পুঁজিবাজার— অসময়ে ডিজিটালাইজেশনের আওয়াজে আতঙ্ক

ফজলুল বারী

দেশের পুঁজিবাজার মন্দা-বৃত্তেই বন্দি। গত সপ্তাহে ডিএসইএক্স ছাড়া বাকি সব সূচকেই ঋণাত্মক পরিবর্তন ঘটেছে। গত পাঁচ মাস ধরে ডিএসইএক্স সূচক এক হাজার পয়েন্টের মধ্যেই ওঠানামা করছে। সর্বনিম্ন ৪৬০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৬০০ পয়েন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে সূচকের গতি।

বাজার ব্যবস্থাপকরা পুঁজিবাজারের উর্বর জমিতে আগাছা চাষ অব্যাহত রেখেছেন! মৌলভিত্তিক তাত্ত্বিক পুঁজিবাজারে ‘মার্জিন ক্যান্সার নির্ভর ক্যাসিনো বোর্ড’ প্রতিস্থাপিত হয়েছে! এতে নিঃস্ব হয়েছেন লাখো বিনিয়োগকারী, এখনো হচ্ছেন। সম্ভাবনা হারাচ্ছে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার লাগসই ও টেকসই উর্বর জমিনটি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে প্রয়োজন ছিল সাহসী নেতৃত্ব— যিনি বা যারা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বাজারচিত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। বর্তমান নেতৃত্ব পুঁজিবাজারবান্ধব নয়। সরকারও পুঁজিবাজার বিষয়ে উদাসীন। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত বিএসইসি চেয়ারম্যানের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।

সাম্প্রতিক সময়ের নতুন আতঙ্ক— স্টক এক্সচেঞ্জ ডিজিটালাইজেশন।

এই আতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষ্য হতে পারে মন্দা প্রলম্বিত করা। উদ্দেশ্য কম দামে মৌলভিত্তিক শেয়ার সংগ্রহের ধারা অব্যাহত রাখা। পরবর্তী লক্ষ্য— সংস্কার ও আধুনিকতার মোড়কে পুঁজিবাজারে অসময়ে ডিজিটালাইজেশন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার মতলব।

এখন ডিজিটালাইজেশন চাপানোর উদ্দেশ্য হলো ছোট ও মাঝারি ব্রোকার হাউজগুলোকে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলা। বাজার ব্যবস্থাপনার ভেতর ও বাইরে অবস্থান করা বিগত মাফিয়া সরকারের এক দোসরই এ নতুন আতঙ্ক উদ্যোগের উদ্যোক্তা। এর মধ্যে একজন উদ্যোক্তা ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির অন্যতম অনুঘটক। তার হাউজের বড় জুয়াড়িদের শেয়ার বিক্রির পরামর্শ দিয়েছিল। বিক্রি শেষ হলে বড় জুয়ারিদের হাতে মালয়েশিয়ার টিকিট ধরিয়ে দেয়। এবং সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত বাজারমুখী না হওয়ার প্রেসক্রিপশনও দেয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক ওই জুয়াড়ি সংগঠকের পরামর্শেই স্টক এক্সচেঞ্জ ডিজিটালাইজেশন ইস্যুটি বাজারে ছাড়ানো হয়। তাতেই নতুন আতঙ্কের বিস্তার ঘটে। এ আতঙ্কে আগুনে বাতাস দিচ্ছে আরও কয়েকটি হাউজও।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন প্রয়োজন— প্রাতিষ্ঠানিক ব্রোকার হাউজসহ ডিমিউচুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জের পোস্টমর্টেম সম্পন্ন করা। উদ্দেশ্য— প্রাতিষ্ঠানিক ব্রোকার হাউজ ও ডিমিউচুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জ পুঁজিবাজারে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে তা যাচাই করা।

‘নেগেটিভ ইকুইটি’, ‘ফোর্স সেল’ ইত্যাদি বিনিয়োগ-বিনাশী টুলসের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজার কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার আদ্যোপান্ত খতিয়ে দেখা। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব শাখার বিষয়বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেল প্রস্তাবিত পোস্টমর্টেম সম্পন্ন করবে এবং সে প্রতিবেদন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে, প্রকাশ করতে হবে জনসমক্ষে।

অসময়ে, বিনিয়োগ-বিনাশী এ উদ্ভট প্রকল্প গ্রহণের জন্য পুঁজিবাজার প্রস্তুত কি না— এ বিষয়ে কোনো যাচাই-বাছাই হয়েছে কি? হয়নি তো। তাহলে ধরে নিতে হবে, সিসিএ ডিজিটালাইজেশন এবং বিও-টু-বিও সেটেলমেন্টের জন্য বাজার এখনো প্রস্তুত নয়। ব্রোকার হাউজগুলোর রিস্ক রেটিং, ব্যাংক-টু-ব্যাংক সেটেলমেন্ট ইত্যাদি বিষয় চাপানোর সময়ও আসেনি।

কেন্দ্রীয়ভাবে সম্পন্ন করার মতো ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারও নেই। ব্রোকার হাউজের আনরিয়েলাইজড লোকসানের বিপরীতে প্রভিশনিং প্রস্তাবও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

উল্লিখিত বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান ও প্রতিকারের দায়িত্ব ডিএসইর। ডিএসই বোর্ড ও প্রশাসন কি উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সামর্থ্য রাখে? জানামতে না। যতটা সক্ষমতা আছে, তারও সদ্ব্যবহার নেই।

কারণ হিসেবে বলা যায়, ডিএসইতে এখন এক ব্যক্তির শাসনরাজ কায়েম হয়েছে। একজনের সিদ্ধান্তই ডিএসইতে চূড়ান্ত ও শেষ কথা।

পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার সরকারি সিদ্ধান্ত ডিএসই বোর্ড ও প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। উল্লিখিত পাঁচ ব্যাংকে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের আনুমানিক ১৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে— ফেস ভ্যালু ধরে। বিনিয়োগকালীন বাজারমূল্যে তা ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের এই বিপুল বিনিয়োগ সম্পর্কে এখনো কিছুই বলেনি। ডিএসই, বিএসইসি ও ডিবিএর উদ্যোগ সম্পর্কেও বিনিয়োগকারীরা কিছুই জানে না।

উদ্ভূত সার্বিক পরিস্থিতি এখন বিনিয়োগ-বিকর্ষক। সরকার ও বাজার ব্যবস্থাপকদের কারণেই পুঁজিবাজারে মন্দাকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও সংকট লেগেই আছে। অর্থনীতির চাকা ঘুরছেই না। এর অকাট্য প্রমাণ পুঁজিবাজারেই রয়েছে।

ডিএসইতে তালিকাভুক্ত খাত ২১টি। একুশ খাতেই দেড় যুগ ধরে লাল সংকেত জ্বলছে। তালিকাভুক্ত খাতগুলো হলো— ব্যাংক, সিমেন্ট, সিরামিক, বন্ড, প্রকৌশল, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, সাধারণ বীমা, আইটি, পাট, জীবনবীমা, বিবিধ, মিউচুয়াল ফান্ড, কাগজ ও ছাপাখানা, ফার্মা ও কেমিক্যালস, সেবা ও আবাসন, ট্যানারি, টেলিকম, ভ্রমণ ও বিনোদন।

সব খাত থেকেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিদিন লাল সংকেত দেখানো হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার, বিশেষ করে অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘুম আসে কী করে? অথচ তারা দিব্যি ঘুমাচ্ছেন!

পুঁজিবাজারের সাধারণ তত্ত্ব হলো— যেখানেই লোকসান, সেখান থেকেই মুনাফা অর্জন সম্ভব। সরকার আন্তরিক হলে পুঁজিবাজারের মাধ্যমেই অর্থনীতির চাকা ঘোরানো সম্ভব। সম্ভব দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বিপুল সমাবেশও। এমনকি ফিরিয়ে আনা যেতে পারে পাচারকৃত অর্থের একটি বড় অংশও।

এতকিছুর পরও আশাবাদের জায়গা আছে বিনিয়োগকারীদের জন্য। এখন বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস করতে পারেন। ২০ শতাংশ প্লাস মাইনাস লোকসানের ঝুঁকিও নেওয়া যায়।

এখন বিনিয়োগ হতে হবে ডিভিডেন্ড ও গ্রোথ-বেজড। যেসব কোম্পানির ইপিএস, এনএভি ও ডিভিডেন্ড রেকর্ড ভালো, প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত— সেগুলোতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

পিই (P/E) ওপেন। কারণ যেসব কোম্পানির অস্তিত্ব নেই, প্রবৃদ্ধি নেই— সেসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ এক অঙ্কের পিইতেও নিষিদ্ধ। আবার যথাযথ তথ্যনির্ভর প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত থাকলে তিন অঙ্কের পিইতেও বিনিয়োগ করা যায়।

স্কয়ার, লাফার্জ, রবি, গ্রামীণ, এনভয় টেক্সটাইল, সাপোর্টের মতো জাতীয় কোম্পানির আর্থিক চিত্র যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে। আর সতর্ক থাকা জরুরি, বিচ হ্যাচারি বা জিকিউ বলপেন প্রজাতির বন্ধ কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে।

লেখক জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক এবং পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের ১৩১৬ কোটি টাকার লোকসান

সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্সের তুলনায় এই লোকসান এখন ব্যাংকের অবস্থায় বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ইসলামী ব্যাংক মুনাফায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করে ব্যাংকটি। এই

১০ ঘণ্টা আগে

রপ্তানি বহুমুখীকরণে ইসিফরজে প্রকল্প: ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি চালু করে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্

১১ ঘণ্টা আগে

গানভর ইউএসএ থেকে ৭১ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আনবে সরকার

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে আগামী ১৩ বছর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে সরকার। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে মোট ৭৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত প্রতি

২ দিন আগে

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে বাংলাদেশের ওপর নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না।

২ দিন আগে