প্রান্তিক মানুষের কাছে বাজেট মানে কী?

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
সাধারণ মানুষের বাজেট ভাবনা ঘিরেও প্রতিদিনের আয়-ব্যয় আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার হিসাব। প্রতীকী ছবি

কাগজে-কলমে বাজেট মানে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের খতিয়ান। কিন্তু সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে বের হয়ে এই শব্দটা যখন কারওয়ান বাজারের পাইকারি আড়ত, সদরঘাটের কুলি বাসের কাউন্টার কিংবা মিরপুরের মেসগুলোতে পৌঁছায়, তখন এর অর্থ পুরোপুরি বদলে যায়।

সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট মানে কোনো তাত্ত্বিক সংজ্ঞা নয়; বাজেট মানে চালের বস্তার দাম, বাসের ভাড়া, আর মাসের শেষে পকেটে কয়টা টাকা অবশিষ্ট থাকল তার বাস্তব খতিয়ান।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি সরকারের ষষ্ঠদশ হলেও ব্যক্তিগতভাবে তার প্রথম বাজেট এটি। বিএনপিও ১৬ বছর পর কোনো বাজেট পেশ করছে।

সংসদে বাজেট প্রস্তাবনার ঠিক আগের দিন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের খেটে খাওয়া ও সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হয়ে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়— ‘বাজেট বলতে আপনারা আসলে কী বোঝেন?’

কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি পণ্য কিনে শাঁখারীবাজারে ছোট একটা মুদি দোকান চালান লোকমান মিয়া। বাজেট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কাউন্টারে বসে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, ‘বাজেট দিয়া আমরা কী করুম ভাই?’

বাজেট নিয়ে কেন এমন পালটা প্রশ্ন— জানতে চাইলে লোকমান মিয়া বলেন, ‘আমাদের কাছে বাজেট মানেই হইলো পরের দিন সকাল থেইকা জিনিসপত্রের দাম বাড়ার একটা সরকারি লাইসেন্স। এই যে বাজেট ঘোষণা হইব, কোম্পানিগুলা গতকাল থেইকাই বাজারে মাল সাপ্লাই কমাইয়া দিছে। কালকে (বৃহস্পতিবার) দুপুর পার হইলেই তেল, সাবান, সিগারেটের দাম লাফাইয়া বাড়াইয়া দিবো। প্রতি বছরই তো শুনি এইটা কমব, হেইটা কমব; দোকানে মাল কিনতে গেলে তো দেহি সবই বাড়তি।’

মিরপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন সুলতানা রাজিয়া। এক সন্তান আর স্বামীকে নিয়ে তার সংসার। তার কাছে বাজেট মানে মাসের শেষে হিসাব মেলাতে না পারার কান্না।

রাজিয়া বলেন, ‘বাজেট মানে হইলো সরকার নতুন কী নিয়ম করল, যার জন্য আমার বাড়িভাড়া আর চালের দাম আরেক দফা বাড়বে। আমাদের বেতন তো আর বাজেটের সাথে বাড়ে না!’

ক্ষোভ জানিয়ে রাজিয়া আরও বলেন, ‘গত সপ্তাহেও শুনলাম কারেন্টের দাম বাড়ছে। যুদ্ধের লাইগা নাকি তেলের দামও বাড়ছে। বাজেট যদি আমার বাচ্চার স্কুলের খরচ আর বাজারের খরচই না কমাইতে পারে, তবে সেই বাজেট দিয়া আমাদের মতো গরিবের কী লাভ?’

গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে সিএনজি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আলমগীর হোসেনের কাছে বাজেট হলো প্রতিদিনের জমার টাকা আর গ্যাসের দাম। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে তিনি বলেন, ‘ভাইজান, আমগো বাজেট প্রতিদিন সকালে গাড়ি নিয়া বাইর হওয়ার সময় শুরু হয়, আর রাইতে মালিকের জমা দিয়া ঘরে ফেরার সময় শেষ হয়।’

বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়িতে কর কমানো হবে বলে শুনেছেন আলমগীর হোসেন। এ খবর তাকে কিছুটা হলেও আশাবাদী করেছে। তিনি বলেন, ‘পেপারে দেখলাম এবার নাকি ব্যাটারি গাড়ির ওপর ট্যাক্স কমাইব। ট্যাক্স কমাইলে যদি গ্যাসের লাইনে চাপ কমে আর আমগো গাড়ি চালানো সহজ হয়, তাইলেই বাজেট ভালো। নাইলে বাজেট মানে বড়লোকদের ব্যাংকের টাকা এদিক-ওদিক করা।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে প্রেসক্রিপশন হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক আব্দুল হাই। ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপের কারণে প্রতি মাসেই তাকে মোটা অঙ্কের ওষুধ কিনতে হয়।

আব্দুল হাই বলেন, ‘বাজেট বলতে আমি বুঝি দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য সরকার কত টাকা রাখল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমগো বাজেট মানেই হইলো ওষুধের পেছনে কত খরচ গেল। সরকার যদি বাজেটে হাসপাতালের চিকিৎসা ফ্রি করে আর ওষুধের ওপর থেইকা ট্যাক্স একবারে তুলে দেয়, তবেই আমাদের মতো বুড়ো মানুষের শান্তি। কিন্তু প্রতিবার বাজেট গেলেই ওষুধের দাম বাড়ে।’

নীলক্ষেতে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বই দেখছিলেন তানভীর। তার চোখে বাজেট মানে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা। তানভীর বলেন, ‘বাজেট বলতে আমি বুঝি সরকার তরুণদের কাজের জন্য কী সুযোগ তৈরি করছে। শুনলাম এবার ফ্রিল্যান্সারদের কাজে ট্যাক্স একবারে তুলে নেওয়া হচ্ছে। এটা ভালো। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের ছেলেদের জন্য বড় চিন্তা হইল চাকরি। পড়ালেখা শেষ করে যেন বেকার বসে থাকতে না হয়, বাজেটে নতুন নতুন কর্মসংস্থান আর কলকারখানা খোলার ব্যবস্থা রাখা উচিত।’

কারওয়ান বাজারের চা দোকানি খোকন মিয়ার কাছে বাজেট মানেই সাংবাদিকদের ব্যস্ততা আর নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। তার চা দোকানের আশপাশে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের কার্যালয়। বাজেটের দিন এসব গণমাধ্যমের কর্মরতদের ব্যস্ততা বেজায় বেড়ে যায়, এমনটিই দেখে আসছেন তিনি।

খোকন মিয়া বলেন, ‘বাজেটে সরকার কী করে জানি না, তয় বাজেট হইলেই দেখি সব জিনিসের দাম বাড়ে। কালকেই (বৃহস্পতিবার) দেখবেন এইটার দাম বাড়ছে, ওইটার দাম বাড়ছে। সরকার নাকি বাজেটে কী কী জিনিসের দাম কমায়, কিন্তু আমরা সেইটা পাই না। তয় বাজেটের দিন সাংবাদিকদের ভাইয়েরা অনেক ব্যস্ত থাকে। আমার বেচাবিক্রিও একটু ভালোই হয়।’

সাধারণ মানুষের এই প্রতিক্রিয়াগুলো সাজালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্ক কিংবা আইএমএফের কঠিন শর্তগুলোর সঙ্গে তাদের নিত্যদিনের কোনো যোগসূত্র নেই। তাদের কাছে বাজেট মানে খুব সাধারণ ও জীবনমুখী কিছু চাওয়া— নিত্যপণ্যের দাম যেন হাতের নাগালে থাকে, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল যেন সাধ্যের মধ্যে থাকে, আর মাস শেষে যেন পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে দুবেলা ডাল-ভাত খাওয়া যায়।

নতুন সরকারের নতুন বাজেট টাকার অঙ্কে সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। কিন্তু রেকর্ড ভাঙা সেই বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি নাকি বাড়তি চাপ নিয়ে আসবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মন্ত্রিসভায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন

আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এই বাজেট বিকেলে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

২ ঘণ্টা আগে

সাধারণ মানুষের জীবনে বাজেট কী কাজে লাগে?

দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে পরিসংখ্যানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্য প্রশ্ন— বাজেট ঘোষণার পর বাজারে চাল-ডাল-তেলের দাম বাড়বে নাকি কমবে? সংসারের খরচ সামলানো সহজ হবে, নাকি আরও কঠিন? চাকরির সুযোগ বাড়বে কি? চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় কিছুটা কমবে কি?

২ ঘণ্টা আগে

টাকার অঙ্কে বাজেট বিবর্তন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন, তার সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হবে। স্বাধীনতার পর প্রথম বাজেটের তুলনায় এর আকার হাজার গুণেরও বেশি।

২ ঘণ্টা আগে

কোন সরকারের কয়টি বাজেট, উত্থাপনকারী কারা?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের প্রথম বাজেট থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেট পর্যন্ত মোট ৫৫টি বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব বাজেট দিয়েছেন ১৪ জন ব্যক্তি। তাদের কেউ ছিলেন নির্বাচিত সরকারের অর্থমন্ত্রী, কেউ সামরিক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, কেউ আবার রাষ্ট্রপতি বা সা

৩ ঘণ্টা আগে