প্রেসিডেন্টের খবর নিয়ে নতুন চ্যানেল হোয়াইট হাউজের, ‘মিডিয়া যুদ্ধে’ ট্রাম্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর বয়কটের মুখে ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু করেছে হোয়াইট হাউজ। ছবি: ট্রাম্প টিভির থাম্বনেইল
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর বয়কটের মুখে ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু করেছে হোয়াইট হাউজ। ছবি: ট্রাম্প টিভির থাম্বনেইল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেশটির গণমাধ্যমের সংঘাত এবার নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হোয়াইট হাউজ থেকে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো সরে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের যৌথ ‘টিভি পুল’ থেকে। এ অবস্থায় ‘ট্রাম্প টিভি’ নামে ২৪ ঘণ্টার নতুন ভিডিও চ্যানেল চালু করেছে হোয়াইট হাউজ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির খবরে বলা হয়, ‘ট্রাম্প টিভি: দ্যা এসেনশিয়ালস স্টেশন’ নামের এই ডিজিটাল চ্যানেলটি ২১ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজের ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে চালু হয়। এতে ট্রাম্পের বক্তব্য, প্রশাসনের ঘোষণা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভিডিও এবং আগের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো সম্প্রচার করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউজের ঘোষণা, চ্যানেলটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে এবং নতুন কনটেন্ট নিয়মিত যুক্ত হবে।

হোয়াইট হাউজের এ উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ঘটনাপ্রবাহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত মিডিয়াগুলোর একটি বড় অংশ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কার্যক্রমের নিয়মিত ভিডিও কভারেজ বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর হোয়াইট হাউজের নতুন এই চ্যানেলের ঘোষণাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘মিডিয়া যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সংঘাতের শুরু ১৮ সেপ্টেম্বর। সেদিন ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এসব সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তিনি ‘ফেক নিউজ’ প্রকাশের অভিযোগ করেন। পরদিন সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিক ও কর্মীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। তিন প্রতিষ্ঠানই পরে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে এই নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জ করেছে।

সোমবার পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নেয়। হোয়াইট হাউজের প্রেসিডেন্ট টিভি পুলে থাকা এবিসি, সিবিএস, সিএনএন, ফক্স নিউজ ও এনবিসি— এই পাঁচ নেটওয়ার্কের মধ্যে সিএনএনকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে বাকি চার নেটওয়ার্কও প্রেসিডেন্টের ‘পুল’ কভারেজ স্থগিত করে।

এই টিভি পুলব্যবস্থায় একটি নেটওয়ার্ক পালা করে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান ধারণ করে এবং সেই ভিডিও অন্য নেটওয়ার্ক ও সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেয়। ফলে সিএনএনকে বাদ দেওয়ার পর অন্য নেটওয়ার্কগুলো তার জায়গা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এর সরাসরি প্রভাবও দেখা যায়। হোয়াইট হাউজের নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের বক্তব্য টেলিভিশনে স্বাভাবিকভাবে সম্প্রচার করা যায়নি। ভিডিওতে ট্রাম্পকে দেখা গেলেও তার বক্তব্যের বদলে শোনা যাচ্ছিল হেলিকপ্টারের শব্দ।

এই সম্প্রচার-শূন্যতার মধ্যেই সামনে আসে হোয়াইট হাউজের নতুন উদ্যোগ। ‘ট্রাম্প টিভি’ কোনো প্রচলিত টেলিভিশন নেটওয়ার্ক নয়, এটি মূলত হোয়াইট হাউজের নিজস্ব ২৪/৭ অনলাইন ভিডিও স্ট্রিম।

হোয়াইট হাউজের ভাষায়, এখানে প্রশাসনের ‘সেরা মুহূর্ত’, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, ঘোষণা এবং সর্বশেষ কার্যক্রম এক জায়গায় পাওয়া যাবে। চ্যানেলটি ইউটিউবের পাশাপাশি হোয়াইট হাউজের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও প্রচার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট কী বলেছেন বা কী করেছেন— সেটি এখন দর্শকের কাছে পৌঁছাতে টেলিভিশন নেটওয়ার্কের ক্যামেরা বা নিউজরুমের সম্পাদনার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করবে হোয়াইট হাউজ।

ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ‘ফিল্টার’ এড়িয়ে সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানোর একটি ব্যবস্থা। কিন্তু সমালোচকদের কাছে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়— সরকার নিজেই যদি সংবাদযোগ্য ঘটনাগুলোর ভিডিও তৈরি, নির্বাচন ও পরিবেশন করে, তাহলে সেটিকে সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে কতটা দেখা যায়?

সংবাদ না সরকারি প্রচার?

‘ট্রাম্প টিভি’ চালুর পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো— এটি কি সংবাদমাধ্যম নাকি সরকারি প্রচার? টাইম জানিয়েছে, সমালোচকরা নতুন এই ২৪ ঘণ্টার ফিডকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার অবশ্য নতুন কিছু নয়। হোয়াইট হাউজ বহু বছর ধরে ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও সরকারি অনুষ্ঠানের ভিডিও প্রকাশ করে আসছে। তবে এবারে সেটিকে ২৪ ঘণ্টার স্ট্রিম হিসেবে হাজির করা হয়েছে। আর সেটি করা হচ্ছে এমনএক সময়ে যখন বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো প্রেসিডেন্টের পুল কভারেজ বন্ধ রেখেছে।

চ্যানেলটির প্রাথমিক সম্প্রচারে ট্রাম্পের পুরোনো বক্তব্য ও প্রশাসনের বিভিন্ন ভিডিও দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল সরাসরি সংবাদ সম্প্রচার নয়, প্রশাসনের বেছে দেওয়া পুরোনো ও নতুন কনটেন্টের একটি ধারাবাহিক প্রদর্শনও এর অংশ।

আদালতেও চলছে লড়াই

এই সংঘাত এখন একই সঙ্গে আদালত ও গণমাধ্যম— দুই জায়গাতেই চলছে। সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকো তাদের হোয়াইট হাউজে প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি নিয়ে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের ধরন অপছন্দ করার কারণে প্রশাসনের এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে সুরক্ষিত সংবাদমাধ্যমের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, সংবাদমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশের অধিকার আর হোয়াইট হাউজের ভেতরে প্রবেশাধিকার— দুটি আলাদা বিষয়।

এর মধ্যেই ‘ট্রাম্প টিভি’ কার্যত আরেকটি বার্তা দিয়েছে— প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে পৌঁছাতে হোয়াইট হাউজ প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প ও সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এখন শুধু ‘কে কাকে কভার করবে’— সেই প্রশ্নে আটকে নেই। প্রশ্নটি আরও বড়— প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের ছবি ও বক্তব্য জনগণের কাছে পৌঁছানোর পথটি কি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের হাতে থাকবে, নাকি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় নিজেই সেই পথের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করবে?

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement