পরিচ্ছন্নতা বিলাসিতা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি

এ টি এম আবু আসাদ
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮: ১৬
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি

ডিম আগে না মুরগি আগে— এই অনর্থক বিতর্কের মতো কেউ বলতে পারেন, দেশের উন্নয়ন হলে সবকিছু পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে যাবে। আসলে কথাটি হবে এর বিপরীত। দেশের উন্নয়ন করতে হলে আমাদের প্রতিটি কাজে হতে হবে পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ও শৃঙ্খলাবদ্ধ।

নৈতিকতার দৃষ্টিতে পরিচ্ছন্নতার দুটি দিক— বাহ্যিক ও আত্মিক। শরীর, পোশাক, বাসস্থান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা। আর হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, মিথ্যাচার, গিবত, চোগলখুরি ও প্রতারণার মতো অন্যায় থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখাই আত্মিক পরিচ্ছন্নতা। আজকের আলোচনা শুধু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা নিয়ে— আমাদের জানা বিষয়গুলো নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য।

পরিপাটি মানে পরিকল্পিত, গোছানো ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে কাজ করা। রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন ও বাধাহীন হলে চলাচলের গতি বাড়ে, যাতায়াতে সময় ও জ্বালানি কম লাগে। অল্প সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটির সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

ব্যক্তিজীবন থেকেই শুরু করা যাক। শরীর, পোশাক-পরিচ্ছদ ও পরিবারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও যথাস্থানে রাখলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে, সময় ও শ্রমও সাশ্রয় হয়।

অপরিচ্ছন্ন জিনিসপত্রের ব্যবহার ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণ হতে পারে। ঘরের জিনিসপত্র যথাস্থানে না রাখলে প্রয়োজনের সময় সেগুলো খুঁজে পেতে সময় নষ্ট হয়। এতে বিরক্তি বাড়ে, পারিবারিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি কাঁচের গ্লাস, খাবারের প্লেট বা তেলের ড্রামের মতো জিনিস এলোমেলো করে রাখলেও দুর্ঘটনা বা ক্ষতি হতে পারে।

সময়ের অপচয় শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি পেশাগত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও বাধাগ্রস্ত করে।

এরপর আসে সামাজিক পরিচ্ছন্নতা। বাসা, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও চলাচলের রাস্তাঘাট পরিষ্কার, গোছানো ও পরিপাটি না থাকলে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। যানজটে কর্মজীবী মানুষের প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত নষ্ট হতে পারে। হাজার হাজার মানুষের হারানো কর্মঘণ্টা ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিরও ক্ষতি।

রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনাও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে যাওয়া কিংবা ইটের টুকরোয় আঘাত পাওয়া— এমন ঘটনা খুবই সাধারণ। রাস্তায় অপরিকল্পিতভাবে মালামাল রাখা, অবৈধ পার্কিং, নর্দমা, খাল ও জলাশয় অপরিষ্কার রাখাও নগরজীবনের জন্য বড় সমস্যা।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন এবং নর্দমা, খাল ও জলাশয়ের অপরিচ্ছন্নতা রোগবালাই বাড়ায়। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকলে অসুস্থতা কমবে, চিকিৎসা খাতের ব্যয়ের চাপও কমতে পারে।

উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, পরিচ্ছন্নতা, পরিপাটি পরিবেশ ও শৃঙ্খলা নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ আমরা পরিচ্ছন্নতাকে অনেক সময় শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে দেখি। বাস্তবে এর সঙ্গে অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ঢাকার মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। শহরের রাস্তাঘাট, ফুটপাত, নর্দমা ও জনপরিসর অপরিচ্ছন্ন থাকলে তার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্য, চলাচল, কর্মঘণ্টা ও অর্থনীতির ওপর।

এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন।

আমাদের অনেকের ধারণা— আমার যেখানে ইচ্ছা বা সুবিধা, সেখানেই ময়লা ফেলব; যেখানে ইচ্ছা গাড়ি পার্ক করব; যেখানে ইচ্ছা দোকান বসাব—এটাই আমার অধিকার। অথচ এর মাধ্যমে আমরা অন্যের স্বাস্থ্যকর, সুস্থ ও বাধাহীন পরিবেশে চলাচলের অধিকার হরণ করছি। এটি অধিকার নয়, অন্যায়।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।” (সুরা: বাকারা, আয়াত: ২২২)

এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিস বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে। এর সর্বোত্তম শাখা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। লজ্জা ঈমানের একটি শাখা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)

অপর এক হাদিসে বলা হয়েছে, “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)

রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা যদি ঈমানের অংশ হয়, তাহলে রাস্তায় ময়লা ফেলা বা অন্যের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা নিছক অসচেতনতা নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

আমার নিজের দেখা দুটি ঘটনা বলি। একদিন পাবনা যাওয়ার পথে মানিকগঞ্জে আসরের নামাজ আদায়ের জন্য একটি মসজিদের অজুখানায় গেলাম। দেখলাম, পানি নিষ্কাশনের লাইনে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। ময়লা পরিষ্কার না করে তার ওপরই সাবানদানি রাখা হয়েছে এবং দুর্গন্ধ দূর করতে দেওয়া হয়েছে ন্যাপথালিন। ভাবুন, আমাদের বোঝাপড়ার অবস্থা কোথায়!

আরেক সফরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে দেখলাম, নীল ডাস্টবিন রয়েছে; কিন্তু অনেকে ময়লা ফেলছেন তার বাইরে। এমন দৃশ্য আমাদের চারপাশেই দেখা যায়।

এক জুনিয়র সহকর্মীর কাছে শোনা আরেকটি ঘটনা আরও শিক্ষণীয়। আফ্রিকার একটি দেশে সরকারি কাজে কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা দূতাবাসের গাড়িতে বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কর্মকর্তা গাড়ির জানালা খুলে বিস্কুট বা চিপসের মোড়ক বাইরে ফেলে দেন।

চালক সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে পিছনে গিয়ে মোড়কটি তুলে নেন। কোনো কথা না বলে আবার গাড়ি চালাতে শুরু করেন। একজন চালকের এই দায়িত্ববোধ থেকে আমাদের কি কিছুই শেখার নেই?

আমাদের অনেকের প্রত্যাশা, সম্ভব হলে সিটি করপোরেশনের লোকজন যেন আমাদের বাসাবাড়ির আঙিনাও পরিষ্কার করে দেন। কিন্তু নাগরিকরা নিজের দায়িত্ব পালন না করলে বর্জ্য অপসারণে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ বাড়বে সরকারি ব্যয়, যার চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়বে।

তাই প্রশ্ন হলো— আমরা নিজের দায়িত্ব পালন করব, নাকি সেই দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে?

নাগরিকদের দায়বদ্ধ করতে না পারলে শহর-বন্দর কখনোই পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হবে না।

এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রবন্ধ থাকা দরকার। সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি রাখা যেতে পারে। শৈশব থেকেই শিশুদের নিজেদের বিছানা, পড়ার টেবিল, বই-খাতা, পোশাক ও ব্যবহৃত স্থান পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

তবে পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। রাষ্ট্রকেও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

ফুটপাত, মার্কেট, দোকান, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, স্টেশনসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব এলাকা পরিষ্কার রাখার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। প্রতিটি দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সামনে নির্দিষ্ট ময়লার পাত্র এবং বর্জ্য সাময়িক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবে শাস্তির আগে ব্যাপক জনসচেতনতা ও পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

মফস্বল এলাকাতেও নির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্র থাকা দরকার। নির্ধারিত সময়ে সরকারি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্জ্যবাহী গাড়ি সেখান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করবে। এতে রাস্তার পাশে ময়লা ফেলার প্রবণতা কমবে।

বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।

নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার করা যেতে পারে। ‘ক্লিন কেয়ার’ অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা কোথায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে, তার ছবি বা ভিডিওসহ তথ্য দিতে পারছেন। বর্জ্য জমা দিলে চাল, ডাল, তেল ও লবণ দেওয়ার উদ্যোগও নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার একটি পদ্ধতি।

ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের শনাক্ত ও জরিমানা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও কার্যকর করা যেতে পারে। নগর ব্যবস্থাপনায় ই-রিকশার মতো উদ্যোগও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সফলতাও জনসম্পৃক্ততার ওপর নির্ভরশীল।

পরিচ্ছন্নতা কোনো বিলাসিতা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পরিবেশ মানুষের চলাচলের গতি বাড়ায়, কর্মঘণ্টা বাঁচায়, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।

তাই ‘পরিচ্ছন্ন পরিপাটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি’— এটিকে রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনগণ— তিন পক্ষই দায়িত্বশীল হলে গড়ে উঠবে সুস্থ পরিবার, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও গতিশীল অর্থনীতি। আর সেই পথেই আমরা পেতে পারি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ।

লেখক: চাকরিজীবী ও সমাজচিন্তক

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement