
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এ রাজ্যের ক্ষমতায় এসেছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিধানসভার ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয়লাভ করে বিজেপি যখন নবান্নে আরোহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এই ভারতীয় প্রদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও এসেছে আলোচনায়। বিজেপির এ জয়ের পেছনে স্থানীয় ফ্যাক্টরগুলো কাজ করলেও এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রচার জুড়ে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ ও ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ভাবনার জন্ম দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই গেরুয়া ঝড়ে কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে? ভারতের সঙ্গে কূটনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে? বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আগ্রাসন থামবে? তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার পথ খুলবে?
রাজনীতিবিদসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের এই ফল নিয়ে এসেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারও অভিমত, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনের নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে হতে পারে বাংলাদেশকে। আবার কেউ মনে করছেন, কেন্দ্রের মতো রাজ্যেও একই দল ক্ষমতায় থাকায় ঢাকা-দিল্লির মধ্যে নতুন কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হতে পারে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের তরফ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, ভারতের এ রাজ্য সরকারের নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্কের জন্য খুব বেশি প্রভাবক হয়ে উঠবে না। কারণ কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিধি নির্ধারিত হয় শেষ পর্যন্ত শেষ কেন্দ্র সরকারের সঙ্গেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায়। কারণ এ নির্বাচনের প্রচার পর্বে বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুভেন্দু অধিকারী রীতিমতো দাবি করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলে প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ অবৈধ অভিবাসী ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর তাদের নির্মূল করা হবে।
শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্টতই ইঙ্গিত করেছেন, মমতার আমলে ভোটার তালিকায় জায়গা পাওয়া এসব ‘অবৈধ অভিবাসী’ বাংলাদেশ থেকেই প্রবেশ করেছে পশ্চিমবঙ্গে। ভোটের প্রচারে তার ও তার দলের অন্যদের বক্তব্যে ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘পুশইন’ বয়ান বড় জায়গা নিয়ে রেখেছিল, বিজেপির ভূমিধস জয়ের পর যা সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় উগ্র জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদসহ মুসলিমবিরোধী নানা বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের কেন্দ্র সরকার যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়েছে। এখন রাজ্যেও বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সে কূটনৈতিক অবস্থান অব্যাহত থাকলে দুই দেশের জন্যই ভালো হবে। ভারতকেও বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা-আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়েই সম্পর্ক গড়তে হবে।’
বিজেপির উত্থানকে বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ মনে করেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের একটি টানাপোড়েন তৈরি হবে। এর কারণ— এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মতো একটি চরম হিন্দুত্ববাদী দল রাজ্য সরকার গঠন করছে। তাদের এই জয় এসেছে মূলত একটি প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের মধ্য দিয়ে। তাদের নির্বাচনের প্রধান প্রচারণাই ছিল একদিকে মুসলমান বিদ্বেষ, অন্যদিকে চরম বাংলাদেশ বিদ্বেষ। এই দুটি উপাদান একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এখন ঘৃণা, বিদ্বেষ ও চূড়ান্ত অসহিষ্ণুতা তৈরির একটি আশঙ্কা রয়েছে।’
সাইফুল হকের বিশ্লেষণ, পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আলোচিত শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির ফ্রন্টলাইন নেতাদের বিদ্বেষী মনোভাব সীমান্তে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এসআইআর তথা নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে বিশেষ নিবিড় যাচাইয়ের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের অনেককেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে বিতাড়নের আশঙ্কা রয়েছে।
সাইফুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের তিন দিকেই এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজ্য সরকার থাকায় আমাদের জন্য একটি চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এখন পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে দিল্লির কেন্দ্র সরকারের ওপর। তারা যথেষ্ট প্রজ্ঞা না দেখাতে পারলে দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ ও স্বাভাবিক চলাফেরা পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়তে পারে।’
তবে শুভেন্দু অধিকারীর বিরোধী দলীয় নেতা থাকাকালে যে আগ্রাসী মনোভাব দৃশ্যমান ছিল, ক্ষমতায় এলে সেই মনোভাবও বদলে যেতে পারে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ। নিজ রাজ্যের স্বার্থেই তাকে এমনটি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
মুন্সী ফয়েজ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আছেন। একজন নেতা বিরোধী দলে থাকলে একরকম কথা বলেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। যখন তিনি ক্ষমতায় বসবেন এবং কেন্দ্র সরকারের প্রতি তার দায়বদ্ধতা তৈরি হবে, তখন তিনি নিজেই একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করবেন। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির একটি বড় অংশ বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থা সচল রাখা পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন।’
অধ্যাপক আমেনা মহসিনও মনে করেন, দিল্লির সঙ্গেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল কেন্দ্র থাকা উচিত। তবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান নিয়েও তিনি শঙ্কিত।
রাজনীতি ডটকমকে অধ্যাপক আমেনা বলেন, “নির্বাচনের সময় উগ্র জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ববাদী ইস্যুগুলোকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে পুশব্যাক করার যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নেতাদের মুসলিমবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্যও বর্তমান যুগে বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।”
শুভেন্দুর ‘বাংলাদেশবিরোধী’ আগ্রাসী বক্তব্যকে অবশ্য বাংলাদেশ সরকার সাময়িক নির্বাচনি কৌশল হিসেবে দেখছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশ ‘ফ্যাক্টর’ হয়েছে, বাংলাদেশকে নিয়ে নানা বক্তব্য এসেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এগুলো এক ধরনের পলিটিক্যাল রেটোরিক (রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর)। সরকার গঠনের পর আমাদের সঙ্গে সুন্দর সহযোগিতার সম্পর্কই থাকবে।”
শুভেন্দু অধিকারীর আগ্রাসী মনোভাব ও বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান নিয়ে আশঙ্কার বিপরীতে দ্বিপাক্ষিক অমীমাংসিত ইস্যু, বিশেষ করে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সমাধানের একটি সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন প্রবীণ কূটনীতিকরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দীর্ঘকাল ধরেই ভারত সরকার দাবি করে আসছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সম্ভব হচ্ছে না। এখন যেহেতু কেন্দ্র ও রাজ্য— দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়, তাই এ ‘অজুহাত’ দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।
মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘বিজেপি আগে দাবি করত, মমতার বাধার কারণে তিস্তা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এখন সেই বাধা না থাকায় সমাধানের পথ সহজতর হওয়ার কথা। তবে সরকার পরিবর্তন হলেই রাতারাতি সব মিটমাট হয়ে যাবে না। এর জন্য দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আগে একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে হবে।’
‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি বিনিময় বা সফরের মাধ্যমে আগে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করতে হবে, যার ওপর ভিত্তি করে তিস্তা ও ফারাক্কা চুক্তির মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হবে,’— বলেন এই সাবেক কূটনীতিক।
তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে অবশ্য এখনো সন্দিহান সাইফুল হক। তিনি মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মূলত রাজনৈতিক ‘অজুহাত’ হিসেবেই ব্যবহার করে আসছে ভারত সরকার।
রাজনীতি ডটকমকে সাইফুল হক বলেন, “ঘটনা হলো— ভারত রাষ্ট্র নিজেই চুক্তিটি করতে চায়নি। নরেন্দ্র মোদি সরকার আসলে এ ব্যাপারে কোনো বলিষ্ঠ বা সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এখন হয়তো বিজেপির হাতে আর সেই ‘মমতা কার্ড’ থাকছে না, কিন্তু সমাধানটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে দিল্লির নতুন নীতি-কৌশলের ওপর।” তার মতে, বাংলাদেশ অতীতে নমনীয় পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করায় জাতীয় স্বার্থ বিপন্ন হয়েছে।
তিস্তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিনও বলছেন প্রায় একই ধরনের কথা। তিনি বলেন, “তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে এতদিন যে ‘রাজ্য সরকারের কারণে সমাধান করা যাচ্ছে না’ বলে বাহানা দেওয়া হতো, এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে একই সরকার থাকায় সেটি দেওয়ার সুযোগ নেই। তারা সত্যিই এর কোনো সমাধান দিতে চায় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।”
তবে তিস্তাসহ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ইস্যুকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের চুক্তি আসলে দুই রাষ্ট্রের মধ্যেকার চুক্তি। আমাদের তিস্তা চুক্তি নিয়ে একসময় পশ্চিমবঙ্গকে আলাপে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পুরো রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে সম্পর্ক, আমাদের পারস্পরিক বেনিফিটের যে সম্পর্ক, সেটা কোনোক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হবে না।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রা পায়। কেন্দ্রে বিজেপির উত্থানে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠন করলে সে সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়। তবে সে সম্পর্কে বাংলাদেশের স্বার্থ নানা দিক থেকেই ‘উপেক্ষিত’ থেকে গিয়ে বরং ভারতের স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে বলে দৃশ্যমান হয়েছে নানা ক্ষেত্রেই।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ওই সময় বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ভারত জুড়ে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ছড়িয়েছে। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানকে শেখ হাসিনা সরকার পতনের জন্য জঙ্গি তৎপরতা হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের পর এখন বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষদিক থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত দুই দেশের কূটনীতিক সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক’ গতিতেই চলছে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই ভারতকে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “শুভেন্দু অধিকারী বা তার অনুসারীরা যেভাবে অতীতে পূর্ববর্তী সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং যেভাবে আমাদের সাম্প্রতিক গণজাগরণ ও অর্জনকে ‘জঙ্গি তৎপরতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন, তা অত্যন্ত সংকটজনক। তারা যদি আমাদের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে একই অবস্থানে অটল থাকেন, তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংকট আরও ঘনীভূত হবে।’
ভারতকে ‘নতুন বাংলাদেশে’র প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখতে হবে জানিয়ে অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জনগণ আসলে কী চাইছে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন ভারতের। তবেই দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে।’
মুন্সী ফয়েজ আহমেদ অবশ্য বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে অর্থনৈতিক স্বার্থেই। আর সে কারণেই ‘তারা সম্পর্কে উন্নতি ঘটাতে বাধ্য হবে’ বলে অভিমত সাবেক এই কূটনীতিকের।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গের এ নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ভারতকে দৃঢ় অবস্থানের কথাও জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সোমবার ও মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন একই কথা। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই আসুক না কেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এ পরিবর্তন আসবে না। বিধানসভা নির্বাচনকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় অভিহিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে।
যে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে এত শোরগোল, সেই ইস্যুতে আবার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে পুশইনের ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ কঠোর পালটা ব্যবস্থা নেবে। সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এ রাজ্যের ক্ষমতায় এসেছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিধানসভার ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয়লাভ করে বিজেপি যখন নবান্নে আরোহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এই ভারতীয় প্রদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও এসেছে আলোচনায়। বিজেপির এ জয়ের পেছনে স্থানীয় ফ্যাক্টরগুলো কাজ করলেও এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রচার জুড়ে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ ও ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ভাবনার জন্ম দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই গেরুয়া ঝড়ে কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে? ভারতের সঙ্গে কূটনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে? বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আগ্রাসন থামবে? তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার পথ খুলবে?
রাজনীতিবিদসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের এই ফল নিয়ে এসেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারও অভিমত, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনের নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে হতে পারে বাংলাদেশকে। আবার কেউ মনে করছেন, কেন্দ্রের মতো রাজ্যেও একই দল ক্ষমতায় থাকায় ঢাকা-দিল্লির মধ্যে নতুন কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হতে পারে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের তরফ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, ভারতের এ রাজ্য সরকারের নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্কের জন্য খুব বেশি প্রভাবক হয়ে উঠবে না। কারণ কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিধি নির্ধারিত হয় শেষ পর্যন্ত শেষ কেন্দ্র সরকারের সঙ্গেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায়। কারণ এ নির্বাচনের প্রচার পর্বে বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুভেন্দু অধিকারী রীতিমতো দাবি করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলে প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ অবৈধ অভিবাসী ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর তাদের নির্মূল করা হবে।
শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্টতই ইঙ্গিত করেছেন, মমতার আমলে ভোটার তালিকায় জায়গা পাওয়া এসব ‘অবৈধ অভিবাসী’ বাংলাদেশ থেকেই প্রবেশ করেছে পশ্চিমবঙ্গে। ভোটের প্রচারে তার ও তার দলের অন্যদের বক্তব্যে ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘পুশইন’ বয়ান বড় জায়গা নিয়ে রেখেছিল, বিজেপির ভূমিধস জয়ের পর যা সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় উগ্র জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদসহ মুসলিমবিরোধী নানা বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের কেন্দ্র সরকার যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়েছে। এখন রাজ্যেও বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সে কূটনৈতিক অবস্থান অব্যাহত থাকলে দুই দেশের জন্যই ভালো হবে। ভারতকেও বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা-আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়েই সম্পর্ক গড়তে হবে।’
বিজেপির উত্থানকে বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ মনে করেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের একটি টানাপোড়েন তৈরি হবে। এর কারণ— এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মতো একটি চরম হিন্দুত্ববাদী দল রাজ্য সরকার গঠন করছে। তাদের এই জয় এসেছে মূলত একটি প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের মধ্য দিয়ে। তাদের নির্বাচনের প্রধান প্রচারণাই ছিল একদিকে মুসলমান বিদ্বেষ, অন্যদিকে চরম বাংলাদেশ বিদ্বেষ। এই দুটি উপাদান একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এখন ঘৃণা, বিদ্বেষ ও চূড়ান্ত অসহিষ্ণুতা তৈরির একটি আশঙ্কা রয়েছে।’
সাইফুল হকের বিশ্লেষণ, পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আলোচিত শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির ফ্রন্টলাইন নেতাদের বিদ্বেষী মনোভাব সীমান্তে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এসআইআর তথা নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে বিশেষ নিবিড় যাচাইয়ের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের অনেককেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে বিতাড়নের আশঙ্কা রয়েছে।
সাইফুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের তিন দিকেই এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজ্য সরকার থাকায় আমাদের জন্য একটি চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এখন পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে দিল্লির কেন্দ্র সরকারের ওপর। তারা যথেষ্ট প্রজ্ঞা না দেখাতে পারলে দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ ও স্বাভাবিক চলাফেরা পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়তে পারে।’
তবে শুভেন্দু অধিকারীর বিরোধী দলীয় নেতা থাকাকালে যে আগ্রাসী মনোভাব দৃশ্যমান ছিল, ক্ষমতায় এলে সেই মনোভাবও বদলে যেতে পারে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ। নিজ রাজ্যের স্বার্থেই তাকে এমনটি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
মুন্সী ফয়েজ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আছেন। একজন নেতা বিরোধী দলে থাকলে একরকম কথা বলেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। যখন তিনি ক্ষমতায় বসবেন এবং কেন্দ্র সরকারের প্রতি তার দায়বদ্ধতা তৈরি হবে, তখন তিনি নিজেই একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করবেন। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির একটি বড় অংশ বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থা সচল রাখা পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন।’
অধ্যাপক আমেনা মহসিনও মনে করেন, দিল্লির সঙ্গেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল কেন্দ্র থাকা উচিত। তবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান নিয়েও তিনি শঙ্কিত।
রাজনীতি ডটকমকে অধ্যাপক আমেনা বলেন, “নির্বাচনের সময় উগ্র জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ববাদী ইস্যুগুলোকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে পুশব্যাক করার যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নেতাদের মুসলিমবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্যও বর্তমান যুগে বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।”
শুভেন্দুর ‘বাংলাদেশবিরোধী’ আগ্রাসী বক্তব্যকে অবশ্য বাংলাদেশ সরকার সাময়িক নির্বাচনি কৌশল হিসেবে দেখছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশ ‘ফ্যাক্টর’ হয়েছে, বাংলাদেশকে নিয়ে নানা বক্তব্য এসেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এগুলো এক ধরনের পলিটিক্যাল রেটোরিক (রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর)। সরকার গঠনের পর আমাদের সঙ্গে সুন্দর সহযোগিতার সম্পর্কই থাকবে।”
শুভেন্দু অধিকারীর আগ্রাসী মনোভাব ও বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান নিয়ে আশঙ্কার বিপরীতে দ্বিপাক্ষিক অমীমাংসিত ইস্যু, বিশেষ করে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সমাধানের একটি সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন প্রবীণ কূটনীতিকরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দীর্ঘকাল ধরেই ভারত সরকার দাবি করে আসছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সম্ভব হচ্ছে না। এখন যেহেতু কেন্দ্র ও রাজ্য— দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়, তাই এ ‘অজুহাত’ দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।
মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘বিজেপি আগে দাবি করত, মমতার বাধার কারণে তিস্তা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এখন সেই বাধা না থাকায় সমাধানের পথ সহজতর হওয়ার কথা। তবে সরকার পরিবর্তন হলেই রাতারাতি সব মিটমাট হয়ে যাবে না। এর জন্য দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আগে একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে হবে।’
‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি বিনিময় বা সফরের মাধ্যমে আগে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করতে হবে, যার ওপর ভিত্তি করে তিস্তা ও ফারাক্কা চুক্তির মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হবে,’— বলেন এই সাবেক কূটনীতিক।
তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে অবশ্য এখনো সন্দিহান সাইফুল হক। তিনি মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মূলত রাজনৈতিক ‘অজুহাত’ হিসেবেই ব্যবহার করে আসছে ভারত সরকার।
রাজনীতি ডটকমকে সাইফুল হক বলেন, “ঘটনা হলো— ভারত রাষ্ট্র নিজেই চুক্তিটি করতে চায়নি। নরেন্দ্র মোদি সরকার আসলে এ ব্যাপারে কোনো বলিষ্ঠ বা সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এখন হয়তো বিজেপির হাতে আর সেই ‘মমতা কার্ড’ থাকছে না, কিন্তু সমাধানটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে দিল্লির নতুন নীতি-কৌশলের ওপর।” তার মতে, বাংলাদেশ অতীতে নমনীয় পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করায় জাতীয় স্বার্থ বিপন্ন হয়েছে।
তিস্তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিনও বলছেন প্রায় একই ধরনের কথা। তিনি বলেন, “তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে এতদিন যে ‘রাজ্য সরকারের কারণে সমাধান করা যাচ্ছে না’ বলে বাহানা দেওয়া হতো, এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে একই সরকার থাকায় সেটি দেওয়ার সুযোগ নেই। তারা সত্যিই এর কোনো সমাধান দিতে চায় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।”
তবে তিস্তাসহ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ইস্যুকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের চুক্তি আসলে দুই রাষ্ট্রের মধ্যেকার চুক্তি। আমাদের তিস্তা চুক্তি নিয়ে একসময় পশ্চিমবঙ্গকে আলাপে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পুরো রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে সম্পর্ক, আমাদের পারস্পরিক বেনিফিটের যে সম্পর্ক, সেটা কোনোক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হবে না।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রা পায়। কেন্দ্রে বিজেপির উত্থানে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠন করলে সে সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়। তবে সে সম্পর্কে বাংলাদেশের স্বার্থ নানা দিক থেকেই ‘উপেক্ষিত’ থেকে গিয়ে বরং ভারতের স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে বলে দৃশ্যমান হয়েছে নানা ক্ষেত্রেই।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ওই সময় বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ভারত জুড়ে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ছড়িয়েছে। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানকে শেখ হাসিনা সরকার পতনের জন্য জঙ্গি তৎপরতা হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের পর এখন বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষদিক থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত দুই দেশের কূটনীতিক সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক’ গতিতেই চলছে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই ভারতকে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “শুভেন্দু অধিকারী বা তার অনুসারীরা যেভাবে অতীতে পূর্ববর্তী সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং যেভাবে আমাদের সাম্প্রতিক গণজাগরণ ও অর্জনকে ‘জঙ্গি তৎপরতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন, তা অত্যন্ত সংকটজনক। তারা যদি আমাদের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে একই অবস্থানে অটল থাকেন, তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংকট আরও ঘনীভূত হবে।’
ভারতকে ‘নতুন বাংলাদেশে’র প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখতে হবে জানিয়ে অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জনগণ আসলে কী চাইছে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন ভারতের। তবেই দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে।’
মুন্সী ফয়েজ আহমেদ অবশ্য বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে অর্থনৈতিক স্বার্থেই। আর সে কারণেই ‘তারা সম্পর্কে উন্নতি ঘটাতে বাধ্য হবে’ বলে অভিমত সাবেক এই কূটনীতিকের।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গের এ নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ভারতকে দৃঢ় অবস্থানের কথাও জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সোমবার ও মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন একই কথা। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই আসুক না কেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এ পরিবর্তন আসবে না। বিধানসভা নির্বাচনকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় অভিহিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে।
যে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে এত শোরগোল, সেই ইস্যুতে আবার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে পুশইনের ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ কঠোর পালটা ব্যবস্থা নেবে। সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে— রংপুর, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে এসব এলাকায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলা এবং সম্প্রতি ঘোষিত ছাত্রদলের হল কমিটি নিয়ে প্রতিবাদের জেরেই তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, কোনও ধরনের সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই ওই তিন ছাত্রীকে হলের সিট থেকে বহিষ্কার করেছে প্রশাসন।
২ ঘণ্টা আগে
প্রতিবেদনে বলা হয়, হয়রানির শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৭ জন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও ১০ জনকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনজনকে আটক করার পাশাপাশি চারটি পৃথক মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
চার দিনের রিমান্ড শেষে আজ মঙ্গলবার তাদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আবারো তাদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনজুরুল ইসলাম তাদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
১৭ ঘণ্টা আগে