হরমুজে জাহাজে আগুন, অল্পের জন্য রক্ষা পেল ক্রুরা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি। ওই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে ‘অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল’ আঘাত হানার পর সেটিতে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং জাহাজটি আবারও যাত্রা শুরু করেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সোমবার ঘটেছে এ ঘটনা। ওই জাহাজের সব ক্রু নিরাপদে রয়েছেন।
বিবৃতিতে ইউকেএমটিও বলেছে, সোমবার সন্ধ্যায় জাহাজটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় অজ্ঞাত কোনো প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জাহাজে আগুন ধরে গেলেও পরে তা নিভিয়ে ফেলা হয়। জাহাজটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পরিবেশগত কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। জাহাজটির কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।
হামলার ধরন নিয়ে আরও কোনো বিস্তারিত জানায়নি ইউকেএমটিও। প্রজেক্টাইলটি কোথা থেকে ছোড়া হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত কিংবা জাহাজটির পরিচয়— এর কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ঘটনাটিকে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হামলা হিসেবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন হরমুজ প্রণালি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংঘাতস্থলে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করলেও সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যাটি তার তুলনায় অনেক নিচে নেমে এসেছে। ২৪ সেপ্টেম্বরের হিসাবে এক দিনে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি পার হয়েছিল, যেখানে আগের ১০ দিনের গড় ছিল ১৭টি।
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। তেহরান বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে অননুমোদিতভাবে জলপথ অতিক্রমের অভিযোগ তুলে তাদের চলাচলে বাধা দিয়েছে এবং কিছু জাহাজে হামলাও হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি কার্যত সামরিক চাপ ও পালটা চাপের মধ্যে পড়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজে জাহাজে হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে দুই ক্রু সদস্য সামান্য আহত হন। ইউকেএমটিও তখন জানিয়েছিল, জাহাজটি নিজস্ব শক্তিতে পরবর্তী বন্দরের দিকে যেতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে আরও কয়েকটি ঘটনায় জাহাজে আগুন লাগা এবং ক্রুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
তবে একই সময়ে হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কাতারের এলএনজি বহনকারী কিছু জাহাজ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রণালিটি দিয়ে আবার চলাচল শুরু করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এতে বোঝা যায়, নিরাপত্তা ঝুঁকি সত্ত্বেও কিছু জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি ব্যবহার করছে।
হরমুজের ওপর চাপের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোও বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। সৌদি আরব সম্প্রতি ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন মেরামত করে আবার চালু করেছে। এর মাধ্যমে পারস্য উপসাগর এড়িয়ে সৌদি তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে রপ্তানি করা সম্ভব। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে তেল সরবরাহ বেড়েছে।
এদিকে হরমুজ পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করছেন এবং তেহরান হরমুজ খুলে দেওয়ার বিষয়ে শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিরতি, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সমঝোতা না হলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।


















-c8cdac-256x144.webp)