মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ‘বড়’ হামলায় ইরান যুদ্ধ ‘পরবর্তী পর্যায়ে’ নেওয়র ইঙ্গিত ট্রাম্পের

কয়েকদিন আগেই ‘খুব শিগগিরই’ ইরান যুদ্ধ শেষ করার কথা জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরাবরের মতোই দুয়েকদিন যেতে না যেতেই বিপরীত পথে হেঁটেছেন তিনি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামার কোনো নিশ্চয়তা না দিয়ে উলটো বলেছেন, ইরানের দেওয়া সবশেষ প্রস্তাবগুলো অগ্রহণযোগ্য। ফলে নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ‘বড়’ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যুদ্ধ ‘পরবর্তী পর্যায়ে’ পৌঁছে যেতে পারে।
টাইম ম্যাগাজিনে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের এমন অবস্থান উঠে এসেছে। এ সাক্ষাৎকারেও তার অন্যান্য বক্তব্যের মতোই অনেক কিছুরই স্পষ্ট উত্তর দেননি তিনি।
ট্রাম্পকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবার বোমাবর্ষণ শুরু হতে পারে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘সম্ভব।’ তবে কবে বা কী পরিস্থিতিতে এমন হামলা হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
এ বক্তব্য এমন একসময়ে এলো, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত অচলাবস্থার মুখোমুখি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে থাকা ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। কাতার এ আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিল। সাম্প্রতিক সময়ের এ উদ্যোগে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। উলটো গণমাধ্যমে খবর এসেছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের প্রতিনিধিদলকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্পই চেয়েছিলেন যুদ্ধ ‘দীর্ঘায়িত হোক’
টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তার সিদ্ধান্তের কারণেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে। কারণ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরই যুদ্ধ থামানোর সুযোগ ছিল। তবে তিনি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ইরান যদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, এই যুদ্ধ ছয় থেকে আট সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন সাত মাস পেরিয়ে অষ্টম মাসে গড়িয়েছে। কেন ইরান যুদ্ধ এত দীর্ঘায়িত হলো— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘কারণ আমি আরও এগোতে চেয়েছিলাম।’
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বি-টু বোমারু বিমান দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরই অভিযান থামানো যেত। তবে তার দাবি, ইরানি কর্মকর্তারা আবারও তাদের কার্যক্রম শুরু করতে ‘উদগ্রীব’ ছিলেন। একই জায়গায় শুরু করা সম্ভব না হলেও অন্য কোথাও তারা সেই কার্যক্রম শুরু করতে পারতেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি সেখানেই থামতে পারতাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, সেটা ঠিক হবে না। আমরা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম, ইরান যেন ‘অন্য কোনো রূপে ফিরে আসতে’ না পারে।
আরও কয়েকবারের মতো কয়েকদিন আগে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়া’র হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি সেটা করতে পারি।’
ওই সময় এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, নিজেকে ‘প্রেসিডেন্ট অব পিস’ দাবি করা একজন মানুষ কীভাবে ‘একটি দেশকে ধ্বংস করে দেওয়া’র কথা বলতে পারেন? জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে আমরা বিশ্বে শান্তি এনেছি। আমার মনে হয় না, ইরানের সঙ্গে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।’
ট্রাম্পের কাছে ইরানের প্রস্তাব ‘যথেষ্ট নয়’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় কাতারের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। তেহরানের প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ ও তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবে ইরানের জব্দ করা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড় এবং তেল নিষেধাজ্ঞায় ছাড়ের বিষয়ও ছিল। বিনিময়ে ইরান যুদ্ধ থামানো ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রস্তাব দেয়। ট্রাম্প সেটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জবাব তেহরানের কাছে পৌঁছেছে এবং সেটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এখানেই বর্তমান সংকটের বড় বৈপরীত্য। ওয়াশিংটন বলছে চাপ অব্যাহত থাকবে, আর তেহরান একদিকে আলোচনার দরজা খোলা রাখছে, অন্যদিকে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইরানও বড় পালটা হামলার প্রস্তুতিতে
রয়টার্স জানিয়েছে, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে আগের চেয়ে শক্তিশালী পালটা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। দেশটির সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন।
তিন ইরানি কর্মকর্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনের বরাতে রয়টার্স বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্থাপনার বাইরে যেসব দেশ মার্কিন সামরিক অভিযানকে সহায়তা করছে, সেসব দেশের স্বার্থও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানে হামলার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকেও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো সম্ভাব্য সংঘাতে যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ নতুন মার্কিন হামলা হলে সংঘাতটি আবার শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বড় চাপ হরমুজ নিয়ে
এই সংঘাতে হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ চাপের কেন্দ্রে রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির ওপর সংঘাতের প্রভাব এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পড়েছে। ইরান হরমুজকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইয়েমেনে হুতিদের তৎপরতা। হরমুজের পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব প্রণালিও ঝুঁকিতে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সঙ্গে চাপে পড়তে পারে। এতে তেল সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে মার্কিন নির্বাচন
ইরান যুদ্ধের সময়সূচি এখন মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। ট্রাম্প এরই মধ্যে ৩২ দিনের নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছেন। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুদ্ধটি রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে বাড়তে থাকা জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মার্কিন ভোটারদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া শুধু পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, এর অর্থনৈতিক প্রভাবও নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে ট্রাম্প টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছেন, তিনি মনে করেন ইরানের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতা হতে পারে। একই সাক্ষাৎকারে তিনি আবারও যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে হামলার সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের বার্তায় একই সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা এবং সামরিক চাপ— দুই পথই রাখা হচ্ছে।
তাহলে ইরান যুদ্ধ কোন পথে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে— নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচন, ইরানের সঙ্গে আটকে থাকা কূটনৈতিক আলোচনা ও হরমুজকে ঘিরে সামরিক চাপ।
যুদ্ধ এখনই বড় আকারে আবার শুরু হবে— এমন সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখছে। তেহরান বলছে, তারা আলোচনার পথ বন্ধ করছে না, একই সঙ্গে নতুন হামলার জন্য পালটা ব্যবস্থা নিচ্ছে। আর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেও ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
ফলে আপাতত এক ধরনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও সামরিক প্রস্তুতির মধ্যবর্তী অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ইরান যুদ্ধ। নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত এই টানাপোড়েন কতটা বাড়ে, আর নির্বাচনের পর ট্রাম্প সত্যিই নতুন করে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেন কি না— সেটিই এখন ইরান যুদ্ধের পরবর্তী গতিপথের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

-004425.jpg)

-38a187.jpg)













-004425-256x144.webp)



