নতুন পুঁজি প্রবেশে আশাবাদ, শঙ্কা ‘মার্জিন ক্যাসিনো’

ফজলুল বারী

এআই ও ব্লকচেইনের যুগেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা যেন মধ্যযুগীয়। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শীর্ষ অবস্থানে রাজা। পরবর্তী অবস্থানে সামন্ত, অমাত্য এবং রাজকর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সর্বনিম্ন অবস্থানে প্রজা— চাষা।

মধ্যযুগেও ‘চাষাদের’ সমস্যা ও দুর্ভোগের শেষ ছিল না। তারপরও প্রকৃতির বৈশিষ্ট ধারণ করে ‘আশা’ নির্ভর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিল তারা। প্রবাদে আছে, ‘আশায় বাঁচে চাষা’। প্রাসঙ্গিক কবিতা গোপাল চন্দ্র সরকারের—

‘আর্তের সম্বল আশা আর ভরসা।

এক নয়, দশ নয়, অভাবী কোটি কোটি লোক।

দেশ যায় রসাতলে করে না প্রবুদ্ধ,

আজ শোক।’

কী অদ্ভুত! বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশ, প্রতিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। বিশেষ করে অর্থ-পুঁজি বাজারের সঙ্গে। রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার শীর্ষ অবস্থানে যেই থাকুন, যে পদবীই ধারণ করুন— প্রকৃত অর্থে রাজা তিনিই। মন্ত্রী/উপদেষ্টা, অভিজাত ব্যবসায়ীরা রাজদরবারের; সামন্ত, অমাত্য, রাজকর্মকর্তা-কর্মচারীসম।

অবশ্য মধ্যযুগেও প্রজাবান্ধব রাজা ছিল। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে জনবান্ধব শাসক খুঁজে পাওয়া ভার। রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার সূচকে বাংলাদেশ অনেক পেছনে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শাসনব্যবস্থা জনস্বার্থবিরোধী।

কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার সর্বত্র অব্যবস্থাপনা। প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানে অব্যবস্থাপনাই এখন ব্যবস্থাপনা! অর্থ খাতের লাইফলাইন— অর্থ ও পুঁজি বাজার। উভয় বাজারেই ব্যবস্থাপনার সংকট প্রকট।

বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) অর্থবাজারের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান। বিবি গভর্নর বহুদিন থেকেই পুঁজিবাজারবিরোধী প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন। তার ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নীতি, বিনিয়োগ ও বিনিয়োগকারী-বিকর্ষক। তিনি জনগণের টাকায় একটি বিশেষ শ্রেণিকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে হয়।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬ ব্যাংকের মধ্যে ১৮ ব্যাংকের বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দিতে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। বিবি ইচ্ছা করলে উদ্যোক্তা ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্তদের মুনাফা গ্রহণ রহিত করতে পারত। পারত তাদের বাদ দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মুনাফা বিতরণের সুযোগ করে দিতে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ প্রাপ্তির অধিকার বঞ্চিত করা ঠিক হয়নি।

বিবি গভর্নরের মতে, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসতেই পারে!

বিগত সাড়ে ১৬ বছরের ইতিহাস হলো দেশের অর্থমন্ত্রী/উপদেষ্টা, বিবি গভর্নর এবং বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের বিনিয়োগ ও বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধ অবস্থানে থাকার ইতিহাস। আবার তাদের বেশির ভাগই পুঁজিবাজার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। তাদের অনেকেই বিএসইসিতে নিয়োগ পেয়ে তাদের অধীনস্থদের কাছে পুঁজিবাজারের প্রাথমিক জ্ঞান নেন। পরে বিশেষজ্ঞ হন! প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণে-দুর্নীতিতে হাত পাকান।

বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ অবশ্য ভিন্ন ধারার। তিনি যে কিছুই বুঝেন না, এটাও তিনি বুঝেন না!

এ অবস্থায় একমাত্র আশার জায়গা— প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। সরকার ইচ্ছা করলে তাকে একই মর্যাদায় বিএসইসির চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতেই পারে। দিলে ভালোই হবে বলে মনে হয়।

রাশেদ মাকসুদের নতুন উপহার— খসড়া মার্জিন নীতিমালা প্রকাশ। এ সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণ গত সপ্তাহে কিঞ্চিৎ তুলে ধরেছি। বিশদে না গিয়েই বলা যায়, মার্জিন নীতিমালা সংশোধন নয়, নিষিদ্ধকরণই সমাধান।

প্রস্তাবিত মার্জিন নীতিমালা সম্পর্কিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পর্যবেক্ষণ, ‘মন্দের ভালো’। তার মানে এই নয়, ডিএসইর প্রস্তাব সমর্থন করছি। কারণ ব্রোকার হাউজে ক্যাসিনো চালু রাখা মানে পুঁজিবাজারে ক্যান্সার লালন করা। মার্জিন ক্যান্সার বহাল রেখে বাজারের আকার বাড়ানো আত্মঘাতী উদ্যোগ।

মার্জিন-ফোর্স সেল আশঙ্কার ভিত শক্তিশালী করে। ইকুইটি মাইনাস অ্যাকাউন্ট বাড়ানোর সুযোগ বাড়ায়। যত বেশি মার্জিন, তত বেশি ফোর্স সেলের আওতা বাড়ে। ইকুইটি মাইনাস অ্যাকাউন্ট বাড়ানোর পথ মসৃণ করে।

মার্জিন সরবরাহকারী ব্রোকার হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে ইকুইটি মাইনাস সোনার ডিম পাড়া হাঁসসম। এক পর্যায়ে মার্জিনই সম্ভাবনাময় পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগকারীশূন্য করার উদ্ভব ঘটাতে পারে।

আশঙ্কার মধ্যেও চাষাদের মতোই বিনিয়োগকারীরাও আশার ভেলায় ভাসতে অভ্যস্ত। বাজারে নতুন আশার জায়গাটি হলো— বেশ কটি ব্রোকার হাউজের মাধ্যমে নতুন পুঁজি প্রবেশ শুরু করেছে।

গত সপ্তাহে আবারও ডিএসইর দিনের লেনদেনের অঙ্ক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ডিএসইর ডিএসইএক্স ও ডিএসই ৩০ সূচক বেড়েছে। তবে এসএমই সূচক কমেছে। এর কারণ বাজার ব্যবস্থাপকদের বৈষম্যমূলক ও দ্বৈত নীতি।

গত সপ্তাহের বাজার চিত্রে— দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় দুর্বল ও আবর্জনা জাতীয় শেয়ারেরই প্রাধান্য ছিল। তবে লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় মৌল ভিত্তি নির্ভর শেয়ারের প্রাধান্য অব্যাহত ছিল। নতুন আশাবাদের জায়গাটিও এখানেই।

লেখক: জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের ১৩১৬ কোটি টাকার লোকসান

সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্সের তুলনায় এই লোকসান এখন ব্যাংকের অবস্থায় বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ইসলামী ব্যাংক মুনাফায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করে ব্যাংকটি। এই

১২ ঘণ্টা আগে

রপ্তানি বহুমুখীকরণে ইসিফরজে প্রকল্প: ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি চালু করে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্

১২ ঘণ্টা আগে

গানভর ইউএসএ থেকে ৭১ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আনবে সরকার

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে আগামী ১৩ বছর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে সরকার। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে মোট ৭৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত প্রতি

২ দিন আগে

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে বাংলাদেশের ওপর নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না।

২ দিন আগে