সুনামগঞ্জ-৫: আসন ‘উদ্ধারে’ মরিয়া বিএনপি, ‘নীরব ভোট বিপ্লবে’র আশায় জামায়াত

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ছাতক (সুনামগঞ্জ)
সুনামগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন (বাঁয়ে) ও জামায়াতের প্রার্থী আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম আল মাদানী (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) আসনে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। স্থানীয়রা বলছেন, ভোটের মাঠে পাঁচজন প্রার্থী থাকলেও এ আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন ও জামায়াতের আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম আল মাদানীর মধ্যে। তাদের ঘিরেই সাধারণ ভোটারদের মাঝে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের এ আসনটিতে বিএনপির বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। এরপরের সবগুলো নির্বাচনেই এ আসনে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা।

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে আড়াই দশক পর ফের আসনটি ‘উদ্ধারে’ মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি। এ আসনে তাদের প্রার্থী আড়াই দশক আগের সাবেক সংসদ সদস্য সেই কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি নিজে ভোটের মাঠে সক্রিয়। তার কর্মী-সমর্থকরা তো বটেই, স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সবাই তার পক্ষে একাট্টা। সে কারণেই আসনটিতে ধানের শীষের জয় নিয়ে আশাবাদী মিলন।

কদিন আগেও অবশ্য পরিস্থিতি এমন ছিল না। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই, কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের জন্য তার চেয়েও বড় ‘মাথাব্যথা’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজান। বিএনপি এই নেতাও ভোটের মাঠে ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। দলের টিকিট না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীও হয়েছিলেন।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, পরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন মিজানুর রহমান। দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্যের স্বার্থে তিনি বিএনপির প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে ছাতক-দোয়ারায় ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে সভা-সমাবেশ করে প্রচার চালাচ্ছেন এখন।

নেতাকর্মীরা বলছেন, মিজানুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে থাকলে তা বিএনপির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াত। নিজেদের ভোটগুলোই ভাগাভাগি হয়ে যেত। তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে কলিম উদ্দিনকে সমর্থন দেওয়ায় এখন স্থানীয় বিএনপি পুরোপুরি ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্র ও ওয়ার্ডভিত্তিক গণসংযোগ জোরদার করেছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি সক্রিয় করা, তরুণ ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং অতীত আন্দোলনের স্মৃতি তুলে ধরে ভোটারদের উজ্জীবিত করাই তাদের মূল কৌশল।

কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘এ আসন বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি। জনগণ যদি নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়, ছাতক-দোয়ারায় ধানের শীষের পক্ষে ভোট বিপ্লব ঘটবে। যে জনজোয়ার তৈরি হয়েছে, ইনশাআল্লাহ আমরা এই আসন উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারব।’

এদিকে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর শাখার শুরা ও কর্মপরিষদের সদস্য সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী। ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে তিনিও ভোটের মাঠে সক্রিয়। প্রকাশ্য শোরগোল কম রেখে ঘরে ঘরে গণসংযোগ এবং ধর্মীয় ও নীরব ভোটব্যাংকের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। তিনিসহ জামায়াতের নেতাকর্মীরা আশা করছেন, তাদের পক্ষে ‘নীরব ভোট বিপ্লব’ হবে, মানুষ দাঁড়িপাল্লাকেই বেছে নেবে।

মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী বলেন, ‘আমরা শোরগোলের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। মানুষ পরিবর্তন চায়, আর সেই পরিবর্তন আসবে নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে। ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে ছাতক ও দোয়ারাবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব সমাবেশে সরকারবিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হচ্ছে।’

এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আব্দুল কাদির (দেয়াল ঘড়ি), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (লাঙ্গল) এবং এনপিপির মো. আজিজুল হক (আম)।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৪৫৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৭০ হাজার ৬২০ জন, নারী ভোটার দুই লাখ ৫৬ হাজার ৮৩৬ জন, হিজড়া ভোটার রয়েছেন দুজন।

ভোটার তালিকায় নারী ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হওয়ায় প্রার্থীদের প্রচারে নারী ভোটারদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ও নতুন ভোটারও রয়েছেন এ আসনে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান তৈরি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়গুলো ভোটাররা তাদের প্রধান ভাবনায় রেখেছেন।

ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার ইউনিয়নের ভোটার কৃষক আবদুল করিম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমরা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি এলাকার কৃষক ও কেটে খাওয়া গরিব মানুষের কথা চিন্তা করে সংসদে গিয়ে জোরালোভাবে বক্তব্য তুলে ধরবেন। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সারা বছর মানুষের পাশে থাকবেন— আমরা এমন এমপি চাই।’

দেয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের নারী ভোটার রংমালা বেগম বলেন, ‘এলাকার রাস্তাগুলো বেহাল অবস্থা দীর্ঘদিনের। আগের এমপি ১৫ বছরে কোনো কাম-কাজ করেননি। এবার বুঝেশুনে এমন একজন ভালো প্রার্থীকে ভোট দেবো, যিনি রাস্তাঘাটের উন্নতি করবেন।’

ধানের শীষ নাকি দাঁড়িপাল্লা— সুনামগঞ্জ-৫ আসনে শেষ পর্যন্ত জয় উঠবে কার ঘরে, তার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে আর পাঁচ দিন।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

পটুয়াখালী-৪: নতুন সমীকরণে জমে উঠেছে ভোটের লড়াই

মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর অংশগ্রহণ ভোটের অঙ্কে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা।

৪ ঘণ্টা আগে

ভোট শেষে রাতেই সব কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করতে হবে: প্রিন্স

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সব আতঙ্ক দূর করে নূন্যতম গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে দৃশ্যমান দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাজারে নির্বাচনে কারসাজির কথা আলোচিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ও জেলা রিটার্নিং অফিসারকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ভোট শেষ হওয়ার পর রাতে সব

১৬ ঘণ্টা আগে

মুন্সীগঞ্জে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর প্রচারে হামলা, ককটেল-গুলি

স্থানীয়রা জানান, শনিবার সকালে ফুটবল প্রতীকের সমর্থক জেলা বিএনপির সদস্য আতাউর রহমান মল্লিকের লোকজন মুন্সীকান্দি এলাকায় ভোট চাইতে যান। এ সময় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কামরুজ্জামান রতন সমর্থক স্থানীয় বিএনপি নেতা উজির আলী ও আওলাদ মোল্লার লোকজন ককটেল নিয়ে হামলা করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ফুটবল প্রতীকের সমর্

১৮ ঘণ্টা আগে

ময়মনসিংহ-৯ আসন: সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় ১২১ ভোটকেন্দ্র

নান্দাইল উপজেলার সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত জানান, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য আমারা কোনো ফাঁক রাখতে চাই না। তাই প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের কোনোটিতে সর্বোচ্চ ১৬টি ও সর্বনিম্ন ছয়টি থেকে আটটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের আয়তন, ভোটার ও বুথ সংখ্

২০ ঘণ্টা আগে