সীমান্তে বিএসএফের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা ঘিরে উত্তেজনা, শান্তিপূর্ণ সমাধানের দাবি

লালমনিরহাট প্রতিনিধি
শুক্রবার লালমনিরহাট সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টাকালে বিজিবি সদস্যের বাধার মুখে পড়েন বিএসএফের সদস্যরা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও আদিতমারী উপজেলার বিপরীতে ভারতীয় সীমান্তের বেশ কয়েকটি এলাকায় এখনো কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হয়নি। স্থানীয়দের তথ্যমতে, এই কাঁটাতারবিহীন উন্মুক্ত এলাকার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। দীর্ঘ দিন ধরে সীমান্তের এই অংশগুলো অরক্ষিত ও উন্মুক্ত থাকলেও, সম্প্রতি ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখা (জিরো লাইন) ঘেঁষে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এবং বিএসএফের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

গতকাল শুক্রবার (২২ মে) নতুন করে জিরো লাইনে বাঁশের বেড়া দিতে আসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এতে তাৎক্ষণিক বাধা দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এই ঘটনার পর থেকে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তবে কূটনৈতিক মহল ও বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে যেকোনো মূল্যে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।

রংপুর ৫১ বিজিবি সূত্র এবং ব্যাটালিয়নের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গতকাল শুক্রবার লালমনিরহাটের দহগ্রাম বিওপির সীমান্ত পিলার ডিএএমপি ৭/৩০-এস এর নিকটবর্তী এলাকায় আকস্মিকভাবে বাঁশের খুঁটি ও বেড়া স্থাপনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি নজরে আসতেই বিজিবির টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বিজিবির অনড় অবস্থানের মুখে বিএসএফ তাদের খুঁটি স্থাপনের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

তবে এর পরপরই সীমান্ত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৪-৫ সেকশন বিজিবি সদস্য এবং ভারতীয় অংশে প্রায় ৪০-৫০ জন বিএসএফ সদস্য রণপ্রস্তুতি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্ত জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বিজিবি-বিএসএফ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে বিএসএফকে তাদের যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়।

বিএসএফ ওই স্থান ত্যাগ করার পর বিজিবি সদস্যরাও ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আসেন। বর্তমানে ওই পয়েন্টে সব ধরনের কাজ বন্ধ রয়েছে এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে। রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি)’র সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল নাজিউর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সীমান্ত এলাকার স্কুল শিক্ষক রিন্টু মিয়াসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, লালমনিরহাটের তিন উপজেলার এই বিস্তীর্ণ সীমান্তে কোনো বেড়া না থাকায় দুই দেশের মানুষ বহু বছর ধরে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে কৃষিকাজ, পারিবারিক যোগাযোগ ও সীমান্ত ঘেঁষা হাটবাজারে যাতায়াত করে আসছিলেন। তারা মূলত এক ধরনের সীমান্ত ঘেঁষা জীবনযাপনে অভ্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতিতে স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, ভারত ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক ‘ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি’র শর্ত স্পষ্ট লঙ্ঘন করে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখার একদম কাছাকাছি এলাকায় বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করছে। ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সীমানা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে (উভয় দেশের অন্তত ১৫০ ফুট ভেতরে) যেকোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী প্রতিরক্ষা স্থাপনা নির্মাণ করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। নিয়ম অমান্য করে জিরো লাইনে ভারতের এই আগ্রাসী ভূমিকার কারণেই দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কয়েক দফা বাক্যবিনিময় ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ও সীমান্ত ঘেঁষা কৃষি জমির মালিক মো. বাদশা মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা সীমান্তে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ চাই না, আমরা শান্তি চাই। সীমান্তে যেন গুলি, আতঙ্ক বা সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি না হয়, সে জন্য দুই দেশের সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে আমরা জমিতে কৃষিকাজ করতে পারছি না।’ একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের মতামত ও তাদের জীবনযাত্রার মানবিক বিষয়টিকেও দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের সংঘাত বা উত্তেজনা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। তাই দুই দেশের সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের সংলাপ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা নতুন কিছু নয়। অতীতে ছিটমহল বিনিময়, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ কিংবা সীমান্ত চিহ্নিতকরণের মতো অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও দুই দেশ আলোচনার টেবিলে বসে সফলভাবে সমাধান করেছে। বিশেষ করে, ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ অবসান ঘটেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান এই ভুল বোঝাবুঝির পরিস্থিতিও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অধিকার। তবে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গিয়ে প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্ব, জননিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দুই দেশের মাঠপর্যায়ের বাহিনীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যৌথ জরিপ, কূটনৈতিক আলোচনা এবং সীমান্ত পর্যায়ে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি।

কূটনীতিকরা বলছেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা দুই দেশের দীর্ঘদিনের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নানা মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। ফলে এই সীমান্ত সমস্যা যেন বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটে রূপ না নেয়, সেদিকে উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সতর্ক থাকতে হবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুফল ধরে রাখতে হলে যেকোনো মূল্যে সীমান্ত অপরাধ ও সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে, যা সীমান্তে সত্যিকারের সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনবে।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমান্ত শুধু রাষ্ট্রের মানচিত্রের বিভাজনরেখা নয়, এটি দুই পাড়ের বহু মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে, যেখানে প্রায় সবাই উত্তেজনা না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে মত দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কেবল নিয়মিত পতাকা বৈঠকই নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা দরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানসহ বহু ত্যাগ ও ইতিহাসের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে অটুট রাখতে সীমান্ত সমস্যার সমাধানও হতে হবে আন্তর্জাতিক আইন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনার ভিত্তিতে— এমনটাই প্রত্যাশা সীমান্তবাসীসহ দেশের সচেতন মহলের।

Ad
Ad
ad
ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

গ্রিসযাত্রায় ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশির সলিল সমাধি, নিখোঁজ সুনামগঞ্জের ৬ তরুণ

গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে যাত্রা করে। জানা গেছে, নৌকায় থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি।

১ দিন আগে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের অনুষ্ঠানে মাদরাসাশিক্ষার্থীদের বাধা, সংঘর্ষে আহত ৩০

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকার পুলিশ লাইন্সের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

৩ দিন আগে

নরসিংদীতে ইউপি চেয়ারম্যানের সমর্থক ও বিএনপির সংঘর্ষ, আহত ১৫

আহতদের মধ্যে রয়েছেন রায়পুরা সরকারি কলেজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন, উপজেলা যুবদল সদস্য রাসেল ভূইয়া, ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলাম পলাশ, উপজেলা জিয়া মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক দ্বীন ইসলাম ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ উদ্দিন।

৩ দিন আগে

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই ক্যামেরা, প্রথম ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়ককে এআই নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এ জন্য মহাসড়কের ৪৯০টি পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে ১ হাজার ৪২৭টি ক্যামেরা।

৩ দিন আগে