ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চান ট্রাম্প, হাতে যেসব উপায়

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতীকী ছবি

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর এক দিন আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, আগামী সপ্তাহেই ইরানের বিরুদ্ধে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। ফলে যুদ্ধ ও সামরিক চাপের পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে ওয়াশিংটন কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস কয়েক দশকের। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পরও নিষেধাজ্ঞার পরিধি দ্রুত বেড়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল অফিসের (ওএফএসি) তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এক হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও উড়োজাহাজকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওয়াশিংটন দেশটির ছায়া তেলবহর, জাহাজ চলাচলের বিমাকারী প্রতিষ্ঠান, অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এমনকি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের আনুমানিক ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদও জব্দ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের ওপর চাপ আরও বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কয়েকটি বড় বিকল্প রয়েছে।

চীনের ‘টি-পট’ রিফাইনারিতে নিষেধাজ্ঞা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে চীনের ছোট স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো, যেগুলো ‘টি-পট রিফাইনারি’ নামে পরিচিত। চীনের মোট শোধন সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে। ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনে থাকে। ফলে ইরানি তেলের বড় অংশের ক্রেতা এসব স্বাধীন শোধনাগার।

যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানি তেল কেনা বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের নিরুৎসাহিত করেছে। কিন্তু চীনের ছোট শোধনাগারগুলো তুলনামূলকভাবে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকায় তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে। তবু ওয়াশিংটন যদি এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘সেকেন্ডারি’ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস তেল বিক্রি আরও সংকুচিত হতে পারে।

চীনা ব্যাংকও হতে পারে লক্ষ্য

আরেকটি বড় বিকল্প হলো চীনের ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ইরানি তেল বিক্রির অর্থ স্থানান্তর ও অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগে চীন ও হংকংভিত্তিক ছোট কিছু প্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওএফএসি।

বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারা এরই মধ্যে দুটি বড় চীনা ব্যাংককে সতর্ক করেছেন— ইরানের অর্থ তাদের ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেলে তারাও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ বেইজিংয়ের তীব্র প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলার সময়ে এটি নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার ‘হোয়াক-এ-মোল’ কৌশল

ওয়াশিংটন চাইলে ইরানের অর্থ পাচার ও নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য পরিচালনায় সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে একের পর এক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে পারে। সম্প্রতি ইরানের তেল বিক্রির অর্থের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে সহায়তা করা নতুন কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।

তবে এই পদ্ধতিকে অনেকটা ‘হোয়াক-এ-মোল’ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে ইরান নতুন নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে একই কার্যক্রম চালাতে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞা বাড়লেও তেহরানের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

স্থল অবরোধের সম্ভাবনাও আলোচনায়

আরও কঠোর একটি বিকল্প হতে পারে ইরানের স্থলপথে অবরোধ। কিছু মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তা এমন সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ইরানের সঙ্গে ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার স্থলসীমান্ত রয়েছে। ফলে এ ধরনের অবরোধ কার্যকর করতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

তবে এটি বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন। একই সঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি ও পোশাকসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে সাধারণ ইরানিদের ওপর। তাতে সরকারবিরোধী আন্দোলন তৈরি হবে— এমন নিশ্চয়তাও নেই।

‘সেকেন্ডারি ট্যারিফ’ আরেক অস্ত্র

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকিও ট্রাম্প বহুবার দিয়েছেন। তবে এ ধরনের শুল্কের আইনি ভিত্তি নিয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রশাসন। এখন মার্কিন সিনেটে পাস হওয়া একটি বিস্তৃত রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিলের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার বিধান রয়েছে। বিলটি এখনো প্রতিনিধি পরিষদে পাস হতে হবে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের হাতে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর একাধিক অর্থনৈতিক অস্ত্র রয়েছে। তবে চীনা ব্যাংক বা রিফাইনারিতে আঘাত হানলে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, স্থল অবরোধ বাস্তবায়ন কঠিন, আর ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা তেহরানকে নতুন নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ দিতে পারে।

ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো নয়, এমন চাপ তৈরি করা, যা তেহরানের অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে দুর্বল করবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে নতুন আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতে ঠেলে দেবে না।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির ঐতিহাসিক জয়, মের্ৎসের দলে ধাক্কা

চূড়ান্ত ফলে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রথম হয়েছে এএফডি। বিপরীতে মের্ৎসের সিডিইউ পেয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। এ ভোটকে সিডিইউয়ের জন্যও বড় ধাক্কা মনে করা হচ্ছে।

১৬ ঘণ্টা আগে

মালয়েশিয়ায় পাসপোর্ট-ভিসাহীনদেরও আইনিভাবে দেশে ফেরার সুযোগ

তরিকুল ইসলাম বলেন, অনিয়মিত বা নথিবিহীন বিদেশি অভিবাসীদের জন্য বর্তমানে ‘মাইগ্র্যান্ট রিপেট্রিয়েশন প্রোগ্রাম ২’ (বিআরএম২.০) নামে মালয়েশিয়ার সরকারের মাইগ্রেশন বিভাগের একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বা নথিবিহীন বিদেশি নাগরিক বা কর্মীরা আইনসম্মতভা

১৬ ঘণ্টা আগে

পুতিন-জেলেনস্কির মাঝে ফের ট্রাম্প প্রশাসন, মিলবে কি যুদ্ধবিরতি?

মার্কিন এই কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও মস্কো এখনো যুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো তুলে ধরে আসছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। রাশিয়া ইউক্রেনের দখল করা ভূখণ্ড নিয়ে নিজেদের দাবি, ইউক্রেনের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অব

১৮ ঘণ্টা আগে

দিল্লিতে পিজি ভবন ধসে নিহত ৩, ধ্বংসস্তূপে বহু শিক্ষার্থী আটকে থাকার শঙ্কা

পুলিশ জানিয়েছে, ভবনটি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো ছিল। এতে একটি বেজমেন্টের ওপর পাঁচটি তলা ছিল এবং সেটি পিজি আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ভবনের বেজমেন্টে সংস্কার ও খননকাজ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই কাজের সময় ভবনের একটি স্তম্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পুরো কাঠামোটি ধসে পড়ে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের

১ দিন আগে
Advertisement