গ্যাস সংকটে বাসাবাড়ি-শিল্প খাতে বিপর্যয়, স্বাভাবিক হওয়ার সময় অজানা

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীর নামা শ্যামপুর এলাকার বাসিন্দারা। রান্নার গ্যাস না থাকায় অনেকেই বিকল্প উপায়ে মাটির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। ছবি: রাজনীতি ডটকম

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে বয়লার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ছয় দিন পরও কাটেনি দেশের গ্যাস সংকট। জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও রান্নাঘরের চুলায় গ্যাস মিলছে না, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সিএনজি পাচ্ছেন না চালকরা। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক শিল্পকারখানা উৎপাদন কমিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। গ্যাস ও কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানাও।

গত ২১ জুলাই বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী উপকূলে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) বয়লার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এই সংকট তৈরি হয়। দুর্ঘটনার পর প্রথম দিকে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করা হলেও ছয় দিন পরও সংকট কাটেনি। বরং সময়ের সঙ্গে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে। সরকার এখন বলছে, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ— সব খাতেই সরবরাহ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এখন এই সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করছে।

জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি

বর্তমানে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের দৈনিক মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে চলতে হচ্ছে পুরো দেশকে।

বর্তমান সরবরাহের মধ্যে দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকি চাহিদা পূরণে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আমদানির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হতো।

কিন্তু মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে বয়লার বিস্ফোরণ ও পরবর্তী কারিগরি বিপর্যয়ের কারণে আমদানি করা গ্যাসের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে এক হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ হতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও নিচে।

সরবরাহ লাইনে গ্যাস না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছেন সিলিন্ডার। তাতে রান্নার জন্য গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ খরচ। ছবি: রাজনীতি ডটকম
সরবরাহ লাইনে গ্যাস না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছেন সিলিন্ডার। তাতে রান্নার জন্য গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ খরচ। ছবি: রাজনীতি ডটকম

এই বিপুল ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে পেট্রোবাংলা দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি পাচ্ছে ১২৮ দশমিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। জালালাবাদ গ্যাসের বরাদ্দ ৩১ দশমিক ৫০ কোটি ঘনফুট। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি পাচ্ছে ২১ দশমিক ৮০ কোটি ঘনফুট। বাখরাবাদ গ্যাস পাচ্ছে ১৯ দশমিক ৭০ কোটি ঘনফুট। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির বরাদ্দ ১১ দশমিক ২০ কোটি ঘনফুট এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি পাচ্ছে মাত্র ৭ দশমিক ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

গ্যাস সরবরাহে এই ব্যাপক ঘাটতির কারণে দেশের কোথাও কোথাও দিনের অধিকাংশ সময়ই গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে যাচ্ছে। ফলে আবাসিক গ্রাহক থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা পর্যন্ত সবাই একই সঙ্গে সংকটে পড়েছে।

‘একটি টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।

রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, তা এই একটিমাত্র টার্মিনাল বিকল হওয়ার পরেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিদিন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস ঘাটতি নিয়ে এমনিতেই আমাদের শিল্প ও গৃহস্থালি ধুঁকছিল, তার ওপর আমদানি কৃত এলএনজির ওপর একক নির্ভরতা পুরো অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।’

‘সমুদ্রে ভাসমান এফএসআরইউ টার্মিনাল দিয়ে কখনোই একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ যেকোনো ঝড়ো আবহাওয়া বা কারিগরি দুর্ঘটনা পুরো সরবরাহ অচল করে দিতে পারে। এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে অন্তত ১৫ দিনের একটা স্ট্র্যাটেজিক বাফার স্টক বা জরুরি মজুত সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, সমুদ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে এবং একই সঙ্গে নিজেদের কূপে অনুসন্ধান ও খননকাজ জোরদার করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের সাময়িক পক্ষাঘাত ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে,’— বলেন অধ্যাপক ইজাজ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি কারিগরি দুর্ঘটনার ফল নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতারও বহির্প্রকাশ। একটি মাত্র ভাসমান টার্মিনালের ওপর দেশের বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ নির্ভর করায় বিকল্প ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে গ্যাসের এই ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক খাত— সবখানেই সরবরাহ কমাতে হচ্ছে। এর প্রভাব এরই মধ্যে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, গণপরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

আমরা ব্যর্থ, আন্তরিকভাবে দুঃখিত: প্রতিমন্ত্রী

প্রথম দিকে সংকটকে দুই-তিন দিনের সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের ঘাটতি বাড়তে থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাতে একযোগে বিপর্যয় নেমে আসে। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে সোমবার (২৭ জুলাই) সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে দেশের মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটের জন্য জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ত্রুটি। তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে সরকার। তাৎক্ষণিকভাবে এই জটিল সমস্যার সমাধান দিতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা, এ জন্য সরকার বারংবার দুঃখ প্রকাশ করছে।’

সংকট নিরসনের সম্ভাব্য সময়সূচি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে প্রাথমিকভাবে বয়লার বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর প্রথমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেরামতের আশা করা হলেও পরে জটিলতা বাড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য (ইউকে) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে আনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ৫০ শতাংশ ও পরবর্তী সপ্তাহ থেকে শতভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব বলে আশাবাদ জানান তিনি।

দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পরিকল্পনামাফিক জ্বালানি নিয়ে কাজ হয়নি। গত দেড় যুগ আগের সরকার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না খুঁজে তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজেছে। এবং তাদের অসৎ উদ্দেশ্যের জন্য সংকট এ পর্যায়ে এসেছে। আমরা এখন বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবছি, বিকল্প প্রযুক্তি নিয়ে ভাবা হচ্ছে। ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস পাওয়ার প্ল্যান্ট ও ইন্ডাস্ট্রিতে সরবরাহ নিয়ে কাজ হচ্ছে। একটি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশ সফর করছে, তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।’

রাজধানীর রান্নাঘরে দুর্ভোগ

সরকারের আশ্বাসের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। রাজধানীর নাজিরাবাজার, নাখালপাড়া, বাসাবো, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, শ্যামপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় চুলা জ্বলছে না।

অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। কেউ কিনছেন বৈদ্যুতিক ইনডাকশন চুলা, কেউ ব্যবহার করছেন এলপিজি সিলিন্ডার, আবার কেউ অস্থায়ী মাটির চুলায় রান্নার ব্যবস্থা করছেন।

মিরপুরের বাসিন্দা সুলতানা রহমান রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘এমনিতে তো গ্যাস সময়মতো পাওয়া যায় না, এখন চুলায় এক ফোঁটাও আঁচ নেই। বাধ্য হয়ে ইনডাকশন চুলা কিনে নিয়ে এসেছি। একদিকে যেমন লাইনের গ্যাসের নির্দিষ্ট বিল টানতে হচ্ছে, তেমনি এখন বিদ্যুতের খরচও দ্বিগুণ হয়ে যাবে।’

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম জানান, ছোট শিশুকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি। বলেন, ‘বাজারের কেনা খাবারে শিশুর দিন চালানো সম্ভব না হওয়ায় নিরুপায় হয়ে বাসা বাড়িতেই বিকল্প সিলিন্ডার বা অস্থায়ী মাটির চুলার পথ খুঁজছি।’

একই এলাকার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি মাসে তিতাস গ্যাসের বিল পরিশোধ করার পরও যদি চড়া দামে বাইরে থেকে বিকল্প গ্যাস কিনে চালাতে হয়, তবে তা সাধারণ পরিবারের খরচে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।’

বিকল্প চুলার বাজারে হঠাৎ চাহিদা

গৃহস্থালিতে গ্যাসের সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর ইলেকট্রনিকস মার্কেটগুলোতে বৈদ্যুতিক ও ইনডাকশন চুলার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। নবাবপুর ও রামপুরার বিভিন্ন দোকানে এক হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার টাকার ছোট বৈদ্যুতিক চুলা এবং পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার ব্র্যান্ডেড ইনডাকশন চুলা কিনতে ভিড় করছেন ক্রেতারা।

ব্যবসায়ীরা জানান, আগে যেখানে দিনে চার থেকে পাঁচটি চুলা বিক্রি হতো, সেখানে এখন প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। কমপ্রেশার সচল রাখতে যেখানে অন্তত ১৫ পিএসআই (পিএসআই) গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে রাজধানীর উত্তরের আব্দুল্লাহপুর থেকে দক্ষিণের দোলাইরপাড়, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মালিবাগ ও কল্যাণপুরের অধিকাংশ স্টেশনে চাপ নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ৪ পিএসআইয়ে।

স্টেশন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যেখানে সাধারণ সময় প্রেশার ২০০ থাকার কথা, সেখানে এখন তা ১৩০-এর নিচে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ করে কমপ্রেশার চালালেও লাভের বদলে লোকসান বাড়ছে, যার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে পাম্প পরিচালনা বন্ধ রেখেছেন।’

এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটিতে দেশ ব্যাপী গ্যাসের সংকট। পরিবহনগুলোতে গ্যাস নেওয়ার জন্য রাজধানীর যাত্রাবাড়ী গ্যাস স্টেশনে সিএনজির দীর্ঘ লাইন। ছবি: রাজনীতি ডটকম
এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটিতে দেশ ব্যাপী গ্যাসের সংকট। পরিবহনগুলোতে গ্যাস নেওয়ার জন্য রাজধানীর যাত্রাবাড়ী গ্যাস স্টেশনে সিএনজির দীর্ঘ লাইন। ছবি: রাজনীতি ডটকম

গ্যাসের চাপ না থাকায় রাত থেকেই বিভিন্ন স্টেশনের সামনে সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির কিলোমিটারের পর কিলোমিটার দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। চার থেকে ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।

মালিবাগের সিএনজি চালক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘ভোর সকালে এসে সারা দিন পাম্পে পড়ে থাকলেও গ্যাসের দেখা মেলেনি। দিনের মূল সময়টাই যদি লাইনে পার হয়ে যায়, তবে জমানো টাকা দিয়ে সংসার ও গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।’

আব্দুল্লাহপুর এলাকার চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমা দেওয়ার পর জ্বালানি খরচ মিটিয়ে তবে পকেটে কিছু থাকে। কিন্তু গ্যাস না পেয়ে আয় একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পকেটের টাকা খরচ করে মালিকের জমা মেটাতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে গাড়ি চালানো থামিয়ে দেওয়া ছাড়া পথ থাকবে না।’

ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে সড়কে

গ্যাস না পেয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে চালকদের মধ্যে। গত বুধবার খিলক্ষেত এলাকায় শত শত সিএনজি অটোরিকশার চালক বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর ট্রাফিক পুলিশের মধ্যস্থতায় বিকেলে সড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেন আন্দোলনকারীরা।

পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে গৃহস্থালি, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এরই মধ্যে বৃহত্তর শিল্প ও উৎপাদন খাতেও গুরুতর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

ধর্মঘট প্রত্যাহার, দাবি পূরণে পাম্প বন্ধের আলটিমেটাম

দেশ জুড়ে চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে নিজেদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় আগামী ৩০ জুলাইয়ের প্রতীকী ধর্মঘট প্রত্যাহার করলেও চার দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে সংগঠনটি।

চলমান গ্যাস সংকট, সিএনজি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি ও সংগঠনের কর্মসূচি তুলে ধরতে সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর বিজয়নগরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।

গ্যাস না থাকায় মাটির চুলায় রান্না। রাজধানীর নামা শ্যামপুর এলাকা থেকে সম্প্রতি তোলা। ছবি: রাজনীতি ডটকম
গ্যাস না থাকায় মাটির চুলায় রান্না। রাজধানীর নামা শ্যামপুর এলাকা থেকে সম্প্রতি তোলা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর সারা দেশে যে ভয়াবহ গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ুক— তা চায় না সংগঠনটি। এ কারণে পূর্বঘোষিত ১৮ ঘণ্টার প্রতীকী ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। আগামী ৩০ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ধর্মঘট পালনের ঘোষণা ছিল সংগঠনের।

তবে প্রতীকী ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলেও দীর্ঘদিনের চার দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের নেতারা জানান, এ সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে সারা দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য একযোগে বন্ধ রাখা হবে। তাদের ভাষায়, প্রতীকী কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে জনস্বার্থে, কিন্তু দাবি থেকে তারা সরে আসেননি।

কমিশন বাড়ানোর দাবি

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন মাত্র ৮ টাকায় স্থির রয়েছে। কিন্তু গত এক যুগে বিদ্যুৎ, গ্যাস, যন্ত্রাংশ, লাইসেন্স ফি, কর্মচারীদের বেতন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) জমির ইজারা ফিসহ পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

এ অবস্থায় বর্তমান কমিশনে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন স্টেশন মালিকরা। তাদের দাবি, কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করতে হবে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম বাড়লে কমিশনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করার ব্যবস্থা, পুরোনো গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত জামানত নেওয়া বন্ধ এবং বিভিন্ন সরকারি ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবিও জানানো হয়।

‘এই দায় কেন সিএনজি মালিকদের বহন করতে হবে’

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব ফারহান নূর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর পুরো দেশের জ্বালানি খাত যখন অভূতপূর্ব সংকটে, তখন সেই দায় কেন সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকদের বহন করতে হবে? গত ১১ বছরে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি উৎপাদনে আমাদের বিদ্যুৎ খরচ হতো ১ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা, যা জুন মাসের মূল্যবৃদ্ধির পর দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা থেকে ৬ টাকা ১৬ পয়সায়! মাত্র ৮ টাকা প্রফিট মার্জিন থেকে যদি ৬ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিলেই চলে যায়, তবে ব্যবসা বাঁচবে কীভাবে?’

বর্তমান গ্যাসচাপের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে ফারহান নূর বলেন, ‘পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, পাম্পগুলোতে ১৫ পিএসআই প্রেশারে গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা পাচ্ছি মাত্র শূন্য থেকে ২ পিএসআই। চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাচ্ছেন না, বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ, কারখানা স্তব্ধ। পাইপলাইনে গ্যাসই না পেলে আমরা কমপ্রেশার চালিয়ে ডেলিভারি দেবো কীভাবে?’

ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে ফারহান নূর আরও বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুই-তিন দিনে এই সংকট মিটছে না, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত দুই সপ্তাহ লাগবে। এমন একটি জাতীয় দুর্যোগের সময়ে ৩০ জুলাই পাম্প বন্ধ রাখলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চূড়ান্ত রূপ নেবে। তাই দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে ও দেশবাসীর কথা বিবেচনা করে আমরা ৩০ জুলাইয়ের প্রতীকী ধর্মঘট প্রত্যাহার করছি। তবে ২৩ আগস্টের অনির্দিষ্টকালের পাম্প বন্ধের নির্ধারিত কর্মসূচি বহাল রয়েছে।’

‘বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি’

সংগঠনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, জ্বালানি বিভাগ গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির ২০১৩ ও ২০১৭ সালের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও আমাদের দাবি-দাওয়ার কোনো সমাধান আজও হয়নি। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপের কারণে ঢাকা শহরকে বিষাক্ত গ্যাস চেম্বার থেকে মুক্ত করতে সিএনজি খাতের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যেখানে ব্যবসায়ীরা ৫ হাজার কোটি টাকা এবং সাধারণ মানুষ হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। অথচ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর অবহেলার শিকার হয়ে ২১ বছরেরও বেশি সময় ধরে টানা লোকসান গুনে আজ সিএনজি ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।’

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আমিরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গত ২০ এপ্রিল ও ৮ জুন আবেদন করলেও ব্যস্ততার অজুহাতে তিনি সময় দেননি। তবে ২১ জুলাই আমাদের আন্দোলনের কর্মসূচির পর তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল তিনজন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমাদের সমস্যাগুলো অবহিত করে।’

সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ কামনা করে সংগঠনের সিনিয়র সদস্য রেজাবদ্দৌলা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মনে করি, পরিবেশবান্ধব এই বড় খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে ও আমদানিনির্ভরতার আত্মঘাতী পথ থেকে দেশকে বের করতে নতুন চিন্তাভাবনার প্রয়োজন। তাই প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি নিজে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেন, তাহলে এই সিএনজি খাত রক্ষা পাবে এবং দেশ জুড়ে বিরাজমান এই নিদারুণ জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব হবে।’

শিল্পে উৎপাদন থমকে, বিদ্যুৎ-সার উৎপাদনে বড় ঘাটতি

জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন খাতে। গ্যাসের চাপ নেমে যাওয়ায় দেশের শত শত শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গ্যাস ও কাঁচামালের সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর অধিকাংশই উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় কৃষি খাতেও দীর্ঘমেয়াদি চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পাইপলাইনে গ্যাসের তীব্র সংকটে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জের দুই শতাধিক টেক্সটাইল, স্টিল, ডাইং ও সিরামিক কারখানায় গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে মাত্র ১২ পিএসআইয়ে। অথচ ভারী শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি সচল রাখতে প্রয়োজন হয় অন্তত ৪০ থেকে ৫০ পিএসআই গ্যাসচাপ।

ফলে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার অনেক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিল্পকারখানাগুলোর নির্ধারিত উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দেশীয় উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানোর সুযোগ নেই, তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার সত্ত্বেও এর দ্রুত কোনো সমাধান নেই।’

রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ৬৩ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, তিতাস এলাকায় দৈনিক প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট। ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান চার গুণ বেশি খরচে ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে সীমিত পরিসরে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

তাদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধাক্কা

গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন পাঁচ হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে তিন হাজার ৮০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা আরও বাড়বে। সে ক্ষেত্রে এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

পাঁচটি সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ

গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার শিল্পে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সারের মোট চাহিদা ছিল ৬৬ লাখ টন। এর বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো উৎপাদন করেছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন।

অর্থাৎ মোট চাহিদার ৮৩ শতাংশেরও বেশি সার আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়েছে। এর আগের অর্থবছরেও ৬৭ লাখ ৪৭ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে দেশে উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ১২ লাখ ৪৪ হাজার টন।

বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানার মধ্যে মাত্র দুটি চালু রয়েছে। গ্যাস ও কাঁচামালের সংকটে বাকি পাঁচটি কারখানা গত ৪ মার্চ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এখনো সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি।

প্রয়োজনের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস পাচ্ছে বিসিআইসি

বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান জানান, সংস্থার গ্যাসভিত্তিক সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে তারা প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পাচ্ছেন।

গ্যাস সংকটের কারণে গত ৪ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)।

গ্যাস না থাকায় মাটির চুলায় রান্নার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মাটির চুলার চাহিদাও বেড়ে গেছে রাজধানীর নামা শ্যামপুর এলাকায়। ছবি: রাজনীতি ডটকম
গ্যাস না থাকায় মাটির চুলায় রান্নার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মাটির চুলার চাহিদাও বেড়ে গেছে রাজধানীর নামা শ্যামপুর এলাকায়। ছবি: রাজনীতি ডটকম

কারখানাটির প্রধান রসায়নবিদ উত্তম চৌধুরী বলেন, ‘পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গত অর্থবছরে কারখানাটি মাত্র চার থেকে পাঁচ মাস চালু ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমরা প্রায় ৬৫ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদন করেছি। আগের বছর এই উৎপাদন ছিল এক লাখ ৫ হাজার টন। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলে উৎপাদন প্রায় দেড় লাখ টনে পৌঁছাতে পারত।’

অন্যদিকে আমদানি করা ফসফরিক অ্যাসিড সংগ্রহ করতে না পারায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি উৎপাদনকারী কারখানাটিও গত ২৮ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে।

ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) রবিউল আলম জানান, ২০০৬ সালে ৬ লাখ ৬০ হাজার টন সক্ষমতা নিয়ে চালু হওয়া কারখানাটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৮৫ হাজার টন ডিএপি উৎপাদন করতে পেরেছে।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম জানিয়েছেন, গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত সরকারের মজুত ছিল মোট ১৬ লাখ ১৯ হাজার টন সার। এর মধ্যে ইউরিয়া ৬ লাখ ২০ হাজার টান, টিএসপি ৩ লাখ ৫২ হাজার টন, ডিএপি ৪ লাখ ৫১ হাজার টন ও এমওপি ২ লাখ ২৫ হাজার টন। এই মজুত দিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত আমন মৌসুমের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

মেরামত চলছে, তবু গুনতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ

মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় মেরামতের পর বিমা-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এবং কারিগরি নিরাপত্তা পরীক্ষাও সম্পন্ন করতে হবে। ফলে পুরো কার্যক্রম শেষ হতে আরও সময় লাগবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টার্মিনালের অক্ষত অংশ আগামী ৫ থেকে ৮ দিনের মধ্যে চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হতে পারে। তবে পুরো টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হতে অন্তত আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগবে।

এদিকে টার্মিনাল সচল না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে প্রতিদিন ২ লাখ ২৮ হাজার মার্কিন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু একটি দুর্ঘটনার ফল নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি নীতির কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। গত সাত বছর ধরে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং নতুন কূপ খননে দীর্ঘসূত্রতার কারণে একটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দেশ। ফলে সেই অবকাঠামোতে সামান্য কারিগরি বিপর্যয়ও জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, পর্যাপ্ত কৌশলগত (স্ট্র্যাটেজিক) গ্যাস মজুত গড়ে তোলা এবং আমদানিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের জাতীয় জ্বালানি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে বাংলাদেশ।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

'শ্রাবণের মেঘগুলো' গানে শিক্ষকের ভিডিও: প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের পর ইউটার্ন

ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ওই একই গান ব্যবহার করে নিজেদের প্রোফাইলে ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন মিজ পালের প্রতি সমর্থনের অংশ হিসেবে।

২ ঘণ্টা আগে

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনে হাইকোর্টের নির্দেশ

আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই কমিটিকে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

৩ ঘণ্টা আগে

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক ইস্যুতে ব্যবস্থা নেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সচিবালয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

৩ ঘণ্টা আগে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে প্রস্তুত ইসি

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও প্রাথমিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

৩ ঘণ্টা আগে