
নাহিদ আক্তার

অশালীনতা, ঘৃণা ও যৌন ইঙ্গিতের ভাষা যখন জনপরিসরের নতুন স্বাভাবিকতা হয়ে ওঠে, তখন শুধু বিতর্কের মান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের জনপরিসরে ভাষা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের বাহন নয়, ভাষা একটি সমাজের নৈতিকতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের চরিত্রও নির্মাণ করে। আমরা কেমন ভাষায় কথা বলি, কী ধরনের শব্দকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, ভিন্নমতকে কীভাবে সম্বোধন করি— এসবের ভেতরেই একটি সমাজের সভ্যতা ও সহনশীলতার মানদণ্ড ধরা পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত রাজনৈতিক বিতর্ক ঘিরে যে ভাষা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে তা উদ্বেগজনক। মতবিরোধ প্রকাশের নামে গালি, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ, শরীর নিয়ে অপমান, নারীবিদ্বেষী উপমা, এমনকি যৌন সহিংসতার ইশারায় নির্মিত রসিকতাও এখন বহু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
যে জায়গায় যুক্তি, তথ্য, মতাদর্শ বা নৈতিক অবস্থান থাকার কথা, সেখানে ক্রমশ জায়গা নিচ্ছে ব্যক্তিকে ছোট করার ভাষা। যেন প্রতিপক্ষকে হারানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাকে অপমান করা, তার মানবিক মর্যাদাকে আঘাত করা, কিংবা নারীর শরীর ও যৌনতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা।
এই প্রবণতার ভয়াবহতা এমনই যে এটি আর কেবল কিছু বেনামি ট্রল বা উত্তেজিত অনলাইন ব্যবহারকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সমাজে দৃশ্যমান, শিক্ষিত, প্রভাবশালী ও মতামত-নির্মাতা হিসেবে পরিচিত মানুষদের মধ্যেও এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট অনেকেই সরাসরি বা পরোক্ষে এমন ভাষাকে স্বাভাবিক করে তুলছেন।
কেউ নিজে ব্যবহার করছেন, কেউ নীরব সমর্থন দিচ্ছেন, কেউ আবার সেটিকে ‘সময়ের ভাষা’, ‘রাজনৈতিক রাগ’, বা ‘সাহসী প্রতিবাদ’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভাষা কখনো নির্দোষ নয়। যে ভাষা আমরা জনপরিসরে বৈধতা দিই, সেটিই ধীরে ধীরে সামাজিক আচরণে পরিণত হয়, সেটিই নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষার অংশ হয়ে যায়। এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি— আমরা নতুন প্রজন্মকে কী শেখাচ্ছি?
আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি যে রাজনৈতিক বিরোধিতা মানে যুক্তি, তথ্য, ইতিহাসবোধ ও নৈতিক অবস্থান? নাকি শেখাচ্ছি যে প্রতিপক্ষকে অপমান করতে পারাই রাজনৈতিক দক্ষতা? আমরা কি দেখাচ্ছি যে গণতান্ত্রিক বিতর্ক মানে ভিন্নমতের প্রতি ন্যূনতম সম্মান বজায় রেখে তীব্র সমালোচনা করা? নাকি এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলছি, যেখানে বেশি গালি দিতে পারা, বেশি অশ্লীল ইঙ্গিত করতে পারা, বা বেশি হেয় করতে পারাই রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ?
এই প্রশ্নকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ ভাষা কেবল বর্তমানকে প্রকাশ করে না, ভাষা ভবিষ্যৎও তৈরি করে। আজ যে কিশোর বা তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে— একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করতে হলে গালি দিতে হবে, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করতে হবে, নারীবিদ্বেষী কৌতুক করতে হবে, অথবা প্রতিপক্ষকে অমানবিক করে তুলতে হবে, সে আগামীকাল সেই ভাষাকেই রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাভাবিক উপায় হিসেবে গ্রহণ করবে। তখন রাজনীতি আর মতাদর্শ, নীতি বা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পরিণত হবে অবমাননা, তাচ্ছিল্য ও সহিংস প্রতীকের প্রতিযোগিতায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো— এই ভাষা প্রায়ই নারীর শরীর, যৌনতা ও যৌন সহিংসতাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেও নারীদেহকে এমন এক অবমাননার ক্ষেত্র হিসেবে হাজির করা হয়, যাকে যেকোনো সময় টেনে আনা যায় প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য। এতে রাজনৈতিক ভাষা শুধু অশালীন হয় না, এটি গভীরভাবে লিঙ্গবিদ্বেষীও হয়ে ওঠে।
ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন বা নারীর শরীরকে যদি কৌতুক, গালি বা রাজনৈতিক রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি কেবল একজন প্রতিপক্ষকে আঘাত করে না; বরং পুরো সমাজকে শেখায় যে নারীর প্রতি সহিংসতাও ভাষার খেলায় ব্যবহারযোগ্য। এটি কেবল রুচির প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং লিঙ্গসমতার প্রশ্ন।
এখানে আরও একটি রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। অশালীন ভাষার এই বিস্তার কেবল আবেগের বহির্প্রকাশ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। যখন কোনো গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ককে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে অপমান, কুরুচি ও যৌন ইঙ্গিতের দিকে নিয়ে যায়, তখন প্রকৃত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়। নীতির আলোচনা হারিয়ে যায়, জবাবদিহি দুর্বল হয়, আর জনপরিসর ক্রমে বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
প্রতিপক্ষ তখন আর একজন নাগরিক বা সহমতহীন মানুষ নয়, সে হয়ে ওঠে ‘শত্রু’— যাকে যুক্তি দিয়ে নয়, ভাষাগত সহিংসতা দিয়ে ধ্বংস করতে হবে। এই অমানবিকীকরণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য গভীর বিপজ্জনক।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি এই পরিবর্তনকে বিশেষ উদ্বেগের সঙ্গে দেখি। কারণ শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তক বা পরীক্ষার বিষয় নয়; শিক্ষা মানে ভাষার নৈতিকতা শেখা, ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতা অর্জন করা, যুক্তির মূল্য বোঝা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের সম্পর্ক বুঝতে শেখা। কিন্তু যখন শিক্ষিত সমাজের একটি অংশই জনপরিসরে অশালীনতা, নারীবিদ্বেষ ও অপমানকে উদ্যাপন করে, তখন তরুণদের কাছে ভুল বার্তাই পৌঁছে যায়। তারা মনে করতে শুরু করে সংযম দুর্বলতা, শালীনতা ভণ্ডামি, আর গালি হলো সত্য বলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়। যে ভাষা অন্যের মানবিক মর্যাদা নষ্ট করে, যৌন সহিংসতাকে হালকা করে, নারীবিদ্বেষকে জনপ্রিয় করে তোলে, বা জনপরিসরকে ইচ্ছাকৃতভাবে নোংরা করে— তাকে ‘সাহসী’ বা ‘খোলামেলা’ ভাষা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি তার উচ্চকণ্ঠতায় নয়, বরং তার যুক্তি, সহনশীলতা এবং মানবিক সংযমে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে না। সেটি নির্ভর করবে আমাদের জনপরিসরের নৈতিক মানের ওপরও। আমরা কেমন ভাষা শুনতে অভ্যস্ত হচ্ছি, কোন ভাষাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, কাকে তালি দিচ্ছি, কাকে চুপচাপ মেনে নিচ্ছি— এই সবকিছু মিলেই গড়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যদি আজ আমরা ঘৃণা, অশ্লীলতা, যৌন অপমান ও অবমাননাকে রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে বৈধতা দিই, তাহলে আগামী সমাজ আরও বেশি সহিংস, আরও বেশি অসহিষ্ণু, আরও বেশি অমানবিক হয়ে উঠবে এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
তাই এখনই আমাদের থামতে হবে এবং প্রশ্ন করতে হবে— আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ভাষা হবে ক্ষমতার বুলডোজার, আর ভিন্নমত হবে অপমানের টার্গেট? নাকি আমরা এমন এক জনপরিসর চাই, যেখানে তীব্র সমালোচনাও মর্যাদার সঙ্গে করা যায়, রাজনৈতিক বিরোধও মানবিকতার সীমানা অতিক্রম করে না এবং নতুন প্রজন্ম শিখে শক্তিশালী ভাষা মানে অশালীন ভাষা নয়; সত্যিকারের রাজনৈতিক পরিপক্বতা মানে অন্যকে ছোট করা নয়, বরং যুক্তির শক্তিতে দাঁড়াতে পারা।
ভাষা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। ভাষা মানুষ গড়ে, সমাজ গড়ে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে। তাই ভাষার এই অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা কোনো রক্ষণশীলতার লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক

অশালীনতা, ঘৃণা ও যৌন ইঙ্গিতের ভাষা যখন জনপরিসরের নতুন স্বাভাবিকতা হয়ে ওঠে, তখন শুধু বিতর্কের মান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের জনপরিসরে ভাষা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের বাহন নয়, ভাষা একটি সমাজের নৈতিকতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের চরিত্রও নির্মাণ করে। আমরা কেমন ভাষায় কথা বলি, কী ধরনের শব্দকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, ভিন্নমতকে কীভাবে সম্বোধন করি— এসবের ভেতরেই একটি সমাজের সভ্যতা ও সহনশীলতার মানদণ্ড ধরা পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত রাজনৈতিক বিতর্ক ঘিরে যে ভাষা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে তা উদ্বেগজনক। মতবিরোধ প্রকাশের নামে গালি, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ, শরীর নিয়ে অপমান, নারীবিদ্বেষী উপমা, এমনকি যৌন সহিংসতার ইশারায় নির্মিত রসিকতাও এখন বহু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
যে জায়গায় যুক্তি, তথ্য, মতাদর্শ বা নৈতিক অবস্থান থাকার কথা, সেখানে ক্রমশ জায়গা নিচ্ছে ব্যক্তিকে ছোট করার ভাষা। যেন প্রতিপক্ষকে হারানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাকে অপমান করা, তার মানবিক মর্যাদাকে আঘাত করা, কিংবা নারীর শরীর ও যৌনতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা।
এই প্রবণতার ভয়াবহতা এমনই যে এটি আর কেবল কিছু বেনামি ট্রল বা উত্তেজিত অনলাইন ব্যবহারকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সমাজে দৃশ্যমান, শিক্ষিত, প্রভাবশালী ও মতামত-নির্মাতা হিসেবে পরিচিত মানুষদের মধ্যেও এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট অনেকেই সরাসরি বা পরোক্ষে এমন ভাষাকে স্বাভাবিক করে তুলছেন।
কেউ নিজে ব্যবহার করছেন, কেউ নীরব সমর্থন দিচ্ছেন, কেউ আবার সেটিকে ‘সময়ের ভাষা’, ‘রাজনৈতিক রাগ’, বা ‘সাহসী প্রতিবাদ’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভাষা কখনো নির্দোষ নয়। যে ভাষা আমরা জনপরিসরে বৈধতা দিই, সেটিই ধীরে ধীরে সামাজিক আচরণে পরিণত হয়, সেটিই নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষার অংশ হয়ে যায়। এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি— আমরা নতুন প্রজন্মকে কী শেখাচ্ছি?
আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি যে রাজনৈতিক বিরোধিতা মানে যুক্তি, তথ্য, ইতিহাসবোধ ও নৈতিক অবস্থান? নাকি শেখাচ্ছি যে প্রতিপক্ষকে অপমান করতে পারাই রাজনৈতিক দক্ষতা? আমরা কি দেখাচ্ছি যে গণতান্ত্রিক বিতর্ক মানে ভিন্নমতের প্রতি ন্যূনতম সম্মান বজায় রেখে তীব্র সমালোচনা করা? নাকি এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলছি, যেখানে বেশি গালি দিতে পারা, বেশি অশ্লীল ইঙ্গিত করতে পারা, বা বেশি হেয় করতে পারাই রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ?
এই প্রশ্নকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ ভাষা কেবল বর্তমানকে প্রকাশ করে না, ভাষা ভবিষ্যৎও তৈরি করে। আজ যে কিশোর বা তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে— একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করতে হলে গালি দিতে হবে, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করতে হবে, নারীবিদ্বেষী কৌতুক করতে হবে, অথবা প্রতিপক্ষকে অমানবিক করে তুলতে হবে, সে আগামীকাল সেই ভাষাকেই রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাভাবিক উপায় হিসেবে গ্রহণ করবে। তখন রাজনীতি আর মতাদর্শ, নীতি বা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পরিণত হবে অবমাননা, তাচ্ছিল্য ও সহিংস প্রতীকের প্রতিযোগিতায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো— এই ভাষা প্রায়ই নারীর শরীর, যৌনতা ও যৌন সহিংসতাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেও নারীদেহকে এমন এক অবমাননার ক্ষেত্র হিসেবে হাজির করা হয়, যাকে যেকোনো সময় টেনে আনা যায় প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য। এতে রাজনৈতিক ভাষা শুধু অশালীন হয় না, এটি গভীরভাবে লিঙ্গবিদ্বেষীও হয়ে ওঠে।
ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন বা নারীর শরীরকে যদি কৌতুক, গালি বা রাজনৈতিক রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি কেবল একজন প্রতিপক্ষকে আঘাত করে না; বরং পুরো সমাজকে শেখায় যে নারীর প্রতি সহিংসতাও ভাষার খেলায় ব্যবহারযোগ্য। এটি কেবল রুচির প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং লিঙ্গসমতার প্রশ্ন।
এখানে আরও একটি রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। অশালীন ভাষার এই বিস্তার কেবল আবেগের বহির্প্রকাশ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। যখন কোনো গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ককে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে অপমান, কুরুচি ও যৌন ইঙ্গিতের দিকে নিয়ে যায়, তখন প্রকৃত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়। নীতির আলোচনা হারিয়ে যায়, জবাবদিহি দুর্বল হয়, আর জনপরিসর ক্রমে বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
প্রতিপক্ষ তখন আর একজন নাগরিক বা সহমতহীন মানুষ নয়, সে হয়ে ওঠে ‘শত্রু’— যাকে যুক্তি দিয়ে নয়, ভাষাগত সহিংসতা দিয়ে ধ্বংস করতে হবে। এই অমানবিকীকরণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য গভীর বিপজ্জনক।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি এই পরিবর্তনকে বিশেষ উদ্বেগের সঙ্গে দেখি। কারণ শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তক বা পরীক্ষার বিষয় নয়; শিক্ষা মানে ভাষার নৈতিকতা শেখা, ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতা অর্জন করা, যুক্তির মূল্য বোঝা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের সম্পর্ক বুঝতে শেখা। কিন্তু যখন শিক্ষিত সমাজের একটি অংশই জনপরিসরে অশালীনতা, নারীবিদ্বেষ ও অপমানকে উদ্যাপন করে, তখন তরুণদের কাছে ভুল বার্তাই পৌঁছে যায়। তারা মনে করতে শুরু করে সংযম দুর্বলতা, শালীনতা ভণ্ডামি, আর গালি হলো সত্য বলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়। যে ভাষা অন্যের মানবিক মর্যাদা নষ্ট করে, যৌন সহিংসতাকে হালকা করে, নারীবিদ্বেষকে জনপ্রিয় করে তোলে, বা জনপরিসরকে ইচ্ছাকৃতভাবে নোংরা করে— তাকে ‘সাহসী’ বা ‘খোলামেলা’ ভাষা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি তার উচ্চকণ্ঠতায় নয়, বরং তার যুক্তি, সহনশীলতা এবং মানবিক সংযমে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে না। সেটি নির্ভর করবে আমাদের জনপরিসরের নৈতিক মানের ওপরও। আমরা কেমন ভাষা শুনতে অভ্যস্ত হচ্ছি, কোন ভাষাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, কাকে তালি দিচ্ছি, কাকে চুপচাপ মেনে নিচ্ছি— এই সবকিছু মিলেই গড়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যদি আজ আমরা ঘৃণা, অশ্লীলতা, যৌন অপমান ও অবমাননাকে রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে বৈধতা দিই, তাহলে আগামী সমাজ আরও বেশি সহিংস, আরও বেশি অসহিষ্ণু, আরও বেশি অমানবিক হয়ে উঠবে এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
তাই এখনই আমাদের থামতে হবে এবং প্রশ্ন করতে হবে— আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ভাষা হবে ক্ষমতার বুলডোজার, আর ভিন্নমত হবে অপমানের টার্গেট? নাকি আমরা এমন এক জনপরিসর চাই, যেখানে তীব্র সমালোচনাও মর্যাদার সঙ্গে করা যায়, রাজনৈতিক বিরোধও মানবিকতার সীমানা অতিক্রম করে না এবং নতুন প্রজন্ম শিখে শক্তিশালী ভাষা মানে অশালীন ভাষা নয়; সত্যিকারের রাজনৈতিক পরিপক্বতা মানে অন্যকে ছোট করা নয়, বরং যুক্তির শক্তিতে দাঁড়াতে পারা।
ভাষা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। ভাষা মানুষ গড়ে, সমাজ গড়ে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে। তাই ভাষার এই অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা কোনো রক্ষণশীলতার লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক

কিন্তু যখন এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে ধর্মীয় প্রতীক, ঈমানের পরিচয় কিংবা পবিত্র বিশ্বাসকে বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানো হয়, তখন বিষয়টি আর শুধুমাত্র খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন এটি বিবেক, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
৭ দিন আগে
জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে এই লেখার মাধ্যমে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসের কাছে দাবি রাখি— এই দেশ, এই ইতিহাস যেন তাদের নামেও উচ্চারিত হয়। দীর্ঘ জুলাইয়ে ঝরে যাওয়া অসংখ্য নারীর প্রাণ, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও নারীদের লড়াই এখনো চলমান।
৮ দিন আগে
বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর— সবখানেই অসংখ্য মেধাবী শিশুর জন্ম হচ্ছে। তারা প্রশ্ন করতে জানে, নতুন কিছু ভাবতে জানে, স্বপ্ন দেখতে জানে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্ভাবনার একটি বড় অংশ সঠিক পরিচর্যা, দিকনির্দেশনা ও সহায়ক পরিবেশের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
১০ দিন আগে
প্রথম দৃষ্টিতে এমপি নুরুন্নিসার বক্তব্যকে সমঅধিকারের পক্ষে একটি যুক্তি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও জননীতির আলোচনায় সমতা (Equality) ও ন্যায়সঙ্গত সমতা (Equity) এক বিষয় নয়। অনেক সময় সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দিতে হয়। এ
১৩ দিন আগে