এনসিপি'র বর্জনে প্রশ্নবিদ্ধ ‘জুলাই সনদ’ নাকি ‘নতুন সূচনা’?

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ১১: ২৬
জুলাই সনদে সইয়ের পর তা দেখাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর

পঁচিশটি রাজনৈতিক দল 'জুলাই সনদে' স্বাক্ষর করলেও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে বিএনপি 'দায়িত্বশীল ভূমিকার নিদর্শন' হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা একে 'নতুন বাংলাদেশের সূচনা' হিসেবে দেখছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে— 'জুলাই সনদ' কি কেবলই বিতর্কিত, নাকি এটি সত্যিই নতুন সূচনার ইঙ্গিত?

শুরু থেকে সক্রিয় থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। সনদের আইনি কার্যকারিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্বাক্ষর না করার অবস্থানে অনড় রয়েছে দলটি।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদ স্বাক্ষরকে 'নতুন বাংলাদেশের সূচনা' বলে উল্লেখ করেছেন এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এটিকে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার 'নিদর্শন' বলছেন।

এনসিপি বারবার জানিয়ে আসছে , জুলাই সনদে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না হলে তারা স্বাক্ষর করবে না। এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শুক্রবার সকালের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এটি জাতীয় ঐক্য নয়। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এটি প্রতারণারই নামান্তর।’

তিনি অভিযোগ করেন, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় শ্রমিক ও স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, বরং কেবল নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কারের কথাই ঘুরেফিরে এসেছে। নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে যেসব মাফিয়া শ্রমিকদের শোষণ করেছে, তাদের এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি। বরং সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।’

এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ এর আগে এক বিবৃতিতে জানান, ‘জুলাই সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে কোনো আইনি ভিত্তি তৈরি হচ্ছে না। তাই এই ধরনের আনুষ্ঠানিকতা 'জুলাই ঘোষণাপত্রে'র মতো আরেকটি একপাক্ষিক দলিলে পরিণত হতে পারে। আমরা বহুবার বলেছি, আইনি ভিত্তির আগে এই স্বাক্ষর অর্থহীন। দাবি পূরণ হলে পরবর্তীতে সনদে স্বাক্ষর করবে এনসিপি।’

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, ‘আমরা ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন চাই। কিন্তু জুলাই সনদের আইনি কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের 'জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ' জারি করতেই হবে। আইনি গোঁজামিল দিয়ে আমাদের নয়-ছয় বোঝানো যাবে না।’

সনদ স্বাক্ষরের কিছুক্ষণের মধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ প্রণয়নের প্রচেষ্টা শ্রদ্ধার যোগ্য, কিন্তু শ্রদ্ধা মানে অন্ধ সমর্থন নয়। আজকের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান মূলত এমন এক ঐকমত্য ঘোষণা, যার বাস্তব রূপ এখনো স্পষ্ট নয়। আমরা কাঠামোগত ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার চাই। শুধু দলিল স্বাক্ষর নয়, বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা চাই। বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও দায়বদ্ধতার রূপরেখা প্রকাশ না করা পর্যন্ত এনসিপি এতে যোগ দেবে না।’

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন,জুলাই সনদের বিষয়ে অমীমাংসিত দিকগুলোর সমাধান না হলে ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ করা হবে।

এদিকে, জুলাই সনদ স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানকে একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যে সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে তার আজকে আরেকটা নিদর্শন দেখা গেল যে, জাতির প্রয়োজনে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সব দল এক হয়ে কাজ করতে পারে।’

যেসব দল এতে স্বাক্ষর করেনি, তারা আরও কথা বলে স্বাক্ষর করতে পারবে বলে আশাবাদ জানান তিনি।

এর আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানান, ‘সনদে কোনো পরিবর্তন আনার সুযোগ নেই। চাইলে কোনো দল পরে স্বাক্ষর করতে পারবে।’

শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই সনদে’ আয়োজিত স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হলো। তিনি বলেন, ‘এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশের সূচনা করলাম।’

তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, এই সনদ দিয়ে দেশ পরিবর্তন হবে এবং এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আলোচিত হবে।

এনসিপির সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে কি না তা নির্ভর করছে 'জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের টেক্সট' এবং আইনি কাঠামোর ওপর। দলটির দাবি, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নিশ্চিত করেই এই সনদকে বৈধতা দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, ১৭ অক্টোবরের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এনসিপির অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, ঘোষিত ঐকমত্য কতটা জাতীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

আওয়ামী লীগের বিচার না করলে রাস্তা খুঁজুন: জামায়াত আমির

শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের দ্বারা যত গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারও প্রতি কোনো প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করা অন্যায়। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি— আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন, না হয় আপনারা যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করুন।

৬ দিন আগে

সাংবাদিকদের ওপর হামলা: কর্মীদের ‘সম্পৃক্ততা’ পেলে ‘ব্যবস্থা’ নেবে জামায়াত

ঢাকার ধানমন্ডিতে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে নেতাকর্মীদের দ্বারা তাদের ওপর যে হামলা-হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে, তা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি বলেছে, এ ঘটনায় তাদের কোনো কর্মীর ‘সম্পৃক্ততা’ পেলে তার বিরুদ্ধে ‘সাংগঠনিক ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

৬ দিন আগে

সাংবাদিকদের ওপর ‘জামায়াত নেতাকর্মীদের হামলা’য় নিন্দা ও প্রতিবাদ ছাত্রদলের

রাজধানীর ধানমন্ডি-৩২ এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগে উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে ‘জামায়াত নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কায়দায় বর্বরোচিত হামলা এবং লাঞ্ছনা’ অভিহিত করে তীব্র ক্ষোভ, গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তা

৬ দিন আগে

নিষিদ্ধ আ.লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জনগণকে নিয়ে রুখে দেওয়া হবে: রিজভী

রিজভী আরও বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেশবিরোধী, দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। এত সাহস পেলেন কিভাবে? এই জাতিকে গোলাম বানাবেন? দিল্লির ক্রীতদাস বানাবেন? জনগণ তা হতে দেবে না।

৭ দিন আগে