বৃষ্টি-ঢলে ফুঁসছে নদী— জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মাঝেই বাড়ছে পাহাড়ধসে প্রাণহানি

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
টানা ভারী বৃষ্টির কারণে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের আমতলী এলাকায় পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ সড়কের ওপর ধসে পড়ে। ছবি: সংগৃহীত

কয়েক দিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। দেশের পাঁচটি নদীর পানি এখনো ৯টি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উত্তর-পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১২টি জেলায় আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

একই সময়ে পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে প্রাণহানিও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় যোগাযোগ ও জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি), আবহাওয়া অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বিপৎসীমার ওপরে পাঁচ নদীর পানি

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ছয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও শুক্রবার তা কমে পাঁচটিতে নেমেছে। তবে এতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। কারণ পর্যবেক্ষণাধীন ১২৭টি নদী স্টেশনের মধ্যে ৭৮টিতে এখনো পানি বাড়ছে, কমেছে ৪৪টিতে এবং বাকি স্টেশনগুলোতে পানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

বর্তমানে কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি মোট ৯টি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলিতে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে। মৌলভীবাজারে মনু নদীর পানি মনু রেলসেতু ও মৌলভীবাজার স্টেশনে বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। হবিগঞ্জের বল্লায় খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বান্দরবান ও দোহাজারীতে সাঙ্গু নদীর পানি এবং বান্দরবানের লামা ও চিরিঙ্গা স্টেশনে মাতামুহুরী নদীর পানিও এখনো বিপৎসীমার ওপর রয়েছে।

যদিও কয়েকটি নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তবু ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আবারও দ্রুত অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।

উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন শঙ্কা

আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার কুশিয়ারা-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সুরমা নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলোতেও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।

ভারতের মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীগুলোর পানি আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী উপজেলার অসংখ্য গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী উপজেলার অসংখ্য গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার গোমতী, মুহুরী, ফেনী, হালদা ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর প্রভাবে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিচু এলাকাও সাময়িকভাবে পানির নিচে চলে যেতে পারে।

তবে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করায় বান্দরবান ও কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।

উত্তরাঞ্চলেও বাড়ছে সতর্কতা

শুধু পূর্বাঞ্চল নয়, দেশের উত্তরাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

আগামী ৭২ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের সোমেশ্বরী, যাদুকাটা এবং ভোগাই-কংস নদীর পানিও বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এসব নদীর কোথাও কোথাও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলে সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।

সর্বশেষ বিশ্লেষণে এফএফডব্লিউসি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ১০টি নদী স্টেশন বন্যা পর্যায়ে এবং আরও ৯টি স্টেশন সতর্কতা পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রোববারের পর ধীরে ধীরে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, চট্টগ্রামে আগের দিনের তুলনায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড হয়েছিল ৩২৯ মিলিমিটার। অন্যদিকে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে।

রাজধানী ঢাকাতেও টানা তিন দিন ধরে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। তবে ঢাকায় অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এদিকে দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত এবং সব নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল রাখতে বলা হয়েছে।

ঢল-পাহাড়ধসে অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু

বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে প্রাণহানির সংখ্যাও বাড়ছে। গত ছয় দিনে পাহাড়ধস, দেয়াল ধস ও ঢলের পানিতে ডুবে অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীও রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে।

হেফজখানার ওপরে পাহাড়ধসে চাপা পড়া শিশুদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ও উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত
হেফজখানার ওপরে পাহাড়ধসে চাপা পড়া শিশুদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ও উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

দুর্যোগের শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যু হয়। পরে উখিয়ার ৫ নম্বর শিবিরে একটি মহিলা হেফজখানার দেয়াল ও মাটি ধসে এক শিক্ষকসহ সাত শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুই শিশু এবং ঢলের পানিতে পড়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় বৃহস্পতিবার ভোরে পাহাড়ধসে দুটি বসতঘরের ওপর মাটি ও গাছ চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই এক শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন।

বৃহস্পতিবার সকালে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয় এবং তার মা আহত হন। একই দিন দুপুরে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিজনিত দুর্ঘটনা, পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে ডুবে দেশের বিভিন্ন জেলায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ দুর্ভোগ, পানিবন্দি লাখো মানুষ

সাম্প্রতিক অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। কোথাও নদীর পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকেছে, কোথাও পাহাড়ধসে বসতঘর চাপা পড়েছে। ডুবে গেছে শত শত কিলোমিটার সড়ক, ব্যাহত হয়েছে রেল যোগাযোগ। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে এক হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। কোথাও কোথাও মাত্র পাঁচ দিনেই পুরো জুলাই মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ছাড়িয়ে গেছে। টানা কয়েক দিন ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হওয়ায় নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে।

জলাবদ্ধতার কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার সড়কে রিকশা ছাড়া অন্য যানবাহনের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ছবি: সংগৃহীত
জলাবদ্ধতার কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার সড়কে রিকশা ছাড়া অন্য যানবাহনের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ছবি: সংগৃহীত

শুক্রবারও আগ্রাবাদ, হালিশহর, বাকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, মুরাদপুর, অক্সিজেন, বায়েজিদ, কালুরঘাট, কর্ণফুলী ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ছিল। বহু বাসাবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। বৃষ্টি কিছুটা কমলেও পানি ধীরে নামায় দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীসহ অন্তত আটটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সাতকানিয়ায়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়েছেন সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা, আদালত, পৌরসভাসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরেও পানি ঢুকে পড়েছে।

ডলু নদীর রামপুর এলাকায় প্রায় ২০০ ফুট বাঁধ ভেঙে কয়েকটি ইউনিয়নে দ্রুত পানি ছড়িয়ে পড়ে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট–বান্দরবান সড়কের একাধিক স্থানে সড়কের ওপর দিয়ে দুই থেকে তিন ফুট পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

রেল ও সড়ক যোগাযোগে বিপর্যয়

টানা বৃষ্টিতে রেললাইন ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। যোলশহর ও জানালিহাট এলাকায় রেললাইনের ওপর হাঁটুপানি জমে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে জানিয়েছে, গত তিন দিনে অন্তত ১৮টি আন্তনগর ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে।

একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে পানি ওঠায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম মহানগরের সঙ্গে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কক্সবাজারে সাত লাখ মানুষ পানিবন্দি

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাত লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বহু গ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কৃষিজমি, মাছের ঘের ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত

বান্দরবানের লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ি ঢল এবং বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। লামা পৌর এলাকাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আলীকদম-লামা-চকরিয়া সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সরকারি অফিস, থানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারেও পানি ঢুকে পড়েছে।

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার কাচালং নদীর পানি বেড়ে পৌর এলাকার একাধিক মহল্লা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছে।

সড়কে পানি ওঠায় দুই দিন ধরে সাজেকে ৫৬১ জন পর্যটক আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় প্রায় ১৫০ জনকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাকি পর্যটকদেরও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

খাগড়াছড়িতে বন্ধ তিনটি সড়ক

মাইনী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, লংগদু ও সাজেকমুখী একাধিক সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কবাখালি, বাচামেরুং ও ছোটমেরুং বাজার এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি এবং দীঘিনালা-সাজেক সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সিলেটেও বন্যার শঙ্কা

ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বর্ষণে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুত করা হয়েছে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ইসলামপুর, আদমপুর, আলীনগর ও মাধবপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০ থেকে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

খুলনায়ও জলাবদ্ধতার ভোগান্তি

বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলেও। খুলনা মহানগরীর টুটপাড়া, নিরালা, দোলখোলা, নতুন বাজার, বাস্তুহারা কলোনি, মুজগুন্নী, বয়রা, দৌলতপুর, খালিশপুর, লবণচরা ও বাগমারাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। কোথাও কোথাও পানি নামতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার

বন্যা ও পাহাড়ধসকবলিত এলাকায় জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় নৌকা ও স্পিডবোট ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর বিশেষ উদ্ধার দল কাজ করছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চাল, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন, শিশুখাদ্য, বিস্কুট, কেক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে অতিরিক্ত স্পিডবোট ও উদ্ধার সরঞ্জামও মোতায়েন করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও যেন খাদ্যসংকট বা চিকিৎসাসেবার ঘাটতি না হয়, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় একাধিক উদ্যোগ

চট্টগ্রাম অঞ্চলের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এক ফেসবুক পোস্টে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রাখা হচ্ছে।

সরকারের উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে— ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এক হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা, পাঁচ জেলার জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা নগদ সহায়তা ও ৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুখাদ্য ও জরুরি খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন।

এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দুর্গত এলাকায় সক্রিয় থাকার নির্দেশনা, ত্রাণ কার্যক্রমে রাজনৈতিক দল ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত, নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা কমাতে চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেলপথ পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

কেন এত ভয়াবহ হলো পরিস্থিতি

আবহাওয়াবিদ ও বন্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ভারতের ত্রিপুরা ও মিয়ানমারের পাহাড়ি এলাকায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ সময় একই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে। এর ফলেই পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসের ঘটনা বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একাধিক প্রধান নদীর পানি একই সময়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করা বা তার কাছাকাছি অবস্থান করা বর্ষা মৌসুমে উচ্চঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। ফলে আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ধরনই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি আরও কতটা বিস্তৃত হবে।

আরও কয়েক দিন সতর্ক থাকার আহ্বান

বৈশ্বিক আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টি হলে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যাবে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসন সবাইকে প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত না করার আহ্বান জানিয়েছে। পাহাড়ের ঢাল, টিলা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা এবং আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য নিয়মিত অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত এবং সব নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল রাখতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আশা, রোববারের পর বৃষ্টিপাতের তীব্রতা কমতে শুরু করলে ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতিরও উন্নতি হতে পারে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ ও প্রধান চালিকাশক্তি: রাষ্ট্রপতি

আগামীকাল (শনিবার, ১১ জুলাই) বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি আজ (শুক্রবার, ১০ জুলাই) এক বাণীতে এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬’ পালিত হচ্ছে জেনে আমি আনন্দিত।

৪ ঘণ্টা আগে

হাম ও উপসর্গে দেশে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১২৮ জনের শরীরে ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে হামের সুনির্দিষ্ট উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৯০১ জন। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়ে

৪ ঘণ্টা আগে

প্রস্তুতি সম্পন্ন, শিগগিরই খুলছে জুলাই জাদুঘর: সংস্কৃতিমন্ত্রী

সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, জুলাই জাদুঘর পুনরায় দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে।

৬ ঘণ্টা আগে

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল আগেই প্রকাশ: এক কর্মকর্তা বরখাস্ত

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই ৯ জেলার ফলপ্রকাশের ঘটনায় এক কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই কর্মকর্তা হলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী মেইনটেন্যান্স মো. মেহতাব কায়েস।

৬ ঘণ্টা আগে