হরমুজ খোলার ঘোষণায় পড়ল তেলের দাম, তবু অনিশ্চয়তা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালি। প্রতীকী ছবি

যুদ্ধবিরতির বাকি সময়ের জন্য ইরান হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি খোলা’ রাখার ঘোষণার পরপরই তেলের বাজারে ধস নেমেছে। এ ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম (ব্রেন্ট ক্রুড) নেমে এসেছে ৮৮ ডলারে, যা দিনের শুরুতে ছিল ৯৮ ডলার। সে হিসাবে ইরানের এক ঘোষণাতেই তেলের দাম কমেছে ১০ শতাংশের বেশি।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাতে ইরান হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ঘোষণা দেয়। ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত সংকীর্ণ এই নৌ রুট দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। বিশ্লেষকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঘোষণায় তারা স্বস্তিবোধ করলেও এখনই নির্ভার হতে পারছেন না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে সামুদ্রিক সংস্থাগুলো ইরানের ঘোষণার পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। ফলে এখনই তারা কোনো মন্তব্য করেনি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তার দেশের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল যুদ্ধবিরতির বাকি সময়ের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

ইরানের ঘোষণার পর বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং নাসডাক ও ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ যথাক্রমে ১ দশমিক ৩ শতাংশ ও ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।

ইউরোপীয় বাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। প্যারিসের ক্যাক ও ফ্রাঙ্কফুর্টের ড্যাক্স সূচক প্রায় ২ শতাংশ এবং লন্ডনের এফটিএসই ১০০ প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে।

সরবরাহে বড় ধাক্কা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরপরই কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। ফলে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিরর মাঝামাঝিতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৬৫ ডলারের আশপাশে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাবে মার্চে তা ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এক দফা ও এবার ইরানের হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ঘোষণার পর আরেক দফা বড় পতন হলো তেলের দামে।

নিরাপত্তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

ইরান হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ খোলা’ বলে দাবি করার পর ট্রাম্প এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘ইরান ঘোষণা করেছে যে প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত... ধন্যবাদ!’ তিনি আরও দাবি করেন, ইরান ‘আর কখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না।’

এর পরপরই আরেক পোস্টে ট্রাম্প জানান, স্থায়ী চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলোও এখনো ইরানের ঘোষণা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ব্যালিস্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সলের (বিমকো) প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা জ্যাকব লারসেন বলেন, নৌ পথে মাইন হুমকির অবস্থা এখনো অস্পষ্ট। তাই শিপিং কোম্পানিগুলোর ওই এলাকা এড়িয়ে চলার কথা বিবেচনা করা উচিত। এই মুহূর্তে ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম নিরাপদ ঘোষণা করা হয়নি।

এদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গোজ বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর ঘোষণা ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা’ ও নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার শর্ত পূরণ করছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

হরমুজ বন্ধের প্রভাব সবখানেই

তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব জুড়ে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বেড়েছে। শঙ্কা তৈরি হয়েছে জেট ফুয়েলের সরবরাহ নিয়েও। ফলে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

শুধু জ্বালানি নয়, কৃষিখাতেও প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার তৈরির কাঁচামাল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে যুদ্ধের পর সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুধু তাই নয়, হরমুজ প্রণালি প্রায় দেড় মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকায় সরবরাহ শৃঙ্খল যেভাবে ব্যাহত হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এক শিপিং অপারেটর বিবিসিকে বলেন, ‘এ ঘোষণায় এখনই কিছু বদলাবে না। আমরা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে চাই না। আমরা প্রথম জাহাজ হয়ে প্রণালি পার হব না।’

তেলবাহী জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান স্টেনা বাল্কও জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চলাচল করবে না।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ কিয়েরান টম্পকিনস বলেন, এই যুদ্ধবিরতি মাত্র সীমিত সময়ের সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে কিছু জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

অন্যদিকে বেইজ বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ম্যানমোহান সোধি সতর্ক করে বলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে স্থায়ী শান্তি চুক্তি হলেও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগবে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ঘোষণায় বাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিললেও বাস্তব ঝুঁকি এখনো কাটেনি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আস্থা সংকট ও নিরাপত্তা উদ্বেগ দূর না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, এএফপি, রয়টার্স

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

সোমবার পাকিস্তানে আবারও বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

ইসলামাবাদ এবং পার্শ্ববর্তী শহর রাওয়ালপিন্ডিতে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে, কারণ অন্যান্য প্রদেশ থেকে হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী আসতে শুরু করেছে। সাধারণত ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন হলে ইসলামাবাদ প্রশাসন অনান্য প্রদেশগুলোর কাছে সহায়তা চেয়ে থাকে।

৪ ঘণ্টা আগে

হরমুজ প্রণালি খুলে দিল ইরান, নমনীয় বার্তা ট্রাম্পের

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি এখন সম্পূর্ণ খোলা এবং ব্যবসার জন্য প্রস্তুত। তবে ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ (নেভাল ব্লকেড) বহাল থাকবে।’

১৬ ঘণ্টা আগে

অভিবাসীদের বৈধতা দিতে শুরু করেছে স্পেন, আশা-উৎকণ্ঠায় আবেদনকারীরা

স্পেনে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বৈধ করার লক্ষ্যে দেশটির বামপন্থি সরকারের গণ-বৈধকরণ প্রকল্প চালু হয়েছে। এ উদ্যোগকে ঘিরে অভিবাসীদের মধ্যে যেমন নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেখা দিয়েছে নানা উৎকণ্ঠা ও দৌড়ঝাঁপ।

১৮ ঘণ্টা আগে

সমুদ্রপথে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর ২০২৫

২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্রপথে চলাচলের ক্ষেত্রে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর।

১৯ ঘণ্টা আগে