
ড. কাজী নূরুল ইসলাম

[ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের নৈতিক উন্নয়ন কেন্দ্র আয়োজিত এক সেমিনারে ২০২৪ সনের জুন মাসে এ প্রবন্ধের একাংশ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম। বর্তমান প্রবন্ধটি তারই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ। চারটি পর্বে বিভক্ত করে প্রবন্ধটি প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব।]
জৈন ধর্ম মানুষের মুক্তির জন্য নৈতিকতার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই ধর্ম অনুযায়ী, বন্দি অবস্থা থেকে আত্মার মুক্তির উপায় তিনটি— সম্যগ দর্শন বা সত্যের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, সম্যগজ্ঞান বা সংশয়শূন্য ও ভ্রমমুক্ত বিশদ জ্ঞান এবং সম্যগ চারিত্র বা হিত আচরণে প্রবৃত্ত হওয়া এবং অহিতকর আচরণ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা। আত্মার মুক্তির জন্য অপরিহার্য এই তিনটি উপায়কে বলা হয় ত্রিরত্ন।
এই ত্রিরত্নের তৃতীয় রত্নটিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্যগ চারিত্রের জন্য আটটি শর্ত পূরণ করা একান্ত প্রয়োজন। এই আটটি শর্ত হলো—
সম্যগ চারিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করার মাধ্যমেই আসবে সান্তসমাহিত নির্লিপ্ততা এবং অনাবিল আনন্দের পবিত্রতা।
জৈন দার্শনিকরা অধিবিদ্যা, জ্ঞানবিদ্যা ইত্যাদি অনেক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তাদের নীতিশাস্ত্রের ওপর। জৈনরা সত্য বলতে সত্য কথন বুঝেন না, এই ধর্ম অনুযায়ী যা সত্য ও হিতকর কেবল তেমন কথা বলাকেই সত্য বলা হয়। এই ধর্মের অনুসারীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সত্য কথা বলার জন্য যদি কারও জীবন বিপন্ন হয় বা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা বলা অন্যায়।
ধীরেন্দ্র মোহন দত্ত ও সতীশ চন্দ্র চাটার্জির ভাষায়— ‘Truthfulness is not speaking what is only true, but speaking what is true as well as good and pleasant. Without these qualifications the practice of truthfulness would be of litle use as an aid to moral progress. Because, merely speaking what is true may descend into what is garrulity, frivolity and vilification etc.’
দয়ানন্দ ভার্গভও মনে করেন— ‘Truth is not only a negation of lie but a negation of all which is injurious.’
প্রথম পর্ব:
নৈতিকতার প্রশ্নে ব্রহ্মচর্য সম্পর্কেও জৈনদের ব্যাখ্যা একটু ভিন্নতর। ব্রহ্মচর্য বলতে জৈনরা শুধু পুরুষের নারীর সান্নিধ্যে আসাকে বোঝেন না; তাদের মতে, ব্রহ্মচর্য হলো সব ধরনের ইন্দ্রিয় সম্ভোগ থেকে বিরত থাকা। সব ধরনের কামের নিরোধই ব্রহ্মচর্য। কেবল বাহ্যসংযমই যথেষ্ট নয়; অন্তরে, বাইরে, প্রত্যক্ষভাবে, পরোক্ষভাবে, চিন্তায়, বাক্যে ও মনে সব ধরনের সংযম অবলম্বন করাই হলো ব্রহ্মচর্য।
জৈন ধর্মের ২৪তম বা সবশেষ তীর্থঙ্কর মহাবীর দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে তার শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার করেছেন। তার এই শিক্ষা সংগৃহীত হয়েছে তার মৃত্যুর অনেক পরে। জৈনদের গ্রন্থ অনেক ও বহুমাত্রিক। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে দ্বাদশ অঙ্গ নামক গ্রন্থটি বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় অঙ্গের নাম শ্রুতিকৃত অঙ্গ। প্রাকৃত ভাষায় রচিত এই গ্রন্থের অনুবাদ করেন হারম্যান জ্যাকোবি। এই গ্রন্থে জৈনদের নৈতিক শিক্ষা বিস্তারিতভাবে বিধৃত হয়েছে। এই গ্রন্থের আলোকেই জৈনদের কিছু শিক্ষা বর্ণনা করা হলো।
গৌতম বুদ্ধের মতো মহাবীরও সাধারণ মানুষের কাছে সহজ সরল ভাষায় তার শিক্ষা উপস্থাপন করতেন। তিনি প্রায়ই তার ভক্তদের পাপাচার থেকে বিরত থাকতে বলতেন—
মহাবীর সবসময়ই তার অগণিত অনুসারীদেরকে আত্মার মুক্তির জন্য জাগতিক বিষয়ের প্রতি অনাসক্ত হতে বলতেন—
মহাবীর ছিলেন মূলত একজন নৈতিক শিক্ষক। তবে তার শিক্ষার প্রাণ হলো অহিংসার দর্শন। অহিংস নীতি অনুসরণ করার জন্য তিনি অনেক শিক্ষা দিয়েছেন। তার অসংখ্য শিক্ষা থেকে এখানে কয়েকটি শিক্ষা উদ্ধৃত করা হলো—
চীন দেশের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসাবে যিনি খ্যাত এবং সর্বজনস্বীকৃত তিনি হলেন কনফুসিয়াস। এ দেশের আর একজন দার্শনিক ছিলেন। তার নাম লাও যু। তারা দুজনেই সমসাময়িক। তবে দ্বিতীয়জন প্রথমজনের চেয়ে বয়সে ৫৩ বছরের বড়। উভয়ের শিক্ষাই ধর্ম ও দর্শন হিসাবে স্বীকৃত। উভয়ের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নৈতিক উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণ।
কনফুসিয়াস শুধু নৈতিকতার ওপর জোর দিয়েই ক্ষান্ত হননি, যেসব বিষয় নৈতিকতার অন্তরায় হতে পারে তা-ও দূর করতে চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করতেন, একই শব্দের অর্থের তারতম্য ও বিভিন্নতা আমাদের নৈতিকতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এ কারণে প্রথমেই তিনি শব্দের অর্থ নির্ধারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
কনফুসিয়াসের মতে তিনিই শ্রেয় ব্যক্তি যিনি সৎ জীবনযাপন করেন এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেন। একটি বিশেষ অর্থে মধ্যমপন্থা কথাটি তিনি ব্যবহার করেন। তার মতে মধ্যমপন্থা হলো— জ্ঞান ও উদ্দেশ্যের প্রতি আন্তরিকতা, সমাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সমন্বয় এবং বিশ্বশান্তি।
কনফুসিয়াস সবসময়ে বলতেন, বাড়াবাড়ি কোরো না, কারো কোনো প্রকার ক্ষতি কোরো না। তাহলে কেউ তোমাকে অনুসরণ করবে না। তিনি আরও বলতেন, তোমার জন্য যা কামনা করো না, অন্যের জন্যও তা কামনা করবে না। অন্যের প্রতি এমন ব্যবহার করবে না, যে ধরনের ব্যবহার অন্যের কাছ থেকে তুমি প্রত্যাশা করো না।
সৎ গুণের ওপর এ ধর্ম এত বেশি জোড় দিয়েছে যে এই ধর্ম অনুযায়ী একজন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো তার সৎগুণের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। কনফুসিয়াস বলেন, একটি ক্ষমাসুন্দর নরম হৃদয় হলো ভালোবাসার বীজ; লজ্জ্বা ও ঘৃণার জন্য হৃদয় সত্যের বীজ; ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় প্রতিরোধের হৃদয় বুদ্ধিমত্তার বীজ। তিনি আরও বলেন, স্বর্গকে পেতে হলে মানুষকে জয় করো; মানুষকে জয় করতে হলে তার হৃদয়কে জয় করো; মানুষের হৃদয়কে জয় করতে হলে তার জন্য একত্রিত হও এবং তারা যা পছন্দ করে তাদের তা-ই দাও, আর তারা যা অপছন্দ করে তা থেকে বিরত থাকো।
কনফুসিয়াসের অনুসারীরা তার অনেক গ্রন্থের মধ্যে যে গ্রন্থকে বিশেষ মর্যাদা দেন তা হলো লুনইউ বা অ্যানালেক্টস। এর বাংলা হলো ‘কথোপকথন’। এই গ্রন্থে কথোপকথনের মধ্যেমেই কনফুসিয়াসের নৈতিক শিক্ষা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। Analects থেকে আদর্শ মানুষ সম্পর্কিত তার কয়েকটি শিক্ষার কথা উল্লেখ করা হলো—
একজন আর্দশ মানুষ সব সময় ৯টি বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করেন— পরিস্কার দৃষ্টিভঙ্গী, দ্রুত শ্রবন, প্রকাশের ক্ষেত্রে অমায়িক ভদ্র আচরণ, সৎবচন, কর্তব্যপরায়ণ, সন্দেহের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা, ক্রোধের সময় আত্মসংযম ও সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পথে ধাবমান।
কনফুসিয়াসের আরও কয়েকটি নৈতিক শিক্ষার কথা উল্লেখ করছি—
নিজের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কনফুসিয়াস প্রতিদিন নিজের কাছেই কতিপয় প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নগুলো হলো— ‘অন্যদের ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমি কি বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়েছি? বন্ধুদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আমি কি আন্তরিক হতে ব্যর্থ হয়েছি? শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে যা আমি শিখিয়েছি তা অনুসরণ করতে কি আমি অপারগ হয়েছি?’
আমরাও যদি কনফুসিয়াসের মতো প্রতিদিন নিজের কাজের মূল্যায়ন করি এবং নিজের সততা ও নৈতিকতার ব্যাপারে নিষ্ঠাবান হই তাহলে আমরাও আদর্শ মানুষ হতে পারব এবং আমাদের দেশ ও জাতিকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হব।
লাও যু প্রতিষ্ঠিত তাওবাদ (Taoism) মূলত একটি নৈতিক শিক্ষার ধর্ম। তাওবাদ অনুযায়ী পাঁচটি কাজ বর্জনীয় এবং ১০টি কাজ বাঞ্ছনীয়। বর্জনীয় কাজগুলো হলো— মাদকদ্রব্য, হত্যা, মিথ্যা ভাষণ, চৌর্যবৃত্তি ও ব্যভিচার। অন্যদিকে বাঞ্ছনীয় ১০টি কাজ হলো— জনক-জননীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্রাট ও গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, সর্বজীবে দয়া, ধৈর্যধারণ করা এবং ভুল কাজ থেকে বিরত থাকা, আত্মত্যাগ, দাসকে মুক্তি দেওয়া, কূপ খনন ও রাস্তা নির্মাণ, জ্ঞানহীনকে জ্ঞান দান, সামাজিক মঙ্গল সাধন ও ধর্মপুস্তক পাঠ।
লাও যু বলতেন, তিনটি জিনিসকে তিনি শক্ত করে ধরে রেখেছেন এবং এদের তিনি যথেষ্ট মূল্য দিতেন। এ তিনটি জিনিস হলো— ভদ্রতা, মিতব্যয়িতা ও বিনয়। তিনি দাবি করেন, বিনয় তাকে অন্যদের কাছে বড় করে দেখানো থেকে দূরে রেখেছে।
লাও যু তার ভক্তদেরকে বলতেন, তোমরা ভদ্র হও, তাহলে সাহসী হতে পারবে। মিতব্যায়ী হও, তাহলে উদার হতে পারবে। তিনি আরও বলেন, তোমার প্রতিবেশীর লাভ ও ক্ষতিকে তোমার নিজের লাভক্ষতির মতোই মনে কর। পুণ্যের পথ থেকে দূরে সরে যেও না। স্বার্থপরতাকে সংযত করো এবং কামনা-বাসনার পরিমাণ কমাও।
এই ধর্ম পরার্থবাদী ধর্ম এবং সে কারণে এই ধর্মের শিক্ষা হলো— অন্যকে সাহায্য করো এবং সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখো। লাও যু পাঁচটি জিনিসকে সবসময় ও সর্বাবস্থায় পরিহার করতে বলতেন— লোভ, মোহ, হিংসা, ঘৃণা ও অহংকার। আমরা সবাই যদি এই পাঁচটি বিষয় নিষ্ঠার সঙ্গে পরিহার করি, তাহলে আমরা আদর্শ মানুষে পরিণত হব এবং কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব।
লাও যু গৌতম বুদ্ধের মতো সম্যকবাকে বিশ্বাস করতেন। তার মতে, অতিকথন আমাদের বিপদ ডেকে আনে এবং নীরব থাকাকেই তিনি উত্তমপন্থা বলে মনে করতেন। তিনি বলতেন, কারও কথার উৎকর্ষ নির্ভর করে সত্যবাদিতার ওপর। বিতর্কে জড়ানোকে তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, একজন ভালো মানুষ বিতর্কে জড়ান না। তার মতে, একজন আদর্শ মানুষ ভালোবাসা বা ঘৃণা দ্বারা প্রভাবিত হন না; লাভ-ক্ষতি, সম্মান কিংবা লজ্জা দ্বারা তাড়িত হন না। আর সে কারণেই সারা পৃথিবীর মানুষ তাকে সম্মান করে।
লাও যুর মতানুসারে, একজন আদর্শ মানুষ আত্মতৃপ্ত। তিনি বলতেন, অসন্তোষের চেয়ে বড় দুর্যোগ আর নেই। মহাবীরের মতো লাও যু-ও বলতেন, যে অন্যকে জয় করে সে শক্তিশালী। কিন্তু যে তার নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে মহাশক্তিশালী। গৌতম বুদ্ধের মতো লাও যু বলতেন, কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করাই হচ্ছে শান্তি লাভের সঠিক উপায়।
লাও যু অহংকারকে অপছন্দ করতেন। বলতেন, ধন-ক্ষমতা আর অহংকার আমাদের ধংসের দিকে নিয়ে যায়। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বুদ্ধ, এরিস্টটল প্রমুখের মতো লাও যু-ও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের একজন বড় প্রবক্তা ছিলেন।
লাও যুর মূল শিক্ষা তার লেখা তাও তে কিং (Tao Te King) নামক সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। এ গ্রন্থ থেকে তার কিছু শিক্ষা এরই মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। লাও যুর নৈতিক শিক্ষার আরও কিছু বক্তব্য এখন বর্ণনা করছি—
সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাওধর্মতত্ত্ববিদ ড. লিভরা কোহন। তিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটির খ্যাতিমান অধ্যাপক। তিনি তার বিখ্যাত Cosmos and Community: The Ethical Diemention of Daoism গ্রন্থে ১৮০টি বিষয়ে নিষেধ করেছেন। লাও যুর ১৮০টি নিষেধাজ্ঞা থেকে আগের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি এড়াতে মাত্র ২০টি নিষেধাজ্ঞা এখানে উল্লেখ করছি—
জরথুস্ট্রবাদের প্রতিষ্ঠাতা হলেন জরথুস্ট্র। এই ধর্ম সততা ও নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই ধর্ম অনুযায়ী তিনটি কাজ অবশ্য করণীয় এবং তিনটি কাজ অবশ্য বর্জনীয়। করণীয় তিনটি কাজ হলো— হুমাতা বা সৎ চিন্তা, হুক্তা বা সৎ বাক্য ও হ্বার্শতা বা সৎ কর্ম। বর্জনীয় কাজ হলো এর বিপরীত— দুশ্মতা বা অসৎ চিন্তা, দুঝুক্তা বা অসৎ বাক্য ও দুশ্বাশতা বা অসৎ কর্ম।
এই ধর্মে সততার ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। জরথুস্ট্র সবসময় বলতেন, ‘যে সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আহুরা মাজদাকে ভালোবাসতে চায় তার উচিত ভালো মানুষকে ভালোবাসা। কারণ সৎ মানুষ আহুরা মাজদারই ভিন্নরূপ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন সৎ চিন্তা, তারপর সৎ বাক্য ও তারপর সৎ কাজ। পথিবীর সবলোকও যদি মিথ্যা বলে তবে একজন সত্যবাদীর বক্তব্য তাদের সবার বক্তব্যের চেয়ে শ্রেয় এবং অধিক গ্রহণযোগ্য। সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য ও সৎ কর্ম বেহেশতে যাওয়ার ছাড়পত্র।’
চারটি অভ্যাস এই ধর্মের মূলমন্ত্র— যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশ্নে উদার হওয়া, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সবার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হওয়া এবং আন্তরিকতা ও সততার মাধ্যমে মিথ্যাকে দূরে রাখা।
জরথুস্ট্র মনে করতেন অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই একজন মানুষ সৎ চিন্তা করে, সত্য কথা বলে এবং সৎ কর্মে যুক্ত হয়। আবার জ্ঞানের অভাবেই মানুষ অসৎ চিন্তা, অসৎ বাক্য ও অসৎ কর্মে আসক্ত হয়। সব সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য ও সৎ কর্মই একজন মানুষকে বেহেশতে নিয়ে যাবে। পক্ষান্তরে এর উলটোটা একজন মানুষকে উলটো পথে অর্থাৎ দোজখে নিয়ে যাবে।
জরথুস্ট্রবাদ অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষকে কতগুলো মহৎ গুণের অধিকারী হতে হবে। প্রথমেই ‘আশা’ (Asha), যার অর্থ পুতচরিত্র। এই আশা হলো জরথুস্ট্রের নৈতিক শিক্ষার সারাৎসার। জরথুষ্ট্রবাদের অনুসারী যেকোনো নারী বা পুরুষকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, সে যেন আশা বা পবিত্রতার পথ অনুসরণ করে আদর্শ মানুষের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়।
এরপর আসে আর্শমনঙঘ (Arsh-manangh) বা সততা। এখানে সততা বল্তে বুঝানো হয়েছে যথাসময়ে ঋণশোধকে। আহুরা মাজদার কঠোর নির্দেশ, যথাসময়ে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ঋণ পরিশোধ করো। জরথুস্ট্রের পরবর্তী নির্দেশ হলো স্রায়োশ (Sraosh), যা বলতে বুঝায় নম্রতা, ভদ্রতা, শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ, অনুগত ইত্যাদি। এই ধর্মের অনুসারীরা প্রতিদিন প্রার্থনা করে যেন তারা এই গুণগুলোর অধিকারী হতে পারে।
এরপর যে গুণের কথা বলা হয়েছে তা হলো মার্ঝাদিকা (Marzhadika), যার অর্থ দয়া ও ক্ষমা। কিন্তু জরথুষ্ট্র দুর্বৃত্তদের ক্ষেত্রে অতি কঠোর। কারণ দুর্বৃত্তদের ক্ষমা করার অর্থ হলো তাদের অনৈতিক ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা এবং তাদের পাপাচারে উৎসাহিত করা। আরশুখধো বাক্শ (Arshukhdho Vaksh) বা সত্যবাদিতাকে এই ধর্ম একটি মহৎ গুণ হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। জরথুস্ট্র তার অনুসারীদের মিথ্যা সাক্ষী না দেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিচারকদেরকে সর্বাবস্থায় ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ন্যায়নীতি ও কঠোরতা অবলম্বন করতে বলেছেন।
জরথুস্ট্রের নির্দেশ— শত্রুর সঙ্গেও ন্যায় বিচার করো। তিনি বলেন, যে ন্যায়বিচার করে না তার স্বভাব আহরিমনের স্বভাব এবং সে দৈত্যের সমতুল্য। জরথুস্ট্রবাদ মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে। অসৎ শক্তির বিরুদ্ধে সৎ শক্তির সংগ্রামে সৎকে পছন্দ করার জন্যই এই স্বাধীনতা।
মানুষের মহৎ গুণের কথা বলতে গিয়ে আমরা ‘আশা’র কথা বলেছি। এই আশা বা Holiness-এর সম্পূর্ণ বিপরীত হলো দ্রুজ (Druj), যার অর্থ অধার্মিকতা ও অনৈতিকতা। অসততা, অর্থলিপ্সা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও জেদী স্বভাব হলো দ্রুজের উদাহরণ।
জরথুস্ট্রের মতে সর্বাবস্থায় এসব পরিত্যায্য। পরনিন্দা, প্রতিশোধ, সংঘাত, গালিগালাজ, মিথ্যা হলফ, ওয়াদা ভঙ্গ, ঘুষ দেওয়া, ঘুষ নেওয়া, প্রতারণা করা ইত্যাদি এ ধর্ম অনুযায়ী জঘন্য অপরাধ। কৃপণতা, অহংকার, লোভ, পরশ্রীকারতরতা, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা এই ধর্মে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র:

[ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের নৈতিক উন্নয়ন কেন্দ্র আয়োজিত এক সেমিনারে ২০২৪ সনের জুন মাসে এ প্রবন্ধের একাংশ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম। বর্তমান প্রবন্ধটি তারই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ। চারটি পর্বে বিভক্ত করে প্রবন্ধটি প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব।]
জৈন ধর্ম মানুষের মুক্তির জন্য নৈতিকতার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই ধর্ম অনুযায়ী, বন্দি অবস্থা থেকে আত্মার মুক্তির উপায় তিনটি— সম্যগ দর্শন বা সত্যের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, সম্যগজ্ঞান বা সংশয়শূন্য ও ভ্রমমুক্ত বিশদ জ্ঞান এবং সম্যগ চারিত্র বা হিত আচরণে প্রবৃত্ত হওয়া এবং অহিতকর আচরণ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা। আত্মার মুক্তির জন্য অপরিহার্য এই তিনটি উপায়কে বলা হয় ত্রিরত্ন।
এই ত্রিরত্নের তৃতীয় রত্নটিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্যগ চারিত্রের জন্য আটটি শর্ত পূরণ করা একান্ত প্রয়োজন। এই আটটি শর্ত হলো—
সম্যগ চারিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করার মাধ্যমেই আসবে সান্তসমাহিত নির্লিপ্ততা এবং অনাবিল আনন্দের পবিত্রতা।
জৈন দার্শনিকরা অধিবিদ্যা, জ্ঞানবিদ্যা ইত্যাদি অনেক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তাদের নীতিশাস্ত্রের ওপর। জৈনরা সত্য বলতে সত্য কথন বুঝেন না, এই ধর্ম অনুযায়ী যা সত্য ও হিতকর কেবল তেমন কথা বলাকেই সত্য বলা হয়। এই ধর্মের অনুসারীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সত্য কথা বলার জন্য যদি কারও জীবন বিপন্ন হয় বা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা বলা অন্যায়।
ধীরেন্দ্র মোহন দত্ত ও সতীশ চন্দ্র চাটার্জির ভাষায়— ‘Truthfulness is not speaking what is only true, but speaking what is true as well as good and pleasant. Without these qualifications the practice of truthfulness would be of litle use as an aid to moral progress. Because, merely speaking what is true may descend into what is garrulity, frivolity and vilification etc.’
দয়ানন্দ ভার্গভও মনে করেন— ‘Truth is not only a negation of lie but a negation of all which is injurious.’
প্রথম পর্ব:
নৈতিকতার প্রশ্নে ব্রহ্মচর্য সম্পর্কেও জৈনদের ব্যাখ্যা একটু ভিন্নতর। ব্রহ্মচর্য বলতে জৈনরা শুধু পুরুষের নারীর সান্নিধ্যে আসাকে বোঝেন না; তাদের মতে, ব্রহ্মচর্য হলো সব ধরনের ইন্দ্রিয় সম্ভোগ থেকে বিরত থাকা। সব ধরনের কামের নিরোধই ব্রহ্মচর্য। কেবল বাহ্যসংযমই যথেষ্ট নয়; অন্তরে, বাইরে, প্রত্যক্ষভাবে, পরোক্ষভাবে, চিন্তায়, বাক্যে ও মনে সব ধরনের সংযম অবলম্বন করাই হলো ব্রহ্মচর্য।
জৈন ধর্মের ২৪তম বা সবশেষ তীর্থঙ্কর মহাবীর দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে তার শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার করেছেন। তার এই শিক্ষা সংগৃহীত হয়েছে তার মৃত্যুর অনেক পরে। জৈনদের গ্রন্থ অনেক ও বহুমাত্রিক। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে দ্বাদশ অঙ্গ নামক গ্রন্থটি বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় অঙ্গের নাম শ্রুতিকৃত অঙ্গ। প্রাকৃত ভাষায় রচিত এই গ্রন্থের অনুবাদ করেন হারম্যান জ্যাকোবি। এই গ্রন্থে জৈনদের নৈতিক শিক্ষা বিস্তারিতভাবে বিধৃত হয়েছে। এই গ্রন্থের আলোকেই জৈনদের কিছু শিক্ষা বর্ণনা করা হলো।
গৌতম বুদ্ধের মতো মহাবীরও সাধারণ মানুষের কাছে সহজ সরল ভাষায় তার শিক্ষা উপস্থাপন করতেন। তিনি প্রায়ই তার ভক্তদের পাপাচার থেকে বিরত থাকতে বলতেন—
মহাবীর সবসময়ই তার অগণিত অনুসারীদেরকে আত্মার মুক্তির জন্য জাগতিক বিষয়ের প্রতি অনাসক্ত হতে বলতেন—
মহাবীর ছিলেন মূলত একজন নৈতিক শিক্ষক। তবে তার শিক্ষার প্রাণ হলো অহিংসার দর্শন। অহিংস নীতি অনুসরণ করার জন্য তিনি অনেক শিক্ষা দিয়েছেন। তার অসংখ্য শিক্ষা থেকে এখানে কয়েকটি শিক্ষা উদ্ধৃত করা হলো—
চীন দেশের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসাবে যিনি খ্যাত এবং সর্বজনস্বীকৃত তিনি হলেন কনফুসিয়াস। এ দেশের আর একজন দার্শনিক ছিলেন। তার নাম লাও যু। তারা দুজনেই সমসাময়িক। তবে দ্বিতীয়জন প্রথমজনের চেয়ে বয়সে ৫৩ বছরের বড়। উভয়ের শিক্ষাই ধর্ম ও দর্শন হিসাবে স্বীকৃত। উভয়ের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নৈতিক উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণ।
কনফুসিয়াস শুধু নৈতিকতার ওপর জোর দিয়েই ক্ষান্ত হননি, যেসব বিষয় নৈতিকতার অন্তরায় হতে পারে তা-ও দূর করতে চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করতেন, একই শব্দের অর্থের তারতম্য ও বিভিন্নতা আমাদের নৈতিকতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এ কারণে প্রথমেই তিনি শব্দের অর্থ নির্ধারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
কনফুসিয়াসের মতে তিনিই শ্রেয় ব্যক্তি যিনি সৎ জীবনযাপন করেন এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেন। একটি বিশেষ অর্থে মধ্যমপন্থা কথাটি তিনি ব্যবহার করেন। তার মতে মধ্যমপন্থা হলো— জ্ঞান ও উদ্দেশ্যের প্রতি আন্তরিকতা, সমাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সমন্বয় এবং বিশ্বশান্তি।
কনফুসিয়াস সবসময়ে বলতেন, বাড়াবাড়ি কোরো না, কারো কোনো প্রকার ক্ষতি কোরো না। তাহলে কেউ তোমাকে অনুসরণ করবে না। তিনি আরও বলতেন, তোমার জন্য যা কামনা করো না, অন্যের জন্যও তা কামনা করবে না। অন্যের প্রতি এমন ব্যবহার করবে না, যে ধরনের ব্যবহার অন্যের কাছ থেকে তুমি প্রত্যাশা করো না।
সৎ গুণের ওপর এ ধর্ম এত বেশি জোড় দিয়েছে যে এই ধর্ম অনুযায়ী একজন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো তার সৎগুণের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। কনফুসিয়াস বলেন, একটি ক্ষমাসুন্দর নরম হৃদয় হলো ভালোবাসার বীজ; লজ্জ্বা ও ঘৃণার জন্য হৃদয় সত্যের বীজ; ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় প্রতিরোধের হৃদয় বুদ্ধিমত্তার বীজ। তিনি আরও বলেন, স্বর্গকে পেতে হলে মানুষকে জয় করো; মানুষকে জয় করতে হলে তার হৃদয়কে জয় করো; মানুষের হৃদয়কে জয় করতে হলে তার জন্য একত্রিত হও এবং তারা যা পছন্দ করে তাদের তা-ই দাও, আর তারা যা অপছন্দ করে তা থেকে বিরত থাকো।
কনফুসিয়াসের অনুসারীরা তার অনেক গ্রন্থের মধ্যে যে গ্রন্থকে বিশেষ মর্যাদা দেন তা হলো লুনইউ বা অ্যানালেক্টস। এর বাংলা হলো ‘কথোপকথন’। এই গ্রন্থে কথোপকথনের মধ্যেমেই কনফুসিয়াসের নৈতিক শিক্ষা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। Analects থেকে আদর্শ মানুষ সম্পর্কিত তার কয়েকটি শিক্ষার কথা উল্লেখ করা হলো—
একজন আর্দশ মানুষ সব সময় ৯টি বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করেন— পরিস্কার দৃষ্টিভঙ্গী, দ্রুত শ্রবন, প্রকাশের ক্ষেত্রে অমায়িক ভদ্র আচরণ, সৎবচন, কর্তব্যপরায়ণ, সন্দেহের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা, ক্রোধের সময় আত্মসংযম ও সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পথে ধাবমান।
কনফুসিয়াসের আরও কয়েকটি নৈতিক শিক্ষার কথা উল্লেখ করছি—
নিজের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কনফুসিয়াস প্রতিদিন নিজের কাছেই কতিপয় প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নগুলো হলো— ‘অন্যদের ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমি কি বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়েছি? বন্ধুদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আমি কি আন্তরিক হতে ব্যর্থ হয়েছি? শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে যা আমি শিখিয়েছি তা অনুসরণ করতে কি আমি অপারগ হয়েছি?’
আমরাও যদি কনফুসিয়াসের মতো প্রতিদিন নিজের কাজের মূল্যায়ন করি এবং নিজের সততা ও নৈতিকতার ব্যাপারে নিষ্ঠাবান হই তাহলে আমরাও আদর্শ মানুষ হতে পারব এবং আমাদের দেশ ও জাতিকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হব।
লাও যু প্রতিষ্ঠিত তাওবাদ (Taoism) মূলত একটি নৈতিক শিক্ষার ধর্ম। তাওবাদ অনুযায়ী পাঁচটি কাজ বর্জনীয় এবং ১০টি কাজ বাঞ্ছনীয়। বর্জনীয় কাজগুলো হলো— মাদকদ্রব্য, হত্যা, মিথ্যা ভাষণ, চৌর্যবৃত্তি ও ব্যভিচার। অন্যদিকে বাঞ্ছনীয় ১০টি কাজ হলো— জনক-জননীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্রাট ও গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, সর্বজীবে দয়া, ধৈর্যধারণ করা এবং ভুল কাজ থেকে বিরত থাকা, আত্মত্যাগ, দাসকে মুক্তি দেওয়া, কূপ খনন ও রাস্তা নির্মাণ, জ্ঞানহীনকে জ্ঞান দান, সামাজিক মঙ্গল সাধন ও ধর্মপুস্তক পাঠ।
লাও যু বলতেন, তিনটি জিনিসকে তিনি শক্ত করে ধরে রেখেছেন এবং এদের তিনি যথেষ্ট মূল্য দিতেন। এ তিনটি জিনিস হলো— ভদ্রতা, মিতব্যয়িতা ও বিনয়। তিনি দাবি করেন, বিনয় তাকে অন্যদের কাছে বড় করে দেখানো থেকে দূরে রেখেছে।
লাও যু তার ভক্তদেরকে বলতেন, তোমরা ভদ্র হও, তাহলে সাহসী হতে পারবে। মিতব্যায়ী হও, তাহলে উদার হতে পারবে। তিনি আরও বলেন, তোমার প্রতিবেশীর লাভ ও ক্ষতিকে তোমার নিজের লাভক্ষতির মতোই মনে কর। পুণ্যের পথ থেকে দূরে সরে যেও না। স্বার্থপরতাকে সংযত করো এবং কামনা-বাসনার পরিমাণ কমাও।
এই ধর্ম পরার্থবাদী ধর্ম এবং সে কারণে এই ধর্মের শিক্ষা হলো— অন্যকে সাহায্য করো এবং সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখো। লাও যু পাঁচটি জিনিসকে সবসময় ও সর্বাবস্থায় পরিহার করতে বলতেন— লোভ, মোহ, হিংসা, ঘৃণা ও অহংকার। আমরা সবাই যদি এই পাঁচটি বিষয় নিষ্ঠার সঙ্গে পরিহার করি, তাহলে আমরা আদর্শ মানুষে পরিণত হব এবং কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব।
লাও যু গৌতম বুদ্ধের মতো সম্যকবাকে বিশ্বাস করতেন। তার মতে, অতিকথন আমাদের বিপদ ডেকে আনে এবং নীরব থাকাকেই তিনি উত্তমপন্থা বলে মনে করতেন। তিনি বলতেন, কারও কথার উৎকর্ষ নির্ভর করে সত্যবাদিতার ওপর। বিতর্কে জড়ানোকে তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, একজন ভালো মানুষ বিতর্কে জড়ান না। তার মতে, একজন আদর্শ মানুষ ভালোবাসা বা ঘৃণা দ্বারা প্রভাবিত হন না; লাভ-ক্ষতি, সম্মান কিংবা লজ্জা দ্বারা তাড়িত হন না। আর সে কারণেই সারা পৃথিবীর মানুষ তাকে সম্মান করে।
লাও যুর মতানুসারে, একজন আদর্শ মানুষ আত্মতৃপ্ত। তিনি বলতেন, অসন্তোষের চেয়ে বড় দুর্যোগ আর নেই। মহাবীরের মতো লাও যু-ও বলতেন, যে অন্যকে জয় করে সে শক্তিশালী। কিন্তু যে তার নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে মহাশক্তিশালী। গৌতম বুদ্ধের মতো লাও যু বলতেন, কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করাই হচ্ছে শান্তি লাভের সঠিক উপায়।
লাও যু অহংকারকে অপছন্দ করতেন। বলতেন, ধন-ক্ষমতা আর অহংকার আমাদের ধংসের দিকে নিয়ে যায়। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বুদ্ধ, এরিস্টটল প্রমুখের মতো লাও যু-ও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের একজন বড় প্রবক্তা ছিলেন।
লাও যুর মূল শিক্ষা তার লেখা তাও তে কিং (Tao Te King) নামক সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। এ গ্রন্থ থেকে তার কিছু শিক্ষা এরই মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। লাও যুর নৈতিক শিক্ষার আরও কিছু বক্তব্য এখন বর্ণনা করছি—
সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাওধর্মতত্ত্ববিদ ড. লিভরা কোহন। তিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটির খ্যাতিমান অধ্যাপক। তিনি তার বিখ্যাত Cosmos and Community: The Ethical Diemention of Daoism গ্রন্থে ১৮০টি বিষয়ে নিষেধ করেছেন। লাও যুর ১৮০টি নিষেধাজ্ঞা থেকে আগের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি এড়াতে মাত্র ২০টি নিষেধাজ্ঞা এখানে উল্লেখ করছি—
জরথুস্ট্রবাদের প্রতিষ্ঠাতা হলেন জরথুস্ট্র। এই ধর্ম সততা ও নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই ধর্ম অনুযায়ী তিনটি কাজ অবশ্য করণীয় এবং তিনটি কাজ অবশ্য বর্জনীয়। করণীয় তিনটি কাজ হলো— হুমাতা বা সৎ চিন্তা, হুক্তা বা সৎ বাক্য ও হ্বার্শতা বা সৎ কর্ম। বর্জনীয় কাজ হলো এর বিপরীত— দুশ্মতা বা অসৎ চিন্তা, দুঝুক্তা বা অসৎ বাক্য ও দুশ্বাশতা বা অসৎ কর্ম।
এই ধর্মে সততার ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। জরথুস্ট্র সবসময় বলতেন, ‘যে সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আহুরা মাজদাকে ভালোবাসতে চায় তার উচিত ভালো মানুষকে ভালোবাসা। কারণ সৎ মানুষ আহুরা মাজদারই ভিন্নরূপ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন সৎ চিন্তা, তারপর সৎ বাক্য ও তারপর সৎ কাজ। পথিবীর সবলোকও যদি মিথ্যা বলে তবে একজন সত্যবাদীর বক্তব্য তাদের সবার বক্তব্যের চেয়ে শ্রেয় এবং অধিক গ্রহণযোগ্য। সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য ও সৎ কর্ম বেহেশতে যাওয়ার ছাড়পত্র।’
চারটি অভ্যাস এই ধর্মের মূলমন্ত্র— যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশ্নে উদার হওয়া, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সবার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হওয়া এবং আন্তরিকতা ও সততার মাধ্যমে মিথ্যাকে দূরে রাখা।
জরথুস্ট্র মনে করতেন অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই একজন মানুষ সৎ চিন্তা করে, সত্য কথা বলে এবং সৎ কর্মে যুক্ত হয়। আবার জ্ঞানের অভাবেই মানুষ অসৎ চিন্তা, অসৎ বাক্য ও অসৎ কর্মে আসক্ত হয়। সব সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য ও সৎ কর্মই একজন মানুষকে বেহেশতে নিয়ে যাবে। পক্ষান্তরে এর উলটোটা একজন মানুষকে উলটো পথে অর্থাৎ দোজখে নিয়ে যাবে।
জরথুস্ট্রবাদ অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষকে কতগুলো মহৎ গুণের অধিকারী হতে হবে। প্রথমেই ‘আশা’ (Asha), যার অর্থ পুতচরিত্র। এই আশা হলো জরথুস্ট্রের নৈতিক শিক্ষার সারাৎসার। জরথুষ্ট্রবাদের অনুসারী যেকোনো নারী বা পুরুষকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, সে যেন আশা বা পবিত্রতার পথ অনুসরণ করে আদর্শ মানুষের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়।
এরপর আসে আর্শমনঙঘ (Arsh-manangh) বা সততা। এখানে সততা বল্তে বুঝানো হয়েছে যথাসময়ে ঋণশোধকে। আহুরা মাজদার কঠোর নির্দেশ, যথাসময়ে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ঋণ পরিশোধ করো। জরথুস্ট্রের পরবর্তী নির্দেশ হলো স্রায়োশ (Sraosh), যা বলতে বুঝায় নম্রতা, ভদ্রতা, শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ, অনুগত ইত্যাদি। এই ধর্মের অনুসারীরা প্রতিদিন প্রার্থনা করে যেন তারা এই গুণগুলোর অধিকারী হতে পারে।
এরপর যে গুণের কথা বলা হয়েছে তা হলো মার্ঝাদিকা (Marzhadika), যার অর্থ দয়া ও ক্ষমা। কিন্তু জরথুষ্ট্র দুর্বৃত্তদের ক্ষেত্রে অতি কঠোর। কারণ দুর্বৃত্তদের ক্ষমা করার অর্থ হলো তাদের অনৈতিক ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা এবং তাদের পাপাচারে উৎসাহিত করা। আরশুখধো বাক্শ (Arshukhdho Vaksh) বা সত্যবাদিতাকে এই ধর্ম একটি মহৎ গুণ হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। জরথুস্ট্র তার অনুসারীদের মিথ্যা সাক্ষী না দেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিচারকদেরকে সর্বাবস্থায় ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ন্যায়নীতি ও কঠোরতা অবলম্বন করতে বলেছেন।
জরথুস্ট্রের নির্দেশ— শত্রুর সঙ্গেও ন্যায় বিচার করো। তিনি বলেন, যে ন্যায়বিচার করে না তার স্বভাব আহরিমনের স্বভাব এবং সে দৈত্যের সমতুল্য। জরথুস্ট্রবাদ মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে। অসৎ শক্তির বিরুদ্ধে সৎ শক্তির সংগ্রামে সৎকে পছন্দ করার জন্যই এই স্বাধীনতা।
মানুষের মহৎ গুণের কথা বলতে গিয়ে আমরা ‘আশা’র কথা বলেছি। এই আশা বা Holiness-এর সম্পূর্ণ বিপরীত হলো দ্রুজ (Druj), যার অর্থ অধার্মিকতা ও অনৈতিকতা। অসততা, অর্থলিপ্সা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও জেদী স্বভাব হলো দ্রুজের উদাহরণ।
জরথুস্ট্রের মতে সর্বাবস্থায় এসব পরিত্যায্য। পরনিন্দা, প্রতিশোধ, সংঘাত, গালিগালাজ, মিথ্যা হলফ, ওয়াদা ভঙ্গ, ঘুষ দেওয়া, ঘুষ নেওয়া, প্রতারণা করা ইত্যাদি এ ধর্ম অনুযায়ী জঘন্য অপরাধ। কৃপণতা, অহংকার, লোভ, পরশ্রীকারতরতা, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা এই ধর্মে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র:

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সেনাবাহিনীর ধাওয়ার ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। বাংলাদেশি ফ্যাক্টচেকিং ও ডিজিটাল মিডিয়া গবেষণা সংস্থা ডিসমিসল্যাব এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির যাচাইয়ে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ছবিটি বাস্তব ঘটনার নয়, বরং ডিজিটালভাবে নির্মিত বা সম
১৫ ঘণ্টা আগে
আগের পোশাকে ফেরার অনুমোদন দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার পুলিশ বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জেলাসহ অন্যান্য ইউনিটের পুলিশের জন্য হবে গাঢ় নীল রঙের শার্ট। সকল মেট্রোপলিটন পুলিশের হবে হালকা অলিভ (জলপাই) রঙের এবং সকল পুলিশের প্যান্টের রঙ হবে খাকি।
১৬ ঘণ্টা আগে
তারেক রহমান বলেছেন, ‘জাতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হলো শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ। একটি আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য পাঠ্য বিষয় শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব অনস্বীকার্য।’
১৮ ঘণ্টা আগে
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে—পাবনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলসমূহের ওপর দিয়ে তীব্র ঝড় বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকায় পূর্ব অথবা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝ
১৮ ঘণ্টা আগে