‘এই ধান বেপারিও নেয় না, সরকারও নেয় না— পোলাপান লইয়া কী খামু?’

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ
পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে পচা ধান কেটে এনে সড়কে শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। ফাইল ছবি

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুম শেষে এখন চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, শ্রমিক সংকট ও সরকারি ধান সংগ্রহের কঠোর শর্তে উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। অনেক কৃষক পানির নিচ থেকে পচা ধান কেটে এনে সড়কে শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই ধান কিনতে চাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা, আবার সরকারি গুদামেও মিলছে না সুযোগ।

মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক জপন দেবনাথ আক্ষেপ করে বলেন, ‘ফুরদিঘা, বেহারকোনা আর কাশিদ্দাপুর হাওরে তিন খানি খেত করছিলাম। বাপ-পুতে মেঘ-বৃষ্টির মধ্যে দেড় খানি খেত কাটছি। বাকিটা পানির নিচে গেছে। এখন এই ধান বেপারিও নেয় না, সরকারও নেয় না। পুত লইয়া কী খামু?’

তিনি জানান, তার তিনটি জমিতে ধান আবাদ করতে তার প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দেড়টি জমি থেকে ৬০ মণ ধান পেয়েছেন, যার বাজারমূল্য বর্তমান দরে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। অথচ এই আবাদ করতে সমিতি থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।

জপন দেবনাথ নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘পানির নিচ থেকে পচা ধান কাইট্টা আনতাছি। এই ধানের ভাত মানুষ খাইতে পারবে না, গরুও খাবে না। শুধু লাকড়ি হইব। সরকারের গুদামে ধান দিতে গেছিলাম, নানা নিয়ম দেখাইয়া ফেরত দিছে।’

একই গ্রামের কৃষক রবীন্দ্রনাথ দেবনাথ জানান, এখনও অন্তত ৩০০ একর জমি পানির নিচে রয়েছে। তার নিজের পাঁচটি খেতের মধ্যে তিনটি খেতের ধান চড়া দামে শ্রমিক দিয়ে কাটাতে হয়েছে। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সেই ধানেও গজিয়ে গেছে চারা।

তিনি বলেন, ‘তিন খানি খেতে ৩০০ মণ ধান হওয়ার কথা ছিল, পাইছি মাত্র ১০০ মণ। আরও দুই খানি খেত এখনও পানির নিচে। মহাজনের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিছি। গরু-বাছুর বেইচ্চা ঋণ শোধ করলে না খাইয়া থাকতে হইব।’

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্রতা ও ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত জটিলতার মুখে পড়তে হয়। ফলে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরের সুবিধা পাচ্ছেন না তারা। বাধ্য হয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে ভেজা ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।

ইটনা উপজেলার বরিবাড়ি গ্রামের কৃষক সৈকত আলী বলেন, ‘খেতে পানি আটকা আছে। অনেক কষ্টে ধান কাইট্টা আনছি, কিন্তু রোদ নাই। ধান শুকানোর জায়গাও পানির নিচে। এক মণ ধান ফলাইতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা খরচ হয়, আর বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০০-৬০০ টাকায়। সারাডাই লোকসান।’

মাঠপর্যায়ের তথ্যে জানা গেছে, প্রতি একরে গড়ে ৬০ মণ ফলন হলেও আবহাওয়ার কারণে সেই ধান ঘরে তোলাই এখন কৃষকদের জন্য ‘মরণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানিতে তলিয়ে থাকা জমিতে হারভেস্টার নামানো যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আগে যেখানে একজন শ্রমিক ৬০০ টাকায় কাজ করতেন, এখন সেই মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

এ ছাড়া মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খরচও কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে যেখানে এসব কাজে একরে ৮ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।

এ বিষয়ে মিঠামইন খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ধানে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা থাকতে হবে। কিন্তু কৃষকদের অধিকাংশ ধানে ২০ থেকে ২২ শতাংশ আর্দ্রতা পাওয়া যাচ্ছে। তাই অনেক ধান গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ২৭ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে সংগ্রহ বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ধান ব্যবসায়ী দুর্বাজ মিয়া বলেন, ‘বর্তমানে ভেজা ধান ৬০০ টাকা মণ দরে কিনতেছি। ভালো মানের ধান না হলে আড়তদার ও চালকল মালিকরা নিতে চায় না। তাই দামও কম।’

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তে সরকারি ধান সংগ্রহ এবং ঋণ পরিশোধে সময়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হোক। তা না হলে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

আসামির মৃত্যুর গুজবে থানায় হামলা, ৬ পুলিশসহ আহত ১২

বৃহস্পতিবার স্থানীয়ভাবে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, রিয়াজ মারা মারা গেছেন। এতে তার স্বজনসহ স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে থানায় হামলা চালান। প্রায় শতাধিক মানুষের হামলায় পুলিশ সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এ সময় হামলাকারীরা থানায় কর্তব্যরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল হালিমকে মারধর করেন।

১৮ ঘণ্টা আগে

পাহাড়ি ঢলে ডুবল গোমতীর চরাঞ্চল, সহস্রাধিক কৃষকের ফসলহানি

সকালে বুড়িচং উপজেলার বালিখাড়া, ভান্তি ও কামারখাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরাঞ্চলের শত শত একর সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির ওপর ভেসে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। লোকসান কিছুটা কমাতে স্থানীয় কৃষকদের কোমর সমান পানিতে নেমে অপরিপক্ব ফসল কেটে ঘরে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

১ দিন আগে

ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ভাসছে কমলগঞ্জ, পানিবন্দি ১৫ গ্রাম

রাতের আঁধারে প্রবল স্রোতে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যে ইসলামপুর, মাধবপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে মোখাবিল, গোলের হাওর, ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, কোনাগাঁও, বেরীগাঁও, শ্রীপুর, পাতারিগাঁও, কালারায়বিল, আধকানী, ছনগাঁও, বন্দেরগাঁও, তেইতইগাঁও, ভানুবিল ও ঘোর

১ দিন আগে

কিশোরগঞ্জের হাওরে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ২টি নৌ ডাকাতি

ভুক্তভোগী সদরঞ্জন দাস জানান, তিনি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার যাত্রাপুর গ্রাম থেকে অন্য এক ব্যক্তিসহ নৌকায় করে হাঁসের বাচ্চা কিনতে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার দামিহা এলাকায় যাচ্ছিলেন। পথে বর্শিকুড়া-শেরপুর সেতু সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে মাথায় হেলমেট পরিহিত সাতজনের একটি সশস্ত্র দল দেশীয় অস্ত্রের মুখে তাদের

১ দিন আগে