চেয়ারটি হারালেও তিনি কিন্তু হারেননি

এম ডি মাসুদ খান
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ৪৩
খান মো. আমিন উদ্দীন (বি. এ. বি.এড.)। ছবি: রাজনীতি ডটকম

কিছু মানুষের মৃত্যু হয় কবরের মাটিতে। আর কিছু মানুষের মৃত্যু ঘটে তার অনেক আগেই—বেঁচে থাকতে থাকতে, প্রতিদিন একটু একটু করে। তাদের দেহ বেঁচে থাকে। তারা সকালে ঘুম থেকে ওঠে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, কর্মস্থলে যায়, সংসারের খরচ চালায়, সন্তানদের পড়াশোনা করায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, মানুষটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। অথচ তাঁর ভেতরে কোথাও একটি দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। সেই দরজার ওপাশে পড়ে থাকে তার অপমান, তার হারানো মর্যাদা, তার অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং কিছু প্রশ্ন—যার উত্তর তিনি কোনোদিন পাননি।

আমার বাবার গল্পটি তেমনই একটি গল্প। এই গল্প কোনো রূপকথা নয়। কোনো উপন্যাসের কল্পিত চরিত্রও নয়। এটি আমার বাবার জীবন থেকে উঠে আসা এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। বাবা ছিলেন খান মো. আমিন উদ্দীন (বি. এ. বি.এড.)—বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি ঝিনাইদহের, মহেশপুর উপজেলার-গুড়দহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

প্রায় তিন দশক। একজন মানুষের জীবনে ত্রিশ বছর কম সময় নয়। একটি শিশুর জন্ম থেকে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছাতে যতটা সময় লাগে, একজন মানুষের জীবনের একটি বড় অংশ পার হয়ে যায় তত দিনে। এই দীর্ঘ সময়ে বাবা শুধু একটি বিদ্যালয় পরিচালনা করেননি। তিনি একটি প্রজন্মের সঙ্গে বসবাস করেছেন। একটি বিদ্যালয়কে নিজের সংসার ভেবেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের শুধু পরীক্ষায় পাস করানোর চেষ্টা করেননি; মানুষ করার চেষ্টা করেছেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদ্যালয়ের প্রাণ অফিসকক্ষ নয়— শ্রেণিকক্ষ। তাই প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক ব্যস্ততা, নথিপত্র, সভা, কমিটি, হিসাব-নিকাশ—সবকিছুর মধ্যেও তিনি নিয়মিত বাংলা পড়াতেন। বাংলা ছিল তার বিষয়। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বাংলা তার কাছে কেবল একটি বিষয় ছিল না। বাংলা ছিল তার জীবনবোধ।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়াতে পড়াতে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষের সৌন্দর্য চিনতে শেখাতেন। নজরুলের বিদ্রোহে খুঁজে পেতেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। জীবনানন্দের নিঃসঙ্গতায় অনুভব করতেন মানুষের অন্তর্গত একাকিত্ব। শরৎচন্দ্রের চরিত্রগুলোর মধ্যে দেখতেন সমাজের অবহেলিত মানুষের কান্না।

তিনি পড়াতেন সাহিত্য। কিন্তু আসলে শেখাতেন জীবন। তার ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই আজ সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত। কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ ব্যবসায়, কেউ শিক্ষকতায়, কেউ অন্য কোনো পেশায়।

তাদের কেউ কেউ আজও বলেন— "বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে শিখেছি স্যারের কাছে।" একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে? কিন্তু মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলো অনেক সময় বাইরের শত্রুর হাতে আসে না। আসে খুব কাছের মানুষদের হাত ধরে।

বাবার জীবনেও তেমন একটি সময় এসেছিল। তার অনেক ছাত্রের মধ্যে একজন ছিলেন মোমিনুল হক। পরবর্তীকালে তিনি শিক্ষক হিসেবে বাবার বিদ্যালয়ে যোগ দেন। বাবা তাকে কেবল একজন সহকর্মী হিসেবে দেখেননি। দেখেছিলেন নিজের ছাত্র হিসেবে। নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করেছিলেন- জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর বিয়ের ব্যাপারেও অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজের বি.এড. পরীক্ষার বই পর্যন্ত তাঁকে পড়ার জন্য দিয়েছিলেন।

একজন শিক্ষক কখনো ভাবেন না, যে ছেলেটিকে তিনি নিজের হাতে গড়ে তুলছেন-একদিন সেই মানুষটিই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার অংশ হয়ে উঠতে পারে। সময় তার নিজস্ব নিয়মে চলে। মানুষ বদলে যায়- পরিস্থিতি বদলে যায়। আর কখনো কখনো বদলে যায় সম্পর্কের অর্থও। একসময় বিদ্যালয়ে নতুন বেতন স্কেলকে ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হলো। হিসাব-নিকাশ শুরু হলো। কে কোথায় থাকবেন, কে কী পাবেন, কে কোন অবস্থানে থাকবেন—এসব নিয়ে বিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে এক ধরনের অদৃশ্য টানাপোড়েন তৈরি হতে লাগল।

বাবা বুঝতে পারছিলেন, বাতাস বদলে গেছে। যে মানুষটি এতদিন সবাইকে নিয়ে চলেছেন, তিনি হঠাৎ বুঝতে শুরু করলেন— সবাই তার সঙ্গে নেই। আরও নির্মম সত্য হলো, কিছু মানুষ তখন তাকে আর মানুষ হিসেবে দেখছিলেন না। তাঁদের চোখে তিনি ছিলেন একটি পদ; একটি চেয়ার- প্রধান শিক্ষকের চেয়ার। মানুষ যখন কোনো মানুষকে ভুলে গিয়ে শুধু তার চেয়ারটিকে দেখতে শুরু করে, তখন মানবিকতার মৃত্যু সেখানেই শুরু হয়।

একদিন বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছিলেন। বাবা অফিসকক্ষে ছিলেন।

সেই সময় একজন স্যার তার চারপাশে গড়ে ওঠা ক্ষমতার বলয়কে কাজে লাগিয়ে বাবার ওপর প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন।বাবা বিস্মিত হয়েছিলেন।

তিনি শুধু একটি প্রশ্ন করেছিলেন— "আমি কেন পদত্যাগ করব?" প্রশ্নটি ছিল খুব ছোট। কিন্তু তার ভেতরে ছিল একজন মানুষের ত্রিশ বছরের আত্মপরিচয়। ঠিক তখন কয়েকজন শিক্ষক অফিসের দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন। কথাবার্তার বিষয় বদলে যায়। সেদিনের মতো পরিস্থিতি থেমে যায়।

কিন্তু ঝড় থামেনি। পরদিন সন্ধ্যায় কয়েকটি মোটরসাইকেল এসে থামল আমাদের বাড়ির সামনে। সেদিন বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আমি দেখেছিলাম কয়েকজন মানুষকে। তারা এসেছিল একটি সিদ্ধান্ত জানাতে। তিন দিনের মধ্যে পদত্যাগ করতে হবে।

সেই রাতের কথা আমার আজও মনে আছে। আমি তখন ছোট। সবকিছু বুঝে ওঠার মতো বয়স হয়নি। কিন্তু মানুষের মুখের ভাষা না বুঝলেও তার চোখের ভাষা বোঝা যায়। বাবা সেদিন খুব কম কথা বলেছিলেন। তার চোখে আমি এমন এক নীরবতা দেখেছিলাম, যার কোনো শব্দ নেই। একজন সৎ মানুষ যখন অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারেন যে, তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই, তখন তাঁর নীরবতাই সবচেয়ে বড় আর্তনাদ হয়ে ওঠে।

পরদিনও একই ঘটনা ঘটল। শিক্ষকেরা ক্লাসে গেলে বাবা অফিসকক্ষেই ছিলেন। ছিলো চাপ, অপমান আর ভয়ভীতি। ওই স্যার তখন নিজের চারপাশে গড়ে ওঠা ক্ষমতার বলয়কে আরও সক্রিয় করে তুলেছিলেন। সেই বলয়ের প্রভাবেই বাবার ওপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। একজন মানুষের ওপর যখন চারদিক থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন তাঁর সামনে কখনো কখনো দুটি পথ থাকে—লড়াই করা অথবা ভেঙে পড়া।

বাবা শেষ পর্যন্ত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেদিন শুধু একজন প্রধান শিক্ষক তার পদ হারাননি। সেদিন একজন মানুষের ত্রিশ বছরের পরিচয়কে কাগজের কয়েকটি লাইনে মুছে ফেলা হয়েছিল। একটি স্বাক্ষর। আর তার নিচে চাপা পড়ে গেল ত্রিশ বছরের ইতিহাস।

পরদিন তিনি আর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন না।

একই বিদ্যালয়। একই ভবন। একই অফিস। একই সহকর্মী। একই ছাত্র। শুধু বদলে গেল তার চেয়ার।

যে মানুষটি ত্রিশ বছর ধরে সেই অফিসে বসে বিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছেন, শিক্ষকদের পথ দেখিয়েছেন—সেই মানুষটিকেই পরদিন একই বিদ্যালয়ে একটি সাধারণ চেয়ারে বসতে হলো।

মানুষের অপমানের কিছু দৃশ্য থাকে, যেগুলো কোনো ক্যামেরায় ধরা পড়ে না কোনো সংবাদপত্রে ছাপা হয় না। কোনো আদালতের নথিতে লেখা থাকে না। কিন্তু একজন সন্তানের স্মৃতিতে সেগুলো সারাজীবন থেকে যায়।

বাবা চাইলে চাকরি ছেড়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তখন আমরা পড়াশোনা করছি, সংসার আছে, দায়িত্ব আছে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ আছে। তাই তিনি প্রতিদিন স্কুলে যেতেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে নয়-একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু ছাত্রদের কাছে তিনি কখনো সাধারণ ছিলেন না। তাঁর পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল কিন্তু তাঁর পরিচয় নয়।

তিনি আবার বাংলা পড়াতেন; আবার কবিতা পড়াতেন। আবার ছাত্রদের বলতেন— "মানুষ হও।"

কখনো কখনো আমি ভাবি, মানুষ হওয়ার এই কথাটি তিনি ছাত্রদের বলতেন, নাকি নিজেকেই মনে করিয়ে দিতেন—মানুষ যেন মানুষের প্রতি অমানবিক না হয়। এরই মধ্যে একসময় ছাত্ররা প্রতিবাদে নেমেছিল। তারা তাদের প্রিয় স্যারকে তার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল। যে মানুষটি তাদের হাতে বই তুলে দিয়েছেন, সেই মানুষের কাছ থেকে তাঁর মর্যাদা কেড়ে নেওয়া তারা মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সবসময় সহজ নয়। অভিভাবকদের কাছে নানা ধরনের চাপের খবর পৌঁছাতে শুরু করল। ভয় তৈরি হলো। একজন করে মানুষ সরে যেতে লাগল। আন্দোলন থেমে গেল। মানুষগুলো ফিরে গেল নিজেদের জীবনে। আর বাবা? তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন, একাই। সত্যের পথ কখনো কখনো এতটাই নির্জন হয়ে যায় যে সেখানে মানুষের পাশে শেষ পর্যন্ত শুধু তার নিজের বিবেকটুকুই দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা আইনের আশ্রয়ও চেয়েছিলেন। থানায় গিয়েছিলেন-কিন্তু ফিরে এসেছিলেন খালি হাতে। একজন সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার চাওয়া- কখনো কখনো ন্যায়বিচার পাওয়ার চেয়েও কঠিন হয়ে ওঠে।

আর সবচেয়ে কষ্টের ছিল সহকর্মীদের নীরবতা। বাবা এক সহকর্মীকে লিখেছিলেন—"আপনি তো সব দেখেছেন। অন্তত সত্যিটুকু বলুন।" উত্তর এসেছিল—নিজের চাকরির ঝুঁকি নিতে পারবেন না। আমি জানি না তাকে দোষ দেওয়া যায় কি না। হয়তো তাঁরও পরিবার ছিল- হয়তো তাঁরও সন্তান ছিল- হয়তো তিনিও ভয় পেয়েছিলেন।

কিন্তু ইতিহাসের কাছে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন মানুষ যখন অন্যায়ের শিকার হন, তখন আমরা যদি সত্য জেনেও নীরব থাকি, সেই নীরবতারও কি কোনো দায় নেই? সম্ভবত আছে।

হয়তো অন্যায়কারী একদিন ভুলে যায় সে কী করেছে। কিন্তু যে মানুষ অন্যায় দেখেও চুপ থাকে, সে হয়তো সারাজীবন ভুলতে পারে না—সে কী বলেনি। এরপর বিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষক এলেন। বাবার বাংলা ক্লাসও অন্য একজনের হাতে তুলে দেওয়া হলো। সেদিন আমরা ছাত্র। নতুন শিক্ষক ক্লাস নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাবা শ্রেণিকক্ষে এলেন। মুখে মৃদু হাসি। তিনি বললেন—"নতুন শিক্ষক এসেছেন। এখন থেকে বাংলা ক্লাস উনিই নেবেন।" এই কথাটুকুর মধ্যে কতখানি ভাঙন ছিল, তা আমরা তখন বুঝিনি। শিশুরা সবকিছু বোঝে না-কিন্তু শিশুরা অনুভব করতে পারে। আমরাও অনুভব করেছিলাম। আমাদের মনে হয়েছিল, বাবার বুকের ভেতরে সেদিন কোনো একটি দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।

একজন বাংলা শিক্ষককে তার বাংলা ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে তার ছাত্র-ছাত্রীদের হৃদয় থেকে সরানো যায়নি। ২০০৯ সালে বাবা অবসর নিলেন। চাকরি শেষ হলো। কিন্তু তার জীবনের সেই অধ্যায়ের শেষ হয়নি। কারণ পদ থেকে তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন না হয়তো, কিন্তু আদর্শে ছিলেন। শেষ নয়টি বছর তিনি কোনো পদে নয়, মানুষের ভালোবাসায় প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

২০০৭ সালে আমি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর একদিন অধ্যক্ষ আমাকে ডেকে বলেছিলেন—"তোমার বাবার সঙ্গে অন্যায় হয়েছিল। মানুষটি খুব ভালো ছিলেন।" আমি তার দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিলাম— "আজ এই কথা বলে কি তাঁর হারানো সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারবেন?"

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।

সেই দীর্ঘশ্বাসের কোনো উত্তর ছিল না।

কিছু অনুতাপের কোনো প্রতিকার হয় না। কিছু সত্য অনেক দেরিতে প্রকাশ পায়।

এত দেরিতে যে, সত্য যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, তখন যার জন্য এসেছিল, সে আর দরজা খুলতে পারে না।

আমার বাবা আজ আর নেই। কিন্তু তার গল্প আছে। তার ছাত্র-ছাত্রীরা আছে। তাঁর পড়ানো বাংলা কবিতা আছে। তার হাতে গড়ে ওঠা মানুষগুলো আছে। আর আছে একটি চেয়ারের গল্প। একটি চেয়ার, যা একদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু তাকে পরাজিত করা যায়নি। আজ এত বছর পর আমি কারও প্রতি ঘৃণা নিয়ে লিখছি না। যারা আমাকে পড়িয়েছেন, তাদের আমি শিক্ষক হিসেবেই সম্মান করেছি। কারণ আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন—শিক্ষককে সম্মান করতে হয়। তিনি আমাকে আরও একটি শিক্ষা দিয়েছিলেন—মানুষের প্রতি অন্যায় করা যাবে না।

তাই এই লেখা কোনো প্রতিশোধের ভাষা নয়। এটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও নয়। এটি শুধু একটি সময়ের কাছে একটি প্রশ্ন-একটি সমাজের কাছে একটি প্রশ্ন-একটি বিদ্যালয়ের কাছে একটি প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই আমাদের শিক্ষকদের সম্মান করতে জানি? নাকি আমরা তাঁদের সম্মান করি যতক্ষণ তাঁরা কোনো চেয়ারে বসে থাকেন?

চেয়ার চলে গেলে কি মানুষটিও চলে যায়?

পদ চলে গেলে কি তার ত্রিশ বছরের সততা মুছে যায়?

ক্ষমতা চলে গেলে কি তার ছাত্রদের ভালোবাসাও চলে যায়?

যদি তা-ই হয়, তাহলে আমরা শিক্ষককে সম্মান করি না আমরা সম্মান করি তার পদকে।

আমার বাবার মতো হয়তো আরও শত শত শিক্ষক আছেন। যাঁদের কষ্ট কোনো ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়নি। কোনো সংবাদপত্রে ছাপা হয়নি। কোনো আদালতের রায়ে স্থান পায়নি। তাঁদের কান্না শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ডে শুকিয়ে গেছে। তাঁদের অপমান স্টাফরুমের দেয়ালে আটকে আছে। তাঁদের দীর্ঘশ্বাস বিদ্যালয়ের পুরোনো গাছগুলোর পাতায় জমে আছে।

তারা বাড়ি ফিরে সন্তানদের সামনে হাসিমুখে বসেছেন কেউ জানতে পারেনি—সারাদিন যে মানুষটি অন্যদের মানুষ হতে শিখিয়েছেন, সেই মানুষটি নিজে কতবার ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছেন।

কিছু মানুষ পদ হারান। কিছু মানুষ চেয়ার হারান। কিছু মানুষ ক্ষমতা হারান।

কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষক তার ছাত্রদের হৃদয়ে যে আসন তৈরি করেন, সেটি কোনো কমিটি কেড়ে নিতে পারে না। কোনো ষড়যন্ত্র কেড়ে নিতে পারে না। কোনো ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে না।

আমার বাবা আজ আর নেই।

কিন্তু আজও যখন তার কোনো ছাত্র এসে বলে— "স্যার আমাকে মানুষ হতে শিখিয়েছিলেন।" তখন আমার মনে হয়—না, বাবা হারেননি। তিনি কোনোদিন হারেননি- হারিয়েছিল শুধু একটি চেয়ার। হারিয়েছিল একটি পদ।

হারিয়েছিল কিছু মানুষ তাদের বিবেক। কিন্তু জিতে গিয়েছিলেন একজন শিক্ষক।

কারণ একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদে নয়। তার চেয়ারে নয়। তার ক্ষমতায় নয়।

তার পরিচয় বেঁচে থাকে সে কতজন মানুষের জীবনকে আলোকিত করে গেছে, তার মধ্যে।

আমার বাবার চেয়ার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার ছাত্রদের হৃদয়ে যে আসনটি তিনি তৈরি করেছিলেন—সেটি আজও অক্ষত। সেখানেই তিনি আজও বসে আছেন।

একজন শিক্ষক হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে। একজন পিতা হিসেবে।

আর আমাদের কাছে— একটি হারানো চেয়ারের চেয়েও অনেক বড়, একটি নীরব কান্নার চেয়েও অনেক গভীর, একজন মানুষের অমর পরিচয় হয়ে। কিন্তু জীবনের নির্মম পরিহাস বোধহয় এখানেই—এত কিছুর পরও মোমিনুল হক স্যার শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের প্রধান শিক্ষক হতে পারেননি। তিনি প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই পদ তাঁর জীবনে কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা, স্বস্তি কিংবা মানসিক শান্তি এনে দিতে পারেনি। যে চেয়ারকে কেন্দ্র করে এত আকাঙ্ক্ষা, এত হিসাব-নিকাশ, এত সম্পর্কের টানাপোড়েন, এত অশান্তি—শেষ পর্যন্ত সেই চেয়ারটিই যেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার প্রতীক হয়ে রইল।

জানি না, জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি কখনো নিজের ভেতরে ফিরে তাকিয়েছিলেন কি না। কোনো এক নিঃশব্দ রাতে, চারপাশ যখন নীরব, পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে—তখন কি তাঁর মনে কোনো প্রশ্ন জেগেছিল?

'আমি কি ঠিক করেছিলাম?'

জানি না, কখনো কোনো অপরাধবোধ তার হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়েছিল কি না। যে মানুষটির স্নেহ, ছায়া ও আশ্রয়ে তিনি একদিন বড় হয়েছিলেন, সেই মানুষটির হৃদয়ে নিজের কোনো আচরণ কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল—সেই প্রশ্ন কি কখনো তাঁকে তাড়া করেছিল?

জানি না।

হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই জানতেন। অথবা হয়তো কোনো উত্তরই ছিল না।

হয়তো একদিন, অনেক দেরিতে, সেই চেয়ারটির দিকে তাকিয়ে সেই স্যার নিজেই বুঝেছিলেন—চেয়ার পাওয়া যায়, পদ পাওয়া যায়, ক্ষমতাও পাওয়া যায়; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শ্রদ্ধা, ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক, আর একজন আপন মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া ক্ষত—সবকিছুর হিসাবের বিচারক একমাত্র সময়।

যে চেয়ারকে কেন্দ্র করে একজন প্রবীণ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের জীবনের শেষ অধ্যায়টি এতটা বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছিল, সেই চেয়ারও শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বস্থির অর্জন হয়ে ওঠেনি। সময়ের বিচার কখনো কখনো আদালতের রায়ের মতো উচ্চকণ্ঠ হয় না; সে নীরবে তার উত্তর লিখে রাখে —মানুষের বিবেকে, মানুষের স্মৃতিতে, আর ইতিহাসের অদৃশ্য পাতায়। আর সেই উত্তর পড়তে মানুষের অনেক বছর লেগে যায়।

লেখক: বনবিদ ও কলামিস্ট

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

তারেক রহমানকে জেআইসি সেলে নির্যাতনের তথ্য মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর

এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ডিজিএফআইয়ের গোপন বন্দিশালা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) নির্যাতনের তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

৭ ঘণ্টা আগে

রাজনীতি যেন চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বে বাধা না হয়: প্রধানমন্ত্রী

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে জাতীয় সংসদের এলডি হল প্রাঙ্গণে ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

৮ ঘণ্টা আগে

তনু হত্যা: জামিনে মুক্তির পর ফের গ্রেপ্তার হাফিজুর

শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পিবিআই জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আত্মসমর্পণ না করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে কুমিল্লার আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

৮ ঘণ্টা আগে

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সাড়ে ৬ বছরে প্রায় ৩০ হাজার হতাহত

দেশে সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

৯ ঘণ্টা আগে