দাউদ হায়দার ও রাষ্ট্রের অক্ষমতা

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

দেশ মানে কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, দেশ মানে একজন মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই সেই ঠিকানায় নিষিদ্ধের সীলমোহর আঁটে তখন প্রশ্ন জাগে— মানবিকতা কি নিঃশেষ হয়ে গেছে?

দাউদ হায়দার। একজন কবি, যার ভাষা ছিল প্রশ্নের, যার শব্দে ছিল সন্ধানের স্পর্ধা। ৫১ বছর ধরে তিনি নিজ জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত। এই নির্বাসন কি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের? নাকি আমাদেরও দায় আছে এতে?

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল নাজুক। মাত্র তিন বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মাটিতে তখনো রক্তের গন্ধ শুকায়নি, দুর্ভিক্ষের ছায়া ঘনিয়ে এসেছিল।

এই কঠিন সময়ের মধ্যে দাউদ হায়দার লিখেছিলেন এমন এক কবিতা, যেখানে তিনি ঈশ্বরকে ‘কল্পিত’ বলেছিলেন। প্রশ্ন তুলেছিলেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অতুলনীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল অস্তিত্ববাদী এক বেদনা।

এই উচ্চারণ ধর্মান্ধদের মনে আগুন ধরায়। রাষ্ট্র আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ধর্মানুভূতিকে আঘাত করার অভিযোগ ছিল যেন মৃত্যুদণ্ডের সমান। সুতরাং, রক্ষা করতেই হোক বা চাপের কাছে নত হয়েই হোক, সরকার দাউদ হায়দারকে একটি বিশেষ বিমানে চড়িয়ে নির্বাসনে পাঠায়।

কিন্তু সময় গড়াল। দেশ দৃঢ় হলো। সরকার বদল হলো। সমাজ বদলালো। তবু কবি ফিরতে পারলেন তবু রাষ্ট্র তার নিজের ঘরদোরের সামনে কাঁটাতারের বেড়া তুলে রাখল।

আমরা কি সত্যি ভুলে গেছি? নাকি ইচ্ছা করেই মনে রাখতে চাই না যে একজন কবি শুধু স্বাধীনতা চেয়েছিলেন চিন্তায়, বিশ্বাসে, উচ্চারণে? নাকি এখনো আমরা ভয় পেয়ে যাই কটি প্রশ্নোচ্চারণের সামনে?

রাষ্ট্র যদি আত্মবিশ্বাসী হতো, যদি নাগরিকের বাকস্বাধীনতাকে সম্মান করত, তবে দাউদ হায়দার আজ নিজের জন্মভূমিতে, নিজ মাটিতে শ্বাস নিতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি। আর হয়নি বলেই আজও তার অস্তিত্ব আমাদের কাছে এক অস্বস্তিকর স্মৃতি হয়ে আছে।

বিশ্ব এগিয়েছে। বিজ্ঞান মঙ্গলের মাটি ছুঁয়েছে, শিল্প সাহিত্যে বহু ধর্মবিষয়ক প্রশ্ন নির্ভয়ে উচ্চারিত হয়েছে। অথচ আমরা এখনো অন্ধত্বের ফ্রেমে আটকে আছি। এখনো মনে করি— শক্তি মানে নিঃশর্ত আনুগত্য আদায়, প্রশ্নহীন বিশ্বাস, নির্বিবাদে চলা।

আমরা এখনো মনে করি— ভিন্নমত মানেই বিশ্বাসঘাতকতা। অথচ প্রকৃত স্বাধীনতা মানে তো প্রশ্ন করার সাহস, উত্তর খোঁজার অধিকার।

দাউদ হায়দার কোনো অপরাধী ছিলেন না। তিনি বন্দুক হাতে তুলে নেননি, রাষ্ট্রদ্রোহ করেননি। তিনি শুধু শব্দের মাধ্যমে, চিন্তার মাধ্যমে স্বাধীনতার আরেকটি রূপ দাবি করেছিলেন। সেই দাবির অপরাধে পাঁচ দশক ধরে তাকে রাষ্ট্রচ্যুত করে রাখা হয়েছে।

আজ যখন দাউদ হায়দারের জীবন শেষ, তখন কি রাষ্ট্র তার এই অসমাপ্ত অন্যায় সংশোধন করবে? এখন কি আমরা একটু সাহস দেখাব? নাকি আরও একবার প্রমাণ করব— আমাদের দেশ এখনো কেবল মাটি ও সীমান্তের নাম, হৃদয়ের নাম নয়?

একজন কবির নির্বাসন মানে কেবল তার ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, বরং গোটা জাতির আত্মিক দৈন্যের দলিল। এই দলিলের ভার বহন করে যাচ্ছে পুরো সমাজ। দাউদ হায়দারের নির্বাসিত জীবন হয়ে থাকবে আমাদের জাতির অন্তহীন কলঙ্ক।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

পাঠ্যবই: প্রাথমিকে কী শেখানো হচ্ছে চাকমা শিক্ষার্থীদের?

কী আছে চাকমা ভাষা ও হরফে রচিত পাঠ্যবইগুলোতে? বইগুলো পর্যালোচনায় অসংখ্য ভুল, অসঙ্গতি ও মানহীন রচনা পাওয়া গেছে। রয়েছে ভুলে ভরা বানান, শব্দের অপপ্রয়োগ, দুর্বল লিখনশৈলী ও ধারাবাহিকতার অভাব। পেশাদারিত্বের বিশাল অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ভিনভাষার ছড়াকে অনুকরণ করে চাকমারূপ দেওয়া হয়েছে। এখানে কিছু অসঙ

১০ দিন আগে

রাজনৈতিক কৌশল নাকি ভাষার অবক্ষয়?

অশালীন ভাষার এই বিস্তার কেবল আবেগের বহির্প্রকাশ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। যখন কোনো গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ককে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে অপমান, কুরুচি ও যৌন ইঙ্গিতের দিকে নিয়ে যায়, তখন প্রকৃত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়। নীতির আলোচনা হারিয়ে যায়, জবাবদিহি দুর্বল হয়, আর জনপরিসর

১৩ দিন আগে

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি— উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক

জানাজার দিনে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে আমার চেহারা ছিল স্যারের কাছে পরিচিত। অনেকদিন পর কাছে পেয়ে উনি মন খুলে কথা বললেন। বেশ স্বাভাবিকভাবে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। উনি যে সন্তানহারা বাবা, তা তখন মনে হয়নি। ওনার মনোবল দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম।

১৭ দিন আগে

পুঁজিবাজার ধনাত্মক ধারায়: ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতা ও আস্থাহীনতার পর দেশের পুঁজিবাজার আবার ধনাত্মক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। জাতীয় বাজেটে কর-সুবিধা ও নীতি-সহায়তার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে দৃশ্যমান। তবে এ ইতিবাচক ধারা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

১৮ দিন আগে