শিশু সুরক্ষা লঙ্ঘনের দায়ে এবার মেটাকে ৫৭ কোটি ডলার জরিমানা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্ক জাকারবার্গের মেটাকে ৫৬ কোটি ডলার জরিমানা করেছেন নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত। ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকের মাদার কোম্পানি সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটাকে ‘জনদুর্ভোগের বিষয়’ অভিহিত করে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন নিউ মেক্সিকোর একজন মার্কিন বিচারক। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, নিউ মেক্সিকোতে ২০২৩ সালে কয়েকজন আইনজীবীর করা একটি মামলায় বিচারক ব্রায়ান বিয়েডশেইড এ জরিমানা ঘোষণা করেন। ফেসবুকসহ মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের বিপদে ফেলেছে, তাদের যৌন উত্তেজক উপাদান ও যৌন শিকারীদের সংস্পর্শে এনেছে— এমন অভিযোগ এনে মেটাকে দায়বদ্ধ করার দাবি করা হয়েছিল মামলায়।

একই মামলায় এর আগেও মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যার অতিরিক্ত হিসেবে নতুন জরিমানা যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এ মামলায় মেটাকে জরিমানার পরিমাণ ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।

মামলার রায় ঘোষণার সময় বিচারক বিয়েডশেইড মেটাকে তুলনা করেছেন একটি কারখানার সঙ্গে, যার বিজ্ঞাপন ও নটেন্টেন্ট হলো পণ্য এবং শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ হলো সেই দূষণ যা দূর করতেই হবে। জরিমানার অর্থ ভবিষ্যৎ ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি একটি তহবিলে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেন বিচারক।

ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডসের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মেটা। প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র রায়ের পর বলেন, আমরা এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি এবং আমরা আপিল করব।

ওই আইনজীবী বলেন, আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের নিরাপদ রাখতে কঠোর পরিশ্রম করি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ছিলাম। অনলাইনে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় আমাদের কাজের ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী।

শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মেটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। তবে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের সমস্যা নিয়ে হাজার হাজার মামলার মুখোমুখি হচ্ছে মেটা। নিউ মেক্সিকোর রায় ছাড়াও এ বছরের শুরুর দিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে একই ধরনের একটি মামলায় হেরেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

নিউ মেক্সিকোর মামলায় বিচারের প্রথম ধাপে দেখা গিয়েছিল, মেটা বারবার নিউ মেক্সিকোর অন্যায্য অনুশীলন আইন বা আনফেয়ার প্রাকটিসেস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। সেখানে দেখানো হয়, মেটার সুপারিশমূলক অ্যালগরিদমগুলো মূলত কম বয়সী ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর কনটেন্ট ও যোগাযোগের দিকে ধাবিত করছে। সুপারিশমূলক অ্যালগরিদম হলো এমন সব টুল যা মেটা ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে দেখা কন্টেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজাতে ব্যবহার করে।

মামলার দ্বিতীয় ধাপের রায় দিতে গিয়ে বিচারক বিয়েডশেইড দেখেছেন, মেটার ক্ষতি ‘জনদুর্ভোগ’ বা একটি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সমস্যায় পৌঁছেছে, যা এতটাই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে এটি সাধারণ জনগণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে মেটার ওপর যেসব জরিমানা করা হয়েছে, এটিই তার মধ্যে বৃহত্তম এবং প্রথম ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে, যেখানে কোনো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী হিসেবে ঘোষণা করা হলো।

বিচারক লিখেছেন, একটি কারখানা থেকে উৎপাদিত বিষাক্ত দূষণ যেমন সাধারণ জনস্বার্থের ক্ষতি করতে পারে, তেমনি শিশুদের ওপর মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল এর প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এটি সামগ্রিক ইন্টারনেট ও সবচেয়ে উদ্বেগজনকভাবে বাস্তব জগতেও ছড়িয়ে পড়ে। এটি ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, তাদের পরিবার ও বিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি হাসপাতাল এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর একটি সাধারণ সামাজিক বোঝা ও ক্ষত তৈরি করে।

বিচারক বিয়েডশেইড বলেছেন, মেটাকে যে তহবিল তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা ক্ষতির ভবিষ্যৎ প্রভাব কমানোর জন্য অর্থায়নে ব্যবহার করা হবে। আদেশের তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের একটি বিশাল অংশ অর্থাৎ মোট ৪২ কোটি ডলার ব্যয় হবে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে এরই মধ্যে ঘটে যাওয়া ক্ষতির চিকিৎসায়। এর আওতায় ‘উপযুক্ত ক্লিনিক্যাল বা অন্যান্য আচরণগত স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও পেশাজীবী’দের অর্থায়ন করা হবে।

অর্থের আরেকটি অংশ সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণের পেছনে ব্যয় হবে, যার মধ্যে শিক্ষক ও স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা শিশুদের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতি কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাবেন।

এর বাইরেও মেটাকে আরও কিছু ব্যবস্থা কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের কোনো অ্যাকাউন্ট কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে সুপারিশ করা যাবে না— তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীকে মেসেজ পাঠাতে পারবে না, অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের নগ্নতা পাঠানো বা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ করা এবং যৌন শোষণে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য ওয়ান-স্ট্রাইক নীতি কার্যকর করতেও বলেছেন বিচারক।

এ ছাড়া প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ‘লাইক’ কাউন্ট বা সংখ্যা তুলে নেওয়া, স্কুলের ছুটির দিন বাদে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এ ধরনের ব্যবহারকারীদের জন্য পুশ নোটিফিকেশন নিষিদ্ধ করা, মাসে সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা বা প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহার করছেন— এমন ব্যবহারকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘ব্যবহার সীমা’ নির্ধারণ করার মতো উদ্যোগগুলোও বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় বিচার শুরু হতে চলেছে। শিশু গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের প্রায় তিন ডজন আইনজীবী কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করছেন।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

হামের উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ১০৩৬

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ রোগীদের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ছয় মাসে প্রাণ গেছে ১ হাজার ৩৬ জনের। দেশের ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে ঘ

২ ঘণ্টা আগে

এয়ারবাস কেনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের আশ্বাস বিমানমন্ত্রীর

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণে এয়ারবাস কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, যেকোনো ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে

৩ ঘণ্টা আগে

সম্পদের হিসাব না দেওয়ায় এস কে সুরের স্ত্রীর ২ বছরের কারাদণ্ড

মামলার নথি ও দুদক সূত্রে জানা গেছে, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সুপর্ণা সুর, তার স্বামী এস কে সুর এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে বা বেনামে অর্জিত সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা, আয়ের উৎস ও তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ দাখিলের জন্য সুপর্ণাকে নোটিশ দেওয়া হয়।

৩ ঘণ্টা আগে

মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি নয়, ট্রিগার আমিও টানতে জানি: শিক্ষামন্ত্রী

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহর উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, তার হাতে এখনো অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সাত মাসের মধ্যে সবকিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে উদ্যোগ এবং কাজের গতি দৃশ্যমান হওয়া দরকার। উপাচার্যের নেতৃত্বে যে দল গঠন করা হয়েছে, তাদের উৎপাদনশীলতা ও

৩ ঘণ্টা আগে
Advertisement