জামায়াতের ‘ইতিহাস প্রদর্শনী’ নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বহির্প্রকাশ?

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
জামায়াতের প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধ অংশ ঘিরে বিতর্ক ছড়িয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থান— বিরোধী দলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আট দশকের ইতিহাস পরিক্রমার ওপর ভিত্তি করে জামায়াতের বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনসহ নানা সময়ের আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। তবে সেখানে মুক্তিযোদ্ধা পর্বে জিয়াউর রহমানের ছবি বা উল্লেখ না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কোনো উল্লেখ না থাকা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

বিতর্কের মুখে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রদর্শনীতে স্বৈরশাসকদের তুলে ধরার কারণেই জিয়াউর রহমানের স্থান হয়নি। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়টিকে ‘রহস্যজনক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে বিরোধী দল জামায়াতের যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, তারই বহির্প্রকাশ হতে পারে এই প্রদর্শনী।

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে গত ৫ আগস্ট শুরু হয় ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এই প্রদর্শনী। গত শনিবার (৮ আগস্ট) এ প্রদর্শনী শেষ হয়েছে।

১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন বৈঠকের ছবি দিয়ে শুরু হয়েছে উপস্থাপনা। সেখান থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালের নির্বাচন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র রয়েছে প্রদর্শনীতে। ‘আজাদী, অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ’ শিরোনামের এ অংশে একনায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পাকিস্তানের আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানকে।

‘মুক্তিযুদ্ধ’ শিরোনামে দ্বিতীয় অংশ শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দিয়ে। রয়েছে ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ঘটনা ও বিজয়ের ছবি। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের দৃশ্যও রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের অবস্থান কিংবা দলটির নেতাদের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে কোনো আলোকচিত্র নেই। সেই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি বা তার কোনো ভূমিকার উল্লেখ।

এরপর ‘একনায়কতন্ত্র’ শিরোনামে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কাল তুলে ধরা হয়েছে আলোকচিত্রে। এ অংশে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে শুরু করে তার নিহত হওয়ার সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ছবি। এ অংশে শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখানো হয়েছে স্বৈরশাসক হিসেবে।

এরপর ‘সামরিক স্বৈরশাসন’ শিরোনামে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্বৈরশাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘ফ্যাসিবাদ’ শিরোনামের পঞ্চম অংশে তুলে ধরা হয়েছে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ। ষষ্ঠ ও শেষ অংশের শিরোনাম ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’, যেখানে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের আন্দোলনকালীন বিভিন্ন ছবি স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনী দেখে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, আট দশকের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করলেও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের ভূমিকা নিয়ে কিছুই বলেনি। তাছাড়া জিয়াউর রহমানকে নিয়েও কোনো ছবি দেখানো হয়নি।

শনিবার এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, জামায়াত আমিরের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিত্র ও জুলাই আন্দোলনের ছবি রয়েছে; কিন্তু সেখানে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি, কথা বা পোস্টার রাখা হয়নি। বিষয়টি খুবই রহস্যজনক।

এ প্রদর্শনী নিয়ে অনলাইন-অফলাইনে বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনার মুখে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন এখানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ আছে, জিয়াউর রহমান সাহেবের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নেই কেন? উনি (জিয়াউর রহমান) তো অটোক্র্যাট শাসক ছিলেন না। তো ওনার ছবি এ কারণেই আমরা আনিনি।

জামায়াত আমির বলেন, যারা কর্তৃত্ববাদী ছিল, যারা আগ্রাসী ছিল, জুলুমবাজ ছিল, আমরা তাদের এখানে তুলে এনেছি। বেগম জিয়া যে মুক্তি পেয়েছেন ন্যায্যতার ভিত্তিতে, সেটিও তুলে আনা হয়েছে। ইতিহাসে যার যে কল্যাণকর অবদান আছে, সবগুলোর প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধাশীল। আমরা নির্মোহ, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই বাস্তববাদী।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, কোনো সরকারের সফলতা দেখানোর জন্য এই আয়োজন করা হয়নি। যুগে যুগে যারা স্বৈরাচারী ছিল, তাদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জনগণ তখন কীভাবে নিগৃহীত হয়েছিল, সেটা তুলে ধরা হয়েছে। দেশের জনগণ, শহিদ ও শহিদ পরিবারের প্রত্যাশা তুলে ধরাই ছিল এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিজাম উদ্দিন আহমদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী সুযোগ পেয়েছে নিজেদের অবস্থান প্রকাশের। এখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যে টানাপোড়েনটা ছিল, সেটা এ ঘটনায় স্পষ্ট হলো।’

জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাকে মীমাংসিত ইতিহাস আখ্যা দিয়ে অধ্যাপক নিজাম বলেন, ‘জামায়াত বা জামায়াতের লোকজন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে— স্বৈরশাসকদেরই শুধু আনা হয়েছে, সেটি গ্রহণযোগ্য না। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি সম্ভবত সরাসরি ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। এটি অনেকটাই স্পষ্ট। কারণ এ ধরনের একটি প্রদর্শনীতে জিয়াউর রহমান থাকবেন না, মনে হচ্ছে এটি পরিষ্কার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

কোনো ব্যাখ্যাই এর জন্য গ্রহণযোগ্য না অভিহিত করে অধ্যাপক নিজাম বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা— এটি তো বিএনপির অন্যতম একটি সম্পদ। জামায়াত সম্ভবত সেটিকেই ইচ্ছাকৃতভাবেই ডাউনপ্লে করতে চাইছে। এ ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য না। কারণ স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ পরিচালনা, একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন— জিয়াউর রহমানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।’

Ad
Ad
ad
ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

জ্বালানি আমদানি বেসরকারি খাতে ছাড়ার উদ্যোগ ‘দুনীতির নতুন লাইসেন্স’: জামায়াত

গোলাম পরওয়ার বলেন, “দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পর বিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হতে পারে।”

২ দিন আগে

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান ইসলামী আন্দোলনের

শনিবার (৮ আগস্ট) এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন। মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া ধীর না করে দ্রুত ও ব্যাপকভাবে তা সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।

২ দিন আগে

অতীতের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সমস্যা তৈরি হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সব কাজকেই প্রভাবিত করে, সেহেতু শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী—সবাই যার যার মতাদর্শ অনুযায়ী সচেতনভাবে সুসংগঠিত থাকবেন। এটা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। তবে— এই তবেটাই হচ্ছে ইম্পর্টেন্ট বিষয়। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পাল

২ দিন আগে

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে দলীয় নয়, জাতীয় ইতিহাস থাকতে হবে: নাহিদ ইসলাম

তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যাসহ ফেলানীর কিছু স্মৃতি ছিল, সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এটা ভয় থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে কি না, জানা নেই। সরিয়ে দিয়ে তারা ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বোঝাচ্ছে। কিন্তু এখানে আপসের কিছু নেই। আপস করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না। জাদুঘরে বিএনপির নির্যাতনের কিছু জিনিস বৃদ্ধি

২ দিন আগে