এবার পাহাড়ের দিকে হুতিরা, শেষ মুহূর্তে হামলা বাতিল করলেন ট্রাম্প

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে। লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এবার কৌশলগত পাহাড়ি এলাকা দখলের দিকে এগোচ্ছে হুতি বাহিনী। অন্যদিকে হুতিদের অবস্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি আরব। এর মধ্যেই সৌদি আরবের অনুরোধে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হুতিরা তাইজ ও লাহিজ প্রদেশের কাহবুব পর্বতমালা দখলের চেষ্টা করছে। ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে রেড সি উপকূলের হুতি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে আল-ওয়াজিয়াহ ও রাস আল-আরা এলাকায় তীব্র লড়াই চলছে।
চলতি মাসে হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের রেড সি উপকূলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর মধ্যে কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং বাব এল-মান্দেবের কাছাকাছি অবস্থানও রয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরব শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে বলে হুতিরা দাবি করেছে। ইয়েমেনের সামরিক সূত্রগুলোও সৌদি বিমান হামলার কথা জানিয়েছে। তবে এসব হামলায় হুতিদের স্থল অগ্রযাত্রা এখনো থামেনি।
রিয়াদে প্রথম সরাসরি হামলার দাবি
সংঘাতের সবচেয়ে বড় সাম্প্রতিক উত্তেজনা তৈরি হয় শনিবার। হুতিরা দাবি করে, তারা সৌদি রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পরে জানায়, রিয়াদের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
রিয়াদে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং বিমানবন্দরের কাছে ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী দেখা যায়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কথা জানায়নি। একই সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবুতে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনাতেও হামলার দাবি করে। ইয়ানবু সৌদি তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এর আগে সৌদি আরব দাবি করেছিল, হুতিদের একটি ড্রোন মক্কার দিকে যাওয়ার পথে ধ্বংস করা হয়েছে। হুতিরা ওই হামলার দাবি অস্বীকার করে। সংঘাতের সাম্প্রতিক পর্যায়ে সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন ইয়েমেনি নিহত হওয়ার কথাও সৌদি আরব জানিয়েছে।
সৌদির অনুরোধ, কিন্তু হামলা থেকে সরে গেলেন ট্রাম্প
হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি ট্রাম্পের কাছে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারও ওয়াশিংটনের কাছে সহায়তা চেয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স জানায়, রোববার মার্কিন বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এমনকি বিমানগুলোতে বোমা তোলার কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প অভিযানটি বাতিল করে দেন।
ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি রোববার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। তবে ওই ফোনালাপে ট্রাম্প সরাসরি কোনো সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেননি বলে রয়টার্সের চারটি সূত্র জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ২০২৫ সালে প্রায় দুই মাস হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছিল। পরে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সেই অভিযান বন্ধ হয়। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ইয়েমেন সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়ায়নি। হুতিরাও জানিয়েছে, তারা মার্কিন জাহাজে হামলা করবে না।
সংঘাতের প্রভাব তেল ও নৌপথে
হুতি-সৌদি লড়াই এখন শুধু ইয়েমেন বা সৌদি নিরাপত্তার বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং রেড সি ও বাব এল-মান্দেবের নিরাপত্তার ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
সৌদি আরব এতদিন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ও রেড সি বন্দর ব্যবহার করছিল। কিন্তু হুতিদের রেড সি উপকূলের অগ্রযাত্রায় সেই বিকল্প পথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ফলে সৌদি আরব এখন হরমুজ দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়াচ্ছে। স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনে হরমুজ দিয়ে সৌদি তেল প্রবাহ বেড়ে প্রায় ২৯ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন হয়েছে, আগস্টে যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল।
জাতিসংঘের হিসাবে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইয়েমেনে প্রায় ৭০০ মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। দেশের ভেতরে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আরও তিন হাজারের বেশি মানুষ নৌকায় করে আফ্রিকার দিকে পালিয়েছেন।
ফলে হুতি-সৌদি সংঘাত এখন একই সঙ্গে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, সৌদি নিরাপত্তা, বাব এল-মান্দেবের নৌপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলছে। আর ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে নামবে কি না— সেটিই পরিস্থিতির পরবর্তী বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।





















