জাসদ কার্যালয়ে গ্রেপ্তার ২৭ জনের জামিন নাকচ, ‘তদন্ত’ চান আদালত

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ২৭ জনের জামিন নাকচ করেছেন আদালত। শুনানি শেষে বিচারক বলেছেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার শুনানি নিয়ে জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দেন। প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই মাসুম মিয়া এ তথ্য জানিয়েছেন।
আসামিরা হলেন— দিদারুল আলম তুহিন, ইমান আহমেদ ইমন, মোল্লা মো. শাহজাহান সিরাজ, জয় সরকার, মিরাজ আহমেদ, মিরাজ মালিথা, রবিউল ইসলাম, মিলন কুমার মহন্ত, কাউসার হোসেন, শ্রী অঞ্জন শীল, জালাল উদ্দিন মন্ডল, আব্দুল লতিফ, শামীম আহমেদ, আহম্মেদ আহসান হাবিব, সুজন আলী, তসিকুল ইসলাম, সাইফুল্লাহ সায়েক, নয়ন আলী, সাজিদুল ইসলাম তুহিন, তাজুল ইসলাম, নিষ্কর সম্রাট হোসেন তালুকদার, আনোয়ার হোসেন, আলমগীর হোসেন, আল আমিন হাওলাদার, তুষার আলী, রাসিদুল হক ও মীর মুক্তিসুর রহমান।
এ দিন আসামিদের আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত, তাছলিমা জাহান পপিসহ কয়েকজন জামিন চেয়ে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন ও হারুন-অর-রশীদ জামিনের বিরোধিতা করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দেন।
এর আগে পল্টন মডেল থানার এসআই নাজমুল ইসলাম ২৭ জনকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আসামিরা জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
আবেদনে আরও বলা হয়, পল্টন মডেল থানা পুলিশ ও স্থানীয় উপস্থিত লোকজনের সহযোগিতায় শনিবার বিকাল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে তাদের আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনাস্থলে আসার বিষয়ে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। আসামিরা কোনো ‘ধর্তব্য অপরাধে’ জড়িত থাকতে পারেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আসামিদের পক্ষে আইনজীবীরা জামিন চেয়ে আবেদন করলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়ে সোমবার জামিন শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন।
জাসদ কার্যালয়ে যা ঘটেছিল
শনিবার দুপুরের পর ঢাকার গুলিস্তানে জাসদের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালায় পল্টন থানা পুলিশ। কার্যালয়ের ভেতরে থাকা লোকজনকে হাতকড়া পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে করে থানায় নেওয়া হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ২৭ জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ২৭ জনকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং বাকি ২৪৯ জনকে রোববার ছেড়ে দেয় পুলিশ।
অভিযান শুরু হয়েছিল শনিবার দুপুর ৩টার দিকে। অভিযানের পর সন্ধ্যায় পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানিয়েছিলেন, কার্যালয় থেকে প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছিল, জাসদ কার্যালয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়েছেন— এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। উপকমিশনার হারুন অর রশিদ বলেছিলেন, ‘আমাদের কাছে একটি তথ্য ছিল, জাসদ এবং তাদের সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের সদস্যরা একত্রিত হয়ে নাশকতা করার উদ্দেশ্যে অথবা অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে এখানে জড়ো হয়েছিলেন। তো এ সংবাদ পেয়ে আমাদের পুলিশ প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো নিয়েছে। স্থানীয় ছাত্র-জনতা পুলিশকে সহায়তা করেছে।’
পুলিশের কাছে জাসদ কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার তথ্যও ছিল বলে জানিয়েছিলেন উপকমিশনার। সেখানে অন্য কোনো কর্মকাণ্ড হয়েছে কি না এবং কেন তারা একত্রিত হয়েছিলেন, তা যাচাই করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি।
অভিযানের সময় ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেছিলেন, কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং ভেতরে একটি সভা চলার তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে গিয়ে অনেককে নিয়ে যাচ্ছে। এর আগে অভিযান শুরুর সময় পল্টন থানার এসআই নাজমুল হোসেন জানিয়েছিলেন, জাসদ কার্যালয়ের ভেতরে অন্তত ৪০০ লোক ছিলেন।
অন্যদিকে জাসদের পক্ষ থেকে বলা হয়, পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করে এবং লিখিত অনুমতি নিয়েই প্রতিনিধি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। দলটির দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের দাবি, সারাদেশ থেকে আসা প্রায় সাড়ে তিনশ নেতাকে নিয়ে প্রতিনিধি সভা চলার সময় দুপুর আড়াইটার দিকে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সেখানে হামলা চালান।
তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিনিধি সভায় বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। আমরা অফিসে অবরুদ্ধ আছি। পুলিশ আসছে, হয়তো অ্যারেস্ট করবে।’ সাজ্জাদ হোসেনের দাবি অনুযায়ী, পরে পুলিশ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কার্যালয় থেকে বের করে দিয়ে জাসদের নেতাকর্মীদের আটক শুরু করে।
শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জাসদ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় ঢাকা দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নকে সেখানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘গোপন বৈঠক’ করছেন বলে বলতে দেখা যায়।
জাসদের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়, সেখানে দলটির প্রতিনিধি সভা চলছিল এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সেখানে থাকার প্রশ্নই আসে না।
হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক মন্ত্রী ইনু গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জাসদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা প্রায় স্থবির ছিল।

-535698.jpg)


















