ধানের বাজারে ধস, মাঠ জুড়ে পানি— চরম সংকটে কিশোরগঞ্জের কৃষক

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ
পানিতে ভিজে কৃষকদের ধান পচতে শুরু করেছে, অনেকের ধান থেকে চারা গজাচ্ছে (বাঁয়ে) এবং ধান শুকানোর জায়গা না থাকায় ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ককে খলা হিসেবে ব্যবহার করছেন কৃষকরা (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবারের বোরো মৌসুমে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ ও বাজার ব্যবস্থার অনিশ্চয়তায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। একদিকে টানা বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে ধান শুকানোর জায়গার অভাব ও ধান কেনায় অনীহা— সব মিলিয়ে হাওরের কৃষকদের সামনে তৈরি হয়েছে চরম সংকট।

হাওরের বাতাসে এখন আর পাকা ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ নেই। মাড়াইকলের সেই পরিচিত শব্দের বদলে সেখানে এখন কেবল বৃষ্টির অবিরাম শব্দ। মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষকের পাকা ধান পানিতে ভিজে পচতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ধানের গায়ে সাদাটে অঙ্কুর বেরিয়ে গেছে।

হাওরের কৃষকরা এখন কেবল প্রকৃতির সাথে নয়, বরং বাজারের অব্যবস্থাপনা আর কঠিন নিয়মের সাথেও যুদ্ধ করছেন। পুরো বছরের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফসল চোখের সামনেই এভাবে নষ্ট হয়ে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

কৃষকদের অভিযোগ, বুকসমান পানির নিচ থেকে ধান কেটে নিয়ে এলেও এখন ক্রেতা না থাকায় তা বিক্রি করা যাচ্ছে না। কোনো পাইকার ধান কিনতে আসছেন না, সরকারি গুদামও আর্দ্রতা ও মানের অজুহাতে ধান কেনায় অনীহা দেখাচ্ছে।

মিঠামইনের শান্তিপুর গ্রামের কৃষক আবু সালেক জানান, টানা বৃষ্টিতে ধান শুকানোর সুযোগ না থাকায় ফসল নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বুকসমান পানিতে নেমে ধান কেটেছি, এখন সেই ধান পচে যাচ্ছে। পাইকারও আসছে না, গুদামেও নিচ্ছে না।’

ইটনার পূর্বগ্রামের কৃষক মহসিন মিয়া বলেন, আগে পাইকাররা মাঠ থেকেই ধান কিনে নিলেও এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার ভাষায়, ‘রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না, তাই বাজারে দাম নেমে গেছে মণপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকায়।’ সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৬ টাকা নির্ধারিত হলেও কৃষকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অষ্টগ্রামের কৃষক সালাউদ্দিন শরীফ জানান, শ্রম ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রমিকের মজুরি আগের ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে দেড় হাজার টাকায় পৌঁছেছে, অথচ ধানের দাম সেই তুলনায় অনেক কম। সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে আর্দ্রতা সংক্রান্ত কড়াকড়ির কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করছেন।

ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর অবশ্য কৃষকদের আশ্বস্ত করে ধান বিক্রিতে কোনো হয়রানি হলে সরাসরি তাকে জানাতে বলেছেন। অনিয়মের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, জেলায় ১৩ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার কৃষক। ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আগামী তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে এই সহায়তা কবে থেকে শুরু হবে তার সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঠিক হয়নি।

এদিকে হাওরের পানি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও কৃষকদের দুর্ভোগ কমেনি। ধান শুকানোর জায়গা না থাকায় ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ককে এখন অনেকে খলা হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রায় ৩০ কিলোমিটার জুড়ে সড়কের ওপর ধান শুকাতে দেখা গেছে, যা একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টিতেই সব শ্রম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

কৃষকদের ভাষ্য, হাওরের অধিকাংশ খলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সড়কেই ধান শুকাতে হচ্ছে। অনেক ধানে ইতোমধ্যে চারা গজিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের অনুপযোগী বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীরাও এসব ধান কিনতে অনীহা দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ কিনলেও নামমাত্র দামে কিনছেন। এতে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, শ্রমের মূল্যও উঠছে না।

হাওরের অধিকাংশ খলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সড়কেই ধান শুকাতে হচ্ছে কৃষকদের। ছবি: সংগৃহীত
হাওরের অধিকাংশ খলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সড়কেই ধান শুকাতে হচ্ছে কৃষকদের। ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইটনার ধনু-বৌলাই নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার এবং চামড়াঘাটের মগড়া নদীর পানি ১ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে অষ্টগ্রামের কালনী নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় কোনো বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়নি। আবহাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসায় সামনে বৃষ্টি হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে।

কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, হাওরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৭১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, আর অন্য এলাকায় ৩৬ শতাংশ। তবে এরই মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে ১৩ হাজার ২শ ৮৭ হেক্টর জমির ফসল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার কৃষক।

অষ্টগ্রাম উপজেলা সদরের সোনাই দিঘির পূর্বপাড়া এলাকার কৃষক মো. আফরোজ আলী জানান, তার ১১ একর জমির পুরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ঋণ মওকুফ করা না হলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে। ‎মসজিদজাম এলাকার কৃষক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, ‘দুদিন ধরে রোদ ওঠায় চারা গজিয়ে যাওয়া ধান শুকাতে পারছি। আবার আবহাওয়া খারাপ হলে ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

‎ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত কার্যকর সহায়তা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তারা বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি ও সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

হাওরের কৃষকরা প্রকৃতির পাশাপাশি বাজার ও ব্যবস্থাপনার দ্বৈত চাপে দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত বাকি ধান ঘরে তুলতে পারবেন এবং ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

‘পচা ধান কাডাইয়া কি করমু, পানির তলে পইরা থাকুক’

শুক্রবার হাওরে জমি থেকে আসার সময় রাস্তায় দেখা হয় তার সঙ্গে। কথা বলতে বলতে বাড়ি চলে আসে । নিরঞ্জন বলেন, আমি কুমারদিঘা হাওরে ১ একর ২৫ শতাংশ জমি বন্ধক রেখেছিলাম। সেই জমি এ বছর চাষ‌ করেছি। এক ধারে জমি পাকছে অন্য ধারে বৃষ্টি নামা শুরু হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে আমার জমি অহন‌ ১ হাত পানির তলে। রোইদ উঠলে কি

১৬ ঘণ্টা আগে

কদমতলীতে ফোমের মিলে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৪ ইউনিট

রাজধানীর কদমতলীতে একটি ফোমের মিলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট। কারখানার ভেতরে কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না বা কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি।

১৭ ঘণ্টা আগে

সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে যেতে চান না বসুন্ধরার বাসিন্দারা

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত, আধুনিক ও নিরাপদ নাগরিক সেবায় অভ্যস্ত। তাদের দাবি, দেশের অন্য যেকোনো আবাসিক এলাকার তুলনায় বসুন্ধরা বেশি নিরাপদ, সুরক্ষিত, পরিচ্ছন্ন এবং মাদক-সন্ত্রাসমুক্ত। এসব সেবা নিশ্চিত করে আসছে বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি।

১৯ ঘণ্টা আগে

অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে ঋণগ্রস্ত, সরকারি কর্মচারীর আত্মহত্যা

অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে দেড় কোটি টাকার ও দেনা-পাওনা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন রাজস্ব বিভাগের আমিনুল ইসলাম নামে এক কর্মচারী। মৃত্যুর আগে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে তিনি এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে দায়ী করে গেছেন।

১ দিন আগে