বৃষ্টি-ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত, অর্থনীতির ওপরও বাড়ছে নতুন চাপ

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান এলাকায় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়ক। ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৯টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন। বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙ্গামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জন মারা গেছেন।

প্রাণহানি ও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি, ফসল, গবাদিপশু, মাছের খামার, ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এই দুর্যোগ শুধু মানুষের জীবন-জীবিকাই নয়, জাতীয় অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।

বন্যার এই অভিঘাত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্তমান সরকারের সামনে একযোগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র পাঁচ মাস আগে। সাধারণত নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক মাসকে তুলনামূলক স্বস্তির সময় হিসেবে ধরা হয়। এ সময়ে জনগণ সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে, বিরোধী দলও অনেক ক্ষেত্রে সংযম দেখায় এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এতে নতুন সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রম গুছিয়ে নেওয়ার কিছুটা সুযোগ পায়।

তবে বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তৈরি হয়নি। শুরু থেকেই তাদের একের পর এক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সরকারের দাবি, তারা এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব নিয়েছে, যখন উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ধাক্কার মুখে ছিল।

সরকার-সমর্থকদের ভাষ্য, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিবর্তে শিল্প ও বেসরকারি খাত দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন সীমিত করে বা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়, কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

এর মধ্যেই অর্থনীতি সচল করার উদ্যোগ নেয় নতুন সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আবারও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপরও।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আগে থেকেই চাপে থাকা শিল্প ও ব্যবসা খাত নতুন করে সংকটে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দেশের রপ্তানি ও বৈদেশিক শ্রমবাজারেও। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসকে দুর্বল করেছে।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্রও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভোগব্যয় হ্রাস পাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক উদ্যোক্তা চলতি মূলধনের সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন, বিক্রি ও নতুন বিনিয়োগ— সব ক্ষেত্রেই চাপ স্পষ্ট।

রপ্তানি আয়েও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় কমেছে। তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিও হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে আমদানি কিছুটা বাড়লেও শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা কমেছে। এতে উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন সূচক ও বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। বিপরীতে সরকারের ঋণনির্ভরতা বেড়েছে।

পুঁজিবাজারও এখনো প্রত্যাশিত গতি ফিরে পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়তে পারছে না। অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানিও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছে। অর্থনৈতিক চাপের কারণে তাদের আয় ও মুনাফা কমে যাওয়ায় সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও সীমিত হয়ে পড়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। ফলে বেকারত্ব এখন বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।

এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার তাদের প্রথম বাজেট পাস করেছে। বাজেটে দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থপাচার রোধ, অপচয় কমানো এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই দেশজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি সরকারের সব হিসাব-নিকাশ নতুন করে বদলে দিয়েছে।

বন্যায় কৃষিজমি, ফসল, গবাদিপশু, মাছের খামার, ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। নিম্নআয়ের বহু পরিবারের খাদ্য মজুত ও জীবিকার উৎস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তাও নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই দুর্যোগ ইতোমধ্যেই সংকটে থাকা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে।

এ অবস্থায় সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে উপস্থিত—অতীতের অর্থনৈতিক দুর্বলতা, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির অভিঘাত এবং বর্তমান বন্যাজনিত সংকট। এত বড় চ্যালেঞ্জ একা সরকারের পক্ষে মোকাবিলা করা কঠিন।

তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় সংহতি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সরকার, বিরোধী দল, ব্যবসায়ী সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং দেশের সক্ষম নাগরিকদের একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমকে সফল করতে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।

সরকারের দায়িত্ব হবে এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে বিভাজনের পরিবর্তে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে বন্যা-পরবর্তী খাদ্য, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের জন্য এখন থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ বহুবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কঠিন পরীক্ষা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। প্রতিবারই দেশের মানুষ অসাধারণ সহমর্মিতা, ত্যাগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংকট অতিক্রম করেছে। এবারও সেই ঐক্য ও মানবিক শক্তিই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কারণ, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশই দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

৫৯ উপজেলায় বন্যা, ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দেশের ৫৯টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮ জন মারা গেছেন কক্সবাজারে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙ্গামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রামের পর সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির এক দিনের মধ্যে কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ওপর।

বেশি ক্ষয়ক্ষতি চট্টগ্রাম অঞ্চলে, পানি নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ

চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল। টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, ভেঙে গেছে সড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ। কোথাও কোথাও পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় এখনো পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। কিছু পরিবার ঘরে ফিরতে শুরু করলেও নৌকা ছাড়া চলাচলের সুযোগ নেই। কোথাও ত্রাণ পৌঁছালেও বহু দুর্গত মানুষের কাছে এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ কার্যত এখনো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলার বহু গ্রামে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। ডুবে গেছে বিশুদ্ধ পানির উৎস। ফলে নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় রান্নাবান্নাও সম্ভব হচ্ছে না। ভেঙে পড়া কাঁচা ঘর, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল এবং গবাদিপশুর ক্ষতি নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন হাজারো পরিবার।

চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বহু এলাকায় এখনো ঘরের ভেতর পানি। কোথাও কোথাও পানি কিছুটা কমলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কাঁচা ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, নষ্ট হয়েছে খাদ্যশস্য। অধিকাংশ নলকূপ এখনো পানির নিচে থাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

বাঁশখালীর বাসিন্দা মো. ফারুকের ৩০ বছরের পুরনো মাটির ঘরটি মঙ্গলবার রাতেই ধসে পড়ে। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে এখন তিনি স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ নিয়ে ফারুক বলেন, ‘তিলে তিলে গড়া ঘরটা এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। এখন আবার নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’

কক্সবাজারেও পানি কিছু এলাকায় কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো পানি জমে আছে। কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নতুন করে পানি ঢুকছে। ফলে বহু মানুষ এখনো নৌকাই ভরসা করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করছেন।

তিন পার্বত্য জেলায় ঘরে ফিরছে মানুষ

পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করায় তিন পার্বত্য জেলার পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন আসছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। কোথাও ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়ক, কোথাও ধসে পড়েছে সেতু। পানিতে তলিয়ে গেছে আমন ও আউশের বীজতলা, জুমচাষের জমি এবং সবজিক্ষেত। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি বান্দরবানের। শনিবার বিকেল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ কমায় সাঙ্গু নদীর পানি নামতে শুরু করলেও জেলা শহরের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে। একই সঙ্গে বান্দরবান-চট্টগ্রাম এবং বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের বিভিন্ন অংশ এখনো পানিতে তলিয়ে থাকায় স্বাভাবিক যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকলসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল থেকেও ধীরে ধীরে পানি নামছে। এতে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষজন বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। তবে সবাই এখনো ফিরতে পারেননি। বাঘাইছড়ির রূপকারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ধনেশ্বর চাকমা বলেন, কিছু মানুষ বাড়ি ফিরলেও অধিকাংশ পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রেই রয়েছে।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-লংগদু সড়কের হেডকোয়ার্টার এলাকা থেকে পানি নেমে যাওয়ায় সেখানে যান চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষও ধীরে ধীরে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন।

আরও কয়েক জেলায় বন্যার বিস্তার

বন্যার প্রভাব এখন চট্টগ্রাম অঞ্চল ছাড়িয়ে দেশের আরও কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উঁচু এলাকার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলে এখনো দুই থেকে আড়াই ফুট পানি রয়েছে। সোমবার সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সিরাজ মিয়া (৬৫) বলেন, তার ঘরে পানি ঢুকে গেছে। গরু-ছাগল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। কৃষিজমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আর কয়েক দিনের মধ্যে পানি না নামলে ক্ষতি আরও বাড়বে।’

মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতেই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে সাত হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।

সুনামগঞ্জেও টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদ-নদী ও হাওরের পানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত মঙ্গলবার জেলায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে রমা নদীর পানিও বেড়েছে। সামনে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় সেখানে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নেত্রকোনায় গত কয়েক দিনের মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি এবং উজানের ঢলে জেলার সব নদ-নদীর পানি ক্রমাগত বাড়ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে সেখানে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

টানা ভারী বৃষ্টিতে কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকার দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমার আভাস

চলমান ভারী বর্ষণের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে যাবে না।

সোমবার দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হতে শুরু করে। আবহাওয়াবিদদের মতে, মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসতে পারে। তবে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে মৌসুমি বায়ু আবার সক্রিয় হলে বৃষ্টির পরিমাণ আবারও বাড়তে পারে।

যদিও বৃষ্টির তীব্রতা কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তবু সোমবার দেশের ছয় বিভাগের জন্য পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আগামীকাল থেকে খুলনা বিভাগে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে। একই সঙ্গে সিলেট, ঢাকা বিভাগের মাদারীপুর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলা এবং বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগেও ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বৃষ্টির তীব্রতা কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে বৃষ্টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তার ভাষায়, ‘যে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে, তার পরিমাণ কমে যেতে পারে। কিন্তু এক-দুই পশলা বৃষ্টি হতেই থাকবে। একেবারে কমে যাবে না।’

রাজধানীতেও গত কয়েক দিনের মতো বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় ঢাকায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবুল কালাম মল্লিক জানান, মঙ্গলবার রাজধানীতে বৃষ্টির তীব্রতা আরও কিছুটা কমতে পারে। অল্প সময়ের জন্য হলেও রোদের দেখা মিলতে পারে। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ে দু-এক পশলা বৃষ্টি হতে পারে। এই পরিস্থিতি আগামী শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর আবারও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

১৯ জেলায় ঝোড়ো হাওয়া ও অতি ভারী বৃষ্টির শঙ্কা

ঢাকাসহ দেশের ১৯ জেলার ওপর দিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে এসব এলাকায় বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছে।

৬ ঘণ্টা আগে

গৌরনদীতে প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ, উদ্বোধন করবেন ফ্যামিলি কার্ড

নিম ও নারকেল গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ স্থানীয় বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনের নেতারা।

৬ ঘণ্টা আগে

মুজিববর্ষ উদ্‌যাপনে খরচ হাজার কোটি টাকা— সংসদে জানালেন অর্থমন্ত্রী

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মুজিববর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষ্যে জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন কর্মসূচি, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও বেদী নির্মাণ, সরকারি অফিসে ব্রোঞ্জ, তামা ও মার্বেল পাথরের ভাস্কর্য নির্মাণ এবং রাষ্ট্রীয় সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড স্থাপনসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ টাকা।

১৮ ঘণ্টা আগে

হাম ও উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৬৯৬

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত এক দিনে হামজনিত উপসর্গ নিয়ে চারজন এবং হামে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫৮ জনে।

১ দিন আগে