হরমুজ খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের 'আচরণ সংশোধন'সহ কঠোর শর্ত ইরানের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের অবসান এখনো ঘটেনি। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দিতে আরও কঠোর শর্ত দিয়েছে ইরান। তেহরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র তার আচরণ সংশোধন না করা পর্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ পথ খুলবে না। এর মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে। ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

দ্য গার্ডিয়ান ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার (৮ আগস্ট) ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল হরমুজ প্রণালি খুল দিতে ইরানের শর্তগুলো তুলে ধরে। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে 'তার আচরণ সংশোধন' করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে কাউন্সিলের সচিব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরের একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কখনো ইরানকে হুমকি দেওয়া চলবে না। ইরান ও অঞ্চলটিতে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে ওয়াশিংটনকে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির 'সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ' দেওয়া, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ 'নিঃশর্তভাবে' ছাড়ার দাবিও জানিয়েছে তেহরান।

ইরানের এই দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এর আগে স্পষ্ট করেছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত তারা অবরোধ প্রত্যাহার করতে চায় না।

গত জুনে সই হওয়া একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির কাঠামো তৈরির কথা ছিল। ওই সমঝোতায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের পরিকল্পনা এবং ইরানের বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ নিয়ে আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার বলেছেন, জাহাজ চলাচলের বিষয়ে দুপক্ষ একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশেষ করে কোন পথে জাহাজ চলাচল করবে, সেই 'ট্রানজিট রুট' নির্ধারণের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া অন্য কিছু শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে বলেও স্পষ্ট করেন আরাগচি। এ পরিস্থিতির জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী সমঝোতা লঙ্ঘনকে দায়ী করেন।

আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে ওমান। শনিবার দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আলোচনা 'ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে' অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়েছে মাসকাট।

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করলেও এখন ইরান কার্যত সেখানে অবরোধ তৈরি করেছে। তেহরান প্রণালিটি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়ারও দাবি করছে। একই সঙ্গে ইরান অভিযোগ করছে, কিছু জাহাজ তাদের নির্ধারিত পথ এড়িয়ে চলাচলের চেষ্টা করছে এবং এসব জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলাও চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কোনো ধরনের টোল আরোপের বিরোধিতা করছে। তবে জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতায় ভবিষ্যতে প্রণালিটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হতে আর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় বাকি। তবে প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান সময়ই একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে তার বক্তব্য, 'দেশে সংহতি, শক্তি ও ঐক্য রয়েছে এবং যতদূর আমি জানি, এই যুদ্ধে ইরানকে বিজয়ী ও শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।'

তবে হরমুজে নতুন হামলার ঘটনা আলোচনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শনিবার আবুধাবির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ও গ্যাস কোম্পানি অ্যাডনকের একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজে চলমান হামলার অংশ হিসেবেই ইরান ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

অ্যাডনক জানিয়েছে, হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। তবে কোম্পানিটির দাবি, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় তাদের এক ডজনের বেশি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলায় একজন নাবিক নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হয়েছেন।

পরে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস কেন্দ্র জানায়, ওমানের খাসাব শহরের পূর্বদিকে একটি জাহাজে কোনো ধরনের প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং জাহাজ ও এর নাবিকরা নিরাপদে রয়েছেন। তবে এটি অ্যাডনকের জাহাজে হামলার একই ঘটনা কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। যুদ্ধের পর থেকে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।

এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পেছনেও হরমুজ প্রণালিতে ধারাবাহিক হামলাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরপর মধ্যস্থতাকারীরা বারবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে জুনের সমঝোতার শর্তে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এখন নতুন করে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— ইরানের কঠোর শর্ত মেনে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত এবং হরমুজ প্রণালি আবার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কবে খুলবে। চুক্তির সময়সীমা যখন দ্রুত এগিয়ে আসছে, তখন প্রণালিতে নতুন হামলা ও পালটা হুমকি সেই সমঝোতার সম্ভাবনাকেই আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির ঐতিহাসিক জয়, মের্ৎসের দলে ধাক্কা

চূড়ান্ত ফলে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রথম হয়েছে এএফডি। বিপরীতে মের্ৎসের সিডিইউ পেয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। এ ভোটকে সিডিইউয়ের জন্যও বড় ধাক্কা মনে করা হচ্ছে।

১৭ ঘণ্টা আগে

মালয়েশিয়ায় পাসপোর্ট-ভিসাহীনদেরও আইনিভাবে দেশে ফেরার সুযোগ

তরিকুল ইসলাম বলেন, অনিয়মিত বা নথিবিহীন বিদেশি অভিবাসীদের জন্য বর্তমানে ‘মাইগ্র্যান্ট রিপেট্রিয়েশন প্রোগ্রাম ২’ (বিআরএম২.০) নামে মালয়েশিয়ার সরকারের মাইগ্রেশন বিভাগের একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বা নথিবিহীন বিদেশি নাগরিক বা কর্মীরা আইনসম্মতভা

১৭ ঘণ্টা আগে

পুতিন-জেলেনস্কির মাঝে ফের ট্রাম্প প্রশাসন, মিলবে কি যুদ্ধবিরতি?

মার্কিন এই কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও মস্কো এখনো যুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো তুলে ধরে আসছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। রাশিয়া ইউক্রেনের দখল করা ভূখণ্ড নিয়ে নিজেদের দাবি, ইউক্রেনের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অব

১৯ ঘণ্টা আগে

দিল্লিতে পিজি ভবন ধসে নিহত ৩, ধ্বংসস্তূপে বহু শিক্ষার্থী আটকে থাকার শঙ্কা

পুলিশ জানিয়েছে, ভবনটি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো ছিল। এতে একটি বেজমেন্টের ওপর পাঁচটি তলা ছিল এবং সেটি পিজি আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ভবনের বেজমেন্টে সংস্কার ও খননকাজ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই কাজের সময় ভবনের একটি স্তম্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পুরো কাঠামোটি ধসে পড়ে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের

১ দিন আগে
Advertisement