়োজন করে। ছবি: রাজনীতি ডটকম

ক্রেতারা ভীষণ ব্যস্ত তুমুল ভিড়ের মধ্যে নিজেদের পছন্দের পণ্যটি বেছে নিতে। বিক্রেতাদেরও দম ফেলার ফুসরত নেই। বেচাকেনার এ যজ্ঞের মধ্যেই দীর্ঘ বিরতিতে দেখা হওয়া বাংলাদেশি বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে গল্প আর সেলফি তো আছেই।

মেলায় ঢুকে এক পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করতে দেখা গেল, একটি স্টলের সামনে ভিড় খানিকটা বেশিই। সেদিকে এগোতে ভিড়ের কারণ বুঝতেও অসুবিধা হলো না। স্টলে দাঁড়ানো এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা টনি ডায়েস। মুখে সেই চিরচেনা হাসি, কথা বলছেন সবার সঙ্গে, এমনকি হ্যাঙ্গার থেকে নামিয়ে পোশাকও দেখাচ্ছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে স্ত্রী প্রিয়া ডায়েস। সামনেই চেয়ার-টেবিলে বসে বিক্রির হিসাব খাতায় তুলছেন তাদের কন্যা।

কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির বড়পর্দার জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা সওদাগর। তাতে ভক্তদের ভিড় আর সেলফিবাজি আরেকটু বাড়ল সেই স্টলের সামনে। বলা যায়, হলরুমের পুরো মনোযোগটা তখন কেন্দ্রীভূত সেখানেই।

সেলফিবাজি আর হুল্লোড় থেকে সরে মনোযোগ দিলাম মেলার বাকি অংশের দিকে। ঘুরতে ঘুরতে কথা হলো অনেকের সঙ্গে। জানা গেল, এ আয়োজনের উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের ফেসবুক গ্রুপ ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’। এই গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠাতা সিলভিয়া আকন্দ ও নাদিয়া চৌধুরী।

প্রতিবছর ঈদের আগে এ আয়োজন চলছে গত এক দশক ধরে। ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’র দুই প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন মেলা প্রাঙ্গণেই। কথা হলো তাদের সঙ্গেও।

সিলভিয়া আকন্দ জানালেন, ১০ বছর ধরে প্রতিবছর দুই ঈদে অথবা কোনো না কোনো ঈদের আগে এই আয়োজন করছেন তারা। এর শুরুটাও আল আকসা রেস্টুরেন্টকে সঙ্গে নিয়ে। প্রতিবছরই আল আকসা পার্টি হল তাদের নিচতলা ছেড়ে দেয় এ আয়োজনের জন্য।

নিউইয়র্কের ঈদমেলায় টনি ডায়েস ও প্রিয়া ডায়েসের উদ্যোগ টুয়েলভ ক্লদিং। ছবি: রাজনীতি ডটকম
নিউইয়র্কের ঈদমেলায় টনি ডায়েস ও প্রিয়া ডায়েসের উদ্যোগ টুয়েলভ ক্লদিং। ছবি: রাজনীতি ডটকম

এবারের মেলায় স্টল রয়েছে ৪০টি। বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য রয়েছে এসব স্টলে। এসব স্টলের উদ্যোক্তা নারীরাও বিউটিফুল লেডিস গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ফেসবুক পেজ। সারা বছর সেসব পেজ থেকেই লাইভসহ নানা ধরনের প্রচারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে।থাকেন তারা।

সিলভিয়া বলেন, ‘তারা সারা বছর ফেসবুকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করেন। ঈদের আগে কোথাও স্টল নিয়ে বসতে পারলে তাদের জন্য অনেক বেশি ফ্রুটফুল হয়। তাদের সময় যেমন পুরোটা কাজে লাগে, তেমনি কাস্টমার সার্ভিসেও দক্ষতা তৈরি হয়। মেলায় ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া মেলে। আবার নারী উদ্যোক্তারা সবাই কাছাকাছি আসতে পারেন। সব মিলিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসটা বেড়ে যায়।’

শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ— ঈদমেলায় এক ছাদের নিচে ছেলেমেয়ে সবার জন্য প্রায় সব ধরনের পণ্যেরই সমাহার রয়েছে বলে জানালেন নাদিয়া চৌধুরী।

এবার মেলার ১৩তম আয়োজন জানিয়ে সিলভিয়া বলেন, ‘এটা একদিনে হয়নি। এর পেছনে আমাদের অনেক শ্রম, সময় দিতে হয়েছে। তবে শুধু বেচাকেনা নয়, এর বড় দিকটা হলো সাংস্কৃতিক। সবাইকে একত্রিত করতে পারা, আমাদের দেশের মতাও ঈদের আমেজ তৈরি করা— এগুলো বড় পাওয়া। কিছুক্ষণ আগে দেখলাম, ১০ দিনের সন্তানকে নিয়ে এক মা এসেছেন। কারণ তার পক্ষে সন্তান নিয়ে অন্য কোথাও শপিং করতে যাওয়া সম্ভব না। আবার পুরো পরিবার একসঙ্গে এসেছেন— এমনও আছে।’

‘আমি নিজে এখানে আজ আমার স্কুলফ্রেন্ডকে খুঁজে পেয়েছি। কত বছর পর এখানে দেখা ওর সাথে! সবকিছু মিলিয়ে এ মেলা যতটা না ব্যবসায়িক, তার চেয়ে অনেক বেশি যুক্ত নানা ধরনের আবেগীয় সম্পর্ক। অনেক কিছুর বিনিময়ের একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে এই মেলা,’— বলেন সিলভিয়া আকন্দ।

নাদিয়া বলেন, এ বছর ১৪ ও ১৫ মার্চ দুই দিন হয়েছে এই মেলা। এরপর ঈদুল ফিতরের আগের দিন তথা চাঁদরাতে মেলা বসবে আরও একদিনের জন্য। সেদিন মেহেদি উৎসব হবে; থাকবে ফুচকা, চটপটি ও চায়ের স্টল।

জ্যাকসনের এ মেলার আবহ পুরোটাই বাংলাদেশি, যা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বাংলাদেশিদের মিলনমেলায়। ছবি: রাজনীতি ডটকম
জ্যাকসনের এ মেলার আবহ পুরোটাই বাংলাদেশি, যা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বাংলাদেশিদের মিলনমেলায়। ছবি: রাজনীতি ডটকম

আমার মতোই দ্বিতীয় দিন ১৫ মার্চ মেলায় গিয়েছিলেন জেবুন্নেছা জোৎস্না। ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, রাত সাড়ে ৯টাতেও পিপড়ার সারির মতো লাইনে যখন আল আকসা পার্টি হলে ঢুকছি, তখন আরেকটি লাইনে মানুষ বের হচ্ছে। দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএর আয়োজনে ঈদের মেলায় পোশাক দেখব কী, শুধু মানুষ আর মানুষ। কেনাকাটাও চলছে, সোজা বাংলা ভাষায় যাকে বলে ‘ধুমায়ে’!

মেলায় টনি ডায়েস-প্রিয়া ডায়েস দম্পতি রয়েছেন তাদের উদ্যোগ ‘টুয়েলভ ক্লদিং’ নিয়ে। টনি ডায়েস বলেন, ‘আমাদের শতভাগ বাংলাদেশি পণ্যের ব্রান্ড। এখানে এথনিক, ওয়েষ্টার্ণ সব ধরনের পোশাকই রয়েছে। দেশে আমাদের ৪১টি শপ আছে। অনলাইনে অর্ডার করলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে আমরা কাপড় পৌছে দিচ্ছি। আর ইউএসের বিভিন্ন স্টেটে নানা ধরনের মেলায় সবসময়ই অংশ নিচ্ছি।’

‘আমরা আমাদের পণ্যের মান নিয়ে আপসহীন। এ কারণে আমাদের রিপিটেড কাস্টমার বেশি। অর্থাৎ কেউ একবার আমাদের পোশাক কিনলে আবার ফিরে আসেন। আমাদের লক্ষ্য, পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশের নেক্সট জেনারেশনের কাছে শতভাগ বাংলাদেশি পণ্য পৌঁছে দেওয়া,’— বলেন টনি ডায়েস।

তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন ডা. শাকিলা শিমু। মেলার একটি স্টলের সামনে কথা হলো তার সঙ্গে। বললেন, নিউইয়র্কে যেসব দোকান রয়েছে সেখানের কালেকশন তার খুব একটা পছন্দ হয় না। কারণ সেসব দোকানে বাংলাদেশের তুলনায় অন্য দেশের কালেকশন বেশি। কিন্তু তিনি দেশীয় পোশাকেই স্বচ্ছন্দ।

‘ঈদের আগে এই মেলায় ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন থেকে শুরু করে সব রঙের কাপড় পাওয়া যায়, যেগুলো একদমই বাংলাদেশি। এ রকমই একটা পোশাক নিয়েছি নিজের জন্য। বাংলাদেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশের সুতার তৈরি বাংলাদেশের কাপড়র পরব— এটাই তো একটা বড় আনন্দ,’— বলেন ডা. শিমু।

মেলায় ভারতীয় পোশাক নিয়ে অংশ নিয়েছে জালিমা ফ্যাশন। স্টলটির বিক্রয় কর্মী নুরুজ্জামান হাওলাদার বলেন, ‘বিক্রি খুব ভালো। ডিজাইন, রং, নতুনত্ব সব মিলিয়ে আমাদের পোশাকও খুব নজর কেড়েছে সবার। তবে সবচেয়ে বড় কথা, এটা যাতটা না পোশাকের মেলা তার চেয়েও বেশি বাঙালি, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের মিলনমেলা।’

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার যে দীর্ঘ ইতিহাস

তালেবান যখন প্রথম দফায় আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল, সেই ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে, মাত্রই হাতে গোনা কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পাকিস্তান সেগুলির অন্যতম।

৪ ঘণ্টা আগে

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র পুরো বিশ্বকে রক্ষা করছে: নেতানিয়াহু

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জিতছি এবং ইরান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির হুমকি নির্মূল করা, যাতে সেগুলো ভূগর্ভে স্থানান্তরের আগেই ধ্বংস করা যায়।

৭ ঘণ্টা আগে

মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে হামলার ভিডিও প্রকাশ করল ইরান

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর কোনো যুদ্ধবিমানে ইরানের হামলার এটাই প্রথম ঘটনা। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরায়েলও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এফ-৩৫ ব্যবহার করছে।

৭ ঘণ্টা আগে

গাজায় জাতিগত নিধন: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের পক্ষ নেবে না জার্মানি

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেখানে জাতিগতভাবে নিধন করে ফিলিস্তিনিদের নির্মূল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সে অভিযোগ নিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বারস্থ হয় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের।

৭ ঘণ্টা আগে