অষ্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় মৃত ও প্রবাসীদের নাম, বাদ পড়েছেন কৃষকরা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ
পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে পচা ধান কেটে এনে সড়কে শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। ফাইল ছবি

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণীত সরকারি সহায়তার তালিকায় মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী এবং কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন— এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম তালিকায় না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে হাওরাঞ্চলে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আটটি ইউনিয়নে মোট ৬ হাজার ৪ জন কৃষকের তালিকা অনুমোদন করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আত্মীয়স্বজন ও অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বাঙালপাড়া ইউনিয়নের উসমানপুর গ্রামের মৃত ইসহাক মিয়ার নাম তালিকায় রয়েছে। একইভাবে দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের অলি মিয়া এবং দেওঘর গ্রামের সোহেল আহমেদ, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে রয়েছেন, তাদের নামও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের আরও অনেক নাম তালিকায় রয়েছে।

শনিবার সকালে উপজেলার কলমা ইউনিয়নের সাপান্ত, বাজরি, কাকুরিয়া ও জেলেপল্লী এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বহু কৃষকের ধান এখনো হাওরের পানির নিচে তলিয়ে আছে। কিন্তু তাদের নাম সরকারি তালিকায় স্থান পায়নি।

সাপান্ত গ্রামের কৃষক জহরলাল দাস বলেন, ‘৫০ কিয়ার জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। সব পানির নিচে। ধান কাটতে পারিনি। এখন কীভাবে চলব সেই চিন্তায় আছি। শুনেছি সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করেছে, কিন্তু সেখানে আমার নাম নেই।’

কাকুরিয়া গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক অনিল দাস বলেন, ‘৩০ কিয়ার জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। হাওরে মাছও ধরতে পারছি না। কষ্টে দিন কাটছে। অথচ সহায়তার তালিকায় আমার নাম নেই।’

একই গ্রামের পরিমল দাস জানান, ২০ কিয়ার জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিন্তু তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরমেশ্বর দাস নামের আরেক কৃষক বলেন, “১০ কিয়ার জমির ধান নষ্ট হয়েছে। কয়েকদিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু কেউ নাম দেয়নি।”

হালালপুর গ্রামের কৃষক সুভাষ দাস বলেন, ‘২০ কিয়ার জমির ধান নষ্ট হয়েছে। আইডি কার্ড দিয়েছিলাম, কিন্তু পরে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। কোনো জনপ্রতিনিধি আমাদের খোঁজ নেয়নি।’

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে এক পরিবারের তিন বা ততোধিক সদস্যের নাম তালিকায় রয়েছে। অথচ তাদের কারও কৃষিজমি নেই কিংবা কোনো ক্ষতিও হয়নি। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সাপান্ত, কাকুরিয়া, হালালপুর ও চণ্ডীপুর এলাকার জেলেপল্লীতেও একই চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু পরিবার চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটালেও তাদের নাম সরকারি তালিকায় ওঠেনি।

এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মজনু মিয়া বলেন, ‘মৃত ব্যক্তি বা প্রবাসীদের নাম তালিকায় থাকলেও তারা কোনো সহায়তা পাবেন না। যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত উপকারভোগীদের মধ্যেই সহায়তা বিতরণ করা হবে।’

অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ পণ্ডিত বলেন, ‘আটটি ইউনিয়নের ৬ হাজার ৪ জন কৃষকের তালিকা অনুমোদন হয়েছে। এখন নতুন করে নাম যুক্ত করার সুযোগ নেই। তবে সরকার দ্বিতীয় ধাপে তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দিলে বাদ পড়া কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রবাসী, মৃত ব্যক্তি বা একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম থাকলে তা যাচাই-বাছাই করা হবে।

’তিনি আরও বলেন, ‘অধিকাংশ নাম স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে এসেছে। যাচাইয়ে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ বিতরণ করা হবে না এবং প্রয়োজনে অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত যাবে।’

অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সিলভিয়া স্নিগ্ধার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, জরুরি বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও ইউএনও সাধারণত ফোন রিসিভ করেন না। কখনও ফোন ধরলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বক্তব্য দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, তালিকা পুনরায় যাচাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং দ্রুত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হোক।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

পাহাড়ি ঢলে ডুবল গোমতীর চরাঞ্চল, সহস্রাধিক কৃষকের ফসলহানি

সকালে বুড়িচং উপজেলার বালিখাড়া, ভান্তি ও কামারখাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরাঞ্চলের শত শত একর সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির ওপর ভেসে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। লোকসান কিছুটা কমাতে স্থানীয় কৃষকদের কোমর সমান পানিতে নেমে অপরিপক্ব ফসল কেটে ঘরে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

১ দিন আগে

ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ভাসছে কমলগঞ্জ, পানিবন্দি ১৫ গ্রাম

রাতের আঁধারে প্রবল স্রোতে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যে ইসলামপুর, মাধবপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে মোখাবিল, গোলের হাওর, ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, কোনাগাঁও, বেরীগাঁও, শ্রীপুর, পাতারিগাঁও, কালারায়বিল, আধকানী, ছনগাঁও, বন্দেরগাঁও, তেইতইগাঁও, ভানুবিল ও ঘোর

১ দিন আগে

কিশোরগঞ্জের হাওরে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ২টি নৌ ডাকাতি

ভুক্তভোগী সদরঞ্জন দাস জানান, তিনি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার যাত্রাপুর গ্রাম থেকে অন্য এক ব্যক্তিসহ নৌকায় করে হাঁসের বাচ্চা কিনতে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার দামিহা এলাকায় যাচ্ছিলেন। পথে বর্শিকুড়া-শেরপুর সেতু সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে মাথায় হেলমেট পরিহিত সাতজনের একটি সশস্ত্র দল দেশীয় অস্ত্রের মুখে তাদের

১ দিন আগে

টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল, আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবানের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় শহরের একাধিক এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সাত উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

২ দিন আগে