প্রথম শ্রেণিতেই ভর্তি পরীক্ষা সমতার পরিপন্থি, নিম্নবিত্তদের জন্য চ্যালেঞ্জ

রাশেদা কে চৌধূরী

স্কুলে লটারির পরিবর্তে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালুর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষাব্যবস্থার সমতা বিধান ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

লটারি পদ্ধতিটি ত্রুটিমুক্ত না হলেও এর একটি ইতিবাচক দিক ছিল যে লটারির ফর্ম পূরণ করে ঢাকার যেকোনো নামি-দামি স্কুলে যেকোনো আর্থ-সামাজিক অবস্থার মানুষের সন্তান ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করতে পারত। এই পদ্ধতি শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের জন্যও ভিকারুননিসা বা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ নিশ্চিত করেছিল। লটারি পদ্ধতি বাতিল হয়ে গেলে সমতার এই সুযোগও আমরা হারিয়ে ফেলব।

প্রাথমিক স্তরে, বিশেষ করে ছয় বছরের শিশুদের ওপর ভর্তি পরীক্ষার চাপ চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ এই বয়সে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা ছাড়া বাইরের জগত সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। তাছাড়া শিশুরা তো শেখার জন্যই স্কুলে যাবে। সেখানে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই তাদের পরীক্ষার মুখোমুখি করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। আবার এর মাধ্যমে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার মতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়া হবে। বিশেষ করে এসব পরিবারের অনেকেরই লেখাপড়ার সুযোগই হয়নি, কী করে তারা সন্তানদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করবে, তা বোধগম্য নয়।

প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার অর্থ— শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে তাদের শৈশব কমিয়ে দেওয়া। অথচ শিক্ষা যেখানে সবার অধিকার, সেখানে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপকে পরীক্ষার মাধ্যমে শুরুতেই বাদ দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সমীচীন নয়।

সবার জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেটি যতদিন নিশ্চিত না করা যায় ততদিন লটারি পদ্ধতিটি অন্তত একটি অন্ধের যষ্টি হিসেবে চালু ছিল। এখন সেই সুযোগটি বন্ধ করে দিয়ে নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ার পথ রুদ্ধ করা হলো কি না, তা ভেবে দেখা দরকার।

এ সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তড়িঘড়ি করেও নেওয়া হয়েছে। সবে মার্চ মাস, বলতে গেলে বছর শুরু। নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি আগামী জানুয়ারিতে। ফলে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর আগে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অংশীজন ও বিশেষ করে অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হতো। নাগরিক সমাজও সরকারকে এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারত। কিন্তু সেই সুযোগ আমাদের দেওয়া হয়নি।

এখন যেটা হবে, এ সিদ্ধান্তের ফলে কোচিং বাণিজ্য ফের রমরমা হয়ে উঠবে। হয়তো দুয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকা শহরে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির কোচিং করানোর পোস্টার দেখা যাবে। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। অতীতে নকল বন্ধের চ্যালেঞ্জেও তিনি সফল হয়েছিলেন। তবুও এবারে প্রথম শ্রেণি থেকেই ভর্তি পরীক্ষার বিশাল চ্যালেঞ্জটি তিনি কীভাবে মোকাবিলা করবেন, তার জন্য কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ আমরা দেখিনি।

অতীতে লটারিতে ভর্তির পরও স্কুলগুলো নানা ধরনের অতিরিক্ত ফি চার্জ করত, যার বিরুদ্ধে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম আদালতে যেতে। সেখানে অনেক স্কুল বাড়তি ফি ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল। ভর্তি ফি ও ভর্তি বাণিজ্য যেখানে একটা ব্যাধির মতো সমাজকে অসুস্থ করে রেখেছে, সেখানে এই নতুন সিদ্ধান্ত কতটা শিক্ষার্থী হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ থেকে যায়।

শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অভিজ্ঞদের মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা বিগত সময়ে দেখা গেছে, বর্তমান সিদ্ধান্তটিও সেই একই ধারার কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ পরিস্থিতির বিকল্প হিসেবে আলাপ-আলোচনা করলে অনেক ভালো পথ বেরিয়ে আসত। বিশেষ করে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা স্কুল জোনিং সিস্টেম শক্তিশালী করা যেত। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে এই নিয়মেই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থী যে এলাকায় বাস করে সে এলাকার স্কুলেই তাকে ভর্তি করতে স্কুলগুলো কোন অজুহাত দিতে পারে না।

বর্তমানে ক্যাচমেন্ট এরিয়া কোটা ৪০ শতাংশ আছে, এটিকে বাড়িয়ে ৮০ শতাংশ করা যেত। এতে নামি স্কুলে ভর্তি হওয়ার অসম প্রতিযোগীতা ও মাত্রাতিরিক্ত ভিড় সামলানো সহজ হতো।

আদর্শ বিকল্প হলো— প্রতিটি বাচ্চার জন্য তার নিজ এলাকাতেই ভালো স্কুল নিশ্চিত করা। কারণ বর্তমানে জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থী ভালো কলেজে স্থান পায় না। এ ছাড়া লটারির ৪০ শতাংশ কোটার বিষয়টি অনেকের কাছেই অজানা থাকায় স্কুল ম্যানেজিং কমিটির অনিয়মের কারণে অনেক অভিভাবক এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোর জন্য নাগরিক সমাজের মূলত তিনটি প্রধান প্রস্তাবনা আছে।

প্রথমত, একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা, যেখানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হবে, যেন কোনো শিক্ষার্থী বঞ্চিত হলে সে সরাসরি আদালতের আশ্রয় নিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে ভারতের মতো ‘এডুকেশন সেস’ এর মাধ্যমমে একটি শিক্ষা সহায়তা তহবিল প্রবর্তন করতে হবে, যা জনগণের অর্থে মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করবে।

তৃতীয়ত, একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে, যারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনার কাজ তদারকি করবে।

হুটহাট করে প্রথম শ্রেণিতেই শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা চালুর বদলে অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা গেলে সেটিই বরং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

লেখক: গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১১ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে