যুদ্ধের ১০০ দিন: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন সমীকরণ

সাঈদ বারী

৭ জুন ২০২৬, ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাতের ১০০ দিন পূর্ণ হলো। ইতিহাসের বিচারে ১০০ দিন খুব দীর্ঘ সময় নয়, কিন্তু কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই সময়ই অনেক বড় রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

গত ১০০ দিনে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যায়নি; কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য, জোট রাজনীতি, আন্তর্জাতিক জনমত এবং যুদ্ধ সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণা গভীরভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

যুদ্ধের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির সামনে ইরান দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়বে— এমন ভবিষ্যদ্বাণীও কম ছিল না। কিন্তু ১০০ দিন পর যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।

সামরিক সংঘর্ষের মাঝেও একাধিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির সময়েও উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন হামলা, পালটা হামলা ও সীমান্ত অতিক্রম করে সামরিক অভিযানের খবর এসেছে। ইসরায়েল লেবাননে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে ইরানও নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি কখনোই প্রকৃত শান্তিতে রূপ নিতে পারেনি।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো— এটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধ নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্ক তারই প্রমাণ। মার্কিন কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। শুধু বিরোধী দল নয়, ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও কিছু সদস্য এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। এটি ইঙ্গিত করে যে যুদ্ধের যৌক্তিকতা, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

একই সময়ে বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরছেন। তাদের একটি অংশের মতে, যুদ্ধের শুরুতে যেভাবে ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করে ফেলার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। বরং ইরান সামরিক, রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক— তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করেছে। যদিও এই মূল্যায়নের সঙ্গে সবাই একমত নন, তবুও এটুকু স্পষ্ট যে যুদ্ধের প্রথম দিকে যে দ্রুত বিজয়ের ধারণা প্রচারিত হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।

আন্তর্জাতিক জনমতও এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত জরিপ ও জনমত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি, মানবিক সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক দেশেই জনগণ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে বেশি জোর দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে যুদ্ধের প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চল। ফলে এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ এরই মধ্যে বিভিন্ন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সতর্ক করে দিচ্ছেন যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন ধরনের মন্দার মুখোমুখি হতে পারে।

এদিকে কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। রাশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে নিজেকে সম্ভাব্য আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়; বরং বৃহত্তর বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অংশে পরিণত হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অবস্থানও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। কয়েক বছর আগেও যেসব দেশ ইরানকে প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করত, তাদের অনেকেই এখন পরিস্থিতিকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তারা আরও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত মিত্রতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাঠামোতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যেতে পারে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এমন সময়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল কোনো বিদেশি যুদ্ধ সাধারণত ভোটারদের মধ্যে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং সামরিক সম্পৃক্ততার প্রশ্ন নির্বাচনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে। ফলে এই সংঘাতের রাজনৈতিক প্রভাব ওয়াশিংটনের ক্ষমতার করিডোরেও অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

১০০ দিনের এই যুদ্ধ আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। আধুনিক বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। উন্নত অস্ত্র, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা সামরিক জোট গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাতীয় সংহতি, কৌশলগত ধৈর্য, আঞ্চলিক সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক জনমতও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেকোনো সংঘাতের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে এসব উপাদান ক্রমেই বড় ভূমিকা পালন করছে।

যুদ্ধের ১০০ দিন শেষে বিজয় কিংবা পরাজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু এটুকু বলা যায়, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। আগামী মাসগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হবে আলোচনার টেবিলে কী ঘটে। কারণ শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ যুদ্ধই অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সমাপ্ত হয়।

লোখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১১ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে