আমরা সবাই গাধা…

সাইমন মোহসিন
ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড এআই জেনারেটেড

‘আমরা সবাই রাজা, আমাদের এই রাজার রাজত্বে’— শিশুসুলভ এই গানের ভেতরে ছিল এক গভীর প্রতিশ্রুতি: এই দেশ সবার, মর্যাদা এখানে সমান, আর ক্ষমতা সিংহাসন থেকে নেমে আসে না— তা মানুষের কাছ থেকে সিংহাসন ও পুরো শাসনব্যবস্থাব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আজ সেই পঙ্‌ক্তি বাস্তবতার কাছে যেন সংশোধনের দাবিদার। আর এই সংশোধনের ফলে পঙ্‌ক্তিটি আরও নির্মম অথচ সত্যনিষ্ঠ এক সংস্করণে পরিণত হয়— ‘আমরা সবাই গাধা, আমাদের রাজাদের রাজযন্ত্রে’।

কারণ শাসনের এই সুবিশাল যন্ত্র এমন কিছু লোকজন পরিচালনা করেন, যারা হয় রাজা, বা যারা একসময় রাজা ছিলেন, কিংবা যারা মরিয়া হয়ে রাজা হতে চান। আজ আর ক্ষমতার উৎপত্তি জনগণ বা নাগরিক নয়; জনগণ, নাগরিক— এগুলো কেবল পটভূমির শব্দ। প্রতিবার নতুন কোনো ত্রাণকর্তাকে আমরা হাততালি দিই, শাসনের প্রতিটি সংস্করণ নীরবে সহ্য করি, আর প্রতিটি স্ববিরোধিতাকে অসাধারণ ধৈর্যে গিলে ফেলি। বিনিময়ে বারবার আমাদের আশ্বস্ত করা হয় যে নতুন সংস্করণের জন্য উদ্বুদ্ধ বিশৃঙ্খলা, দমন, আপস আর দরকষাকষি— সবই নাকি শেষ পর্যন্ত আমাদেরই মঙ্গলের জন্য।

এ যেন অনন্ত সংস্কারের এক রাজত্ব, যেখানে সবকিছু বদলায়, শুধু জনগণের ভূমিকা বদলায় না। এখানে মানুষের জন্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত একমাত্র চরিত্র— অনুগত থেকে বোকা বনে যাওয়া।

আজকের বাংলাদেশ যেন আত্মঘোষিত ত্রাণকর্তাদের এক প্রদর্শনীমঞ্চ— যারা প্রত্যেকে ‘সংস্কার’কে এমনভাবে তুলে ধরছেন, যেন সেটিই দেশের নতুন জাতীয় ফুল। দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে মহৎ— যদি না তা এতটা পরিচিত হতো। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক পুনরাবৃত্তির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ‘পরিবর্তন’ আর ‘আদর্শবাদ’-এর স্লোগানগুলো এখন মৌসুমি উৎসবের পোস্টারের মতো কাজ করে: রঙিন, দৃষ্টিনন্দন, এবং শেষ পর্যন্ত এমনভাবে নকশা করা, যাতে পৃষ্ঠপোষকদের আসল উদ্দেশ্য আড়ালেই থেকে যায়।

এই শব্দগুলো আর পথনির্দেশ দেয় না; তারা কেবল দৃশ্যপট সাজায়। ক্ষমতার ভাষ্য বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু প্রতিবারই একই নাটক নতুন মঞ্চসজ্জায় ফিরে আসে— যেখানে সংস্কার একদিকে নৈতিক উচ্চতার প্রতীক, অন্যদিকে পুরনো অভ্যাসকে নতুন মোড়কে চালিয়ে নেওয়ার নিরাপদ ঢাল। জনগণ তখন দর্শকাসনে বসে থাকে, করতালির সময় জানে, কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার ক্রমশ ভুলে যেতে শেখে।

বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা ‘নবায়ন ও সংস্কারের দিশারী’ হিসেবে আবির্ভূত অন্তর্বর্তী সরকারের কথাই ধরি। গত বছরের রাজনৈতিক উথালপাথালের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এক জোট, যারা দীর্ঘদিন ধরে গেঁড়ে বসা এক শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করে ‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতির দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই সরকার শুরু করে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’— যাকে তারা আখ্যা দেয় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অভিযান হিসেবে। বাস্তবে, এই প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার ও আটক করা হয় দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে।

এরই মধ্যে একসময়কার সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো— যে আইনি কাঠামোগুলো একদিন জবাবদিহির হাতিয়ার হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, সেগুলোর মাধ্যমেই। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যটা অনেকটাই এমন, যেন ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর প্রতিপক্ষের জন্য মাঠের গেট বন্ধ করে দেওয়া হলো। আইন এখানে নীতির নিরপেক্ষ রক্ষক হয়ে ওঠেনি; বরং ক্ষমতার নতুন বিন্যাসকে স্থায়ী করার সিলমোহর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর ফলে ওই দলের অসংখ্য সাধারণ সমর্থক— যাদের নাম কাগজে-কলমে অভিযোগের তালিকায় আছে, কিন্তু যারা সমাজের গভীরে প্রোথিত— আজ এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি। এই জবাবদিহি কি সত্যিই ন্যায়বিচারের জন্য, নাকি প্রভাব ও কর্তৃত্ব সংহত করার আরেকটি কৌশলমাত্র?

আর দেশ ও জাতির নতুন প্রেক্ষাপট ও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া আন্দোলনের বিষয়টাও রয়েছে। একসময় তারুণ্যনির্ভর রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এই আন্দোলন। পরিবর্তনের তাজা হাওয়া হিসেবে যাকে স্বাগত জানানো হয়েছিল, সেই জাতীয় নাগরিক পার্টি আজ নিজেই অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত— কারণ তারা যাদের ঘোর সমালোচনা ও নিন্দা করেছিল একসময়, সেই সংগঠনের সঙ্গেই জোট বাঁধার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখন তারা। এই অংশীদারত্ব তাদের গড়ে তোলা নির্মল সংস্কারবাদী বয়ানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলেই অনেকের বিশ্বাস।

প্রতিক্রিয়াও আসে দ্রুত। অন্তত ত্রিশজন নেতা প্রকাশ্য প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন, নিজেদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলেন— দলের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ। যে দলটি রাজনীতিতে নৈতিক ভিন্নতা আনার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তারা হঠাৎই সেই পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই আটকে পড়ে, যেখান থেকে দলটি বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তরুণদের নাম করে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্ম যখন পুরোনো শক্তির ভরকেন্দ্রে আশ্রয় নেয়, তখন প্রশ্নটা আর কেবল কৌশলের থাকে না— তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসের, এবং সেই বিশ্বাস ভাঙার শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যায়।

আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে শুধু সংস্কারকেরা তাদের জোট পুনর্বিন্যাস করছেন— রাষ্ট্র স্বাধীনতার কথা সুচারুভাবে উচ্চারণ করলেও, নীরবে নিজের অবক্ষয় মেনে নিচ্ছে যেন। স্থিতিশীলতা ও উত্তরণের ব্যানারে গণমাধ্যমের ওপর হামলার জবাব দেওয়া হচ্ছে এক অদ্ভুত নীরবতায়। সংবাদকক্ষ ভাঙচুর হয়েছে, অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে, প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া হয়েছে— তবু জবাবদিহি রয়ে গেছে অধরাই।

এ এক বিস্ময়কর শাসন-মডেল, যেখানে নীতিগতভাবে বাক্‌স্বাধীনতা উদ্‌যাপিত হয়, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো রক্ষাকবচ নেই। আরও বিস্ময়কর হলো মব কালচারের উত্থান— নিজেদের মনোনীত নৈতিকতা, জাতীয়তাবাদ বা বিপ্লবী পবিত্রতার প্রহরী হিসেবে আবির্ভূত কিছু দল, যারা এমন আত্মবিশ্বাসে ঘোরাফেরা করে, যা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নয়, বরং কর্তৃত্বের সঙ্গে একধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত দেয়। প্রকৃত কর্তৃত্ববাহকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আইন-কানুনের প্রতি সকল শ্রদ্ধা জলাঞ্জলি দিয়ে স্বীয় এক আইনব্যবস্থার আবির্ভাব হয়েছে। আর সেখানেই বিপদের আসল ইঙ্গিত: রাষ্ট্র যখন চোখ ফিরিয়ে নেয়, তখন মবের মতো কাঠামোগুলো আইনব্যবস্থা প্রণয়ন করা শুরু করে; আর সেই কাঠামো কোনো সংবিধান, কোনো প্রতিষ্ঠিত নিয়ম মানে না। এই কাঠামোর কার্যকলাপে তখন দেখা যায় কেবল বিকৃত অনুমতির ছায়া।

এখানে সংস্কার আর ক্ষমতায়নের ভাষা একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠে না; বরং আইন হয়ে দাঁড়ায় নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। জবাবদিহির বদলে অনিশ্চয়তা, সুরক্ষার বদলে শঙ্কা— এই বাস্তবতাই স্পষ্ট করে দেয়, সংস্কারের নামে প্রবর্তিত অনেক ব্যবস্থাই আসলে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে, কিন্তু সমাজকে নয়।

ফলাফলটা দাঁড়ায় এক অদ্ভুত সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মতো— যেখানে প্রতিটি প্রতিযোগী শপথ করে বলে তারা নাকি ট্রফির ধারই ধারে না, অথচ একই সঙ্গে নিজেদের পোশাকে গুঁজে দেয় স্পনসরের লোগো। সংস্কারের এজেন্ডা তখন আর নীতিনির্ধারণের বিষয় থাকে না; তা পরিণত হয় অবস্থান নেওয়ার খেলায়— কে পরের মন্ত্রণালয় পাবে, কে নতুন কমিশনে বসবে, আর ইতিহাসের বয়ান কে নিয়ন্ত্রণ করবে।

যদি আদর্শবাদই মুদ্রা হতো, তবে বাংলাদেশ হতো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ। প্রতিটি ইশতেহারেই থাকে জাতীয় স্বার্থ, জনগণের ক্ষমতায়ন, আর ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বহু নাগরিকের জীবিত অভিজ্ঞতা এক ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে— সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভিন্নমত দমনের আশঙ্কা, এবং এই অনুভূতি যে ‘সংস্কার’ হয়তো রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের নতুন নামমাত্র।

এই মহা প্রদর্শনীতে জনতা বক্তৃতার সর্বত্র, কিন্তু প্রকৃত সিদ্ধান্তের কক্ষগুলোতে কোথাও নেই। তাদের স্বার্থ উচ্চারিত হয় আনুষ্ঠানিক আশীর্বাদের মতো— উচ্চারণে সান্ত্বনাদায়ক, শোনাতে সুন্দর— কিন্তু বাস্তব সিদ্ধান্তের মুহূর্তে প্রায়শই উপেক্ষিত।

এভাবেই আমাদের সেই গানটি পূর্ণচক্রে ফিরে আসে— অভিজ্ঞতার ভারে নতুন করে লেখা হয়ে। এই রাজ্যে আমরা রাজা নই; আমরা সংস্কারের ছদ্মবেশে চলা ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দর্শক, এমন সব আন্দোলনের দাতা যারা সংগঠিত হলেই আমাদের ভুলে যায়, আর এমন আদর্শের সাক্ষী— যেগুলো কর্তৃত্ব হাতের নাগালে এলেই গলে যায়। সংবাদমাধ্যম পুড়ে, জনতা উন্মত্ত হয়ে ঘোরে, নীতিরা বাঁক নেয়, জোট বদলায়— তবু প্রদর্শনী থামে না। বরাবরের মতোই তা আমাদের ধৈর্য, আমাদের নীরবতা, আমাদের বিশ্বাস দাবি করে।

আমরা সবাই গাধা— বুদ্ধির অভাবে নয়, বরং এই কারণে যে আমাদের কাছে প্রত্যাশাই করা হয় কৌশল হিসেবে স্ববিরোধিতা মেনে নিতে, প্রয়োজনের নামে দমনকে স্বাভাবিক ভাবতে, আর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ত্যাগ বলে মেনে নিতে। যতদিন শাসনব্যবস্থা মানুষকে রাজকীয় যন্ত্রের বিনিময়যোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য করবে, ততদিন এ দেশ বহু রাজার, শোষিত প্রজার দেশ হয়েই থাকবে— আর নাগরিকরা চিরকালই গলা মিলিয়ে গান গাইতে বাধ্য হবে— আমরা সবাই গাধা…

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নির্বাচনের ফল প্রকাশ: গণমাধ্যমে তথ্যবিভ্রান্তি

একই আসনের ফলাফল নিয়ে একেকটি মাধ্যমে একেক রকম তথ্য প্রকাশ পেতে থাকে। কোনো চ্যানেলের স্ক্রলে যে সংখ্যা ভেসে উঠছে, অনলাইন পোর্টালে হয়তো দেখা যায় ভিন্ন সংখ্যা। আর সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে আরও ভিন্ন তথ্য। সাধারণ দর্শক বা ভোটার বুঝতে পারেন না, কোন তথ্যটি আংশিক। আর কোনটি সর্বশেষ।

৫ দিন আগে

বিনম্র শ্রদ্ধা: বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ শংকর

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬— ৯৩ বছরের দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন অনন্তলোকের পথে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এই কথাশিল্পী রেখে গেলেন তার কালজয়ী সাহিত্যকর্মের বিশাল ভান্ডার, অসংখ্য চরিত্র, অগণিত পাঠকের আবেগ এবং কয়েক প্রজন্মের মানসগঠনে গভীর ছাপ।

৭ দিন আগে

বাংলা ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশ

বাঙালির জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি ঘটনা যা এ দেশের বহু মানুষকে বিভিন্নভাবে ছুঁয়ে গেছে এবং সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন অর্থ, ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা ও তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

৭ দিন আগে

বাংলা ভাষা কি স্বদেশে প্রবাসী?

আমাদের বড় পরিচয়— আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, চিন্তা ও বোধ একসূত্রে গাঁথা। বাঙালি হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আজ আমাদের গর্বিত পরিচয়— মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি; আমরা একুশের উত্তরাধিকার।

৭ দিন আগে