গুপ্ত শক্তি সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

স্বদেশ-স্বাধীনতার মাহাত্ম্য আবারও স্বমহিমায় বহাল হোক— এই আশায় বুক বাঁধি। তবে নানা আশঙ্কাও আছে। কারণ, চারপাশের বর্ণচোরারা গত দেড়-দুই বছরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের গৌরবময় মাহাত্ম্যে কালিমা ছড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ একাত্তরের অর্জন— স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মটাই মানেনি। যারা গুপ্ত শক্তির পর্দা সরিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল, তাদের এখন কী হবে?

এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক বর্ণচোরা সুযোগ বুঝে নিজেদের মগজে, মনে, মজ্জায় বাপ-দাদার পরাজয়ের গ্লানির লুকানো নানা ঘাতক অস্ত্র দিয়ে রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও স্বদেশ-স্বাধীনতাকে দাঁত-নখরে রক্তাক্ত করেছে। যারা স্বাধীনতার ৫৪ বছরের অর্জনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে চারপাশের পরিবেশ দুর্গন্ধময়, ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত করেছে হাজারো স্বদেশীর হৃদয় তারা কি এবার নিজেদের প্রকাশিত স্বরূপ লুকিয়ে আবারও গুপ্ত শাখা-শক্তির গহীন আঁধারে মিশে যাবে?

আবার কি তারা বড় আসন, সুযোগ-সুবিধা, রাষ্ট্রের ভোগের সিন্ডিকেটে জায়গা করে নেবে? আমরা যারা এরই মধ্যে তাদের ভয়াল দাঁত-নখরের আঁচড়ে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত, ট্রমাগ্রস্ত— আমরা কি আবার সেই শ্বাপদদের ভণিতা পরিবর্তন দেখব?

আমাদের চোখের সামনে বহু রূপে বর্ণচোরা নতুন খোলস পরে চারপাশে সুশীল কিংবা শক্তিধর সেজে দাঁড়াবে— স্বদেশ-স্বাধীনতা, একাত্তরের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছরের রাষ্ট্র বাংলাদেশের গৌরবময় মাহাত্ম্য ও অর্জনের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস-ঘৃণা ছড়াবে— এই কলঙ্ক তারা ঢাকবে কীভাবে?

নাকি আমরা, স্বাধীনতা একাত্তরের সম্মুখ লড়াইয়ের গৌরবের ধারক-বাহকরাই লজ্জায় মুখ লুকাব? কারণ স্বদেশের শত্রু সেই শ্বাপদদের চেনা সত্ত্বেও তাদের কৃতকর্ম আড়াল করে উলটো মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা এরই মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

তবে কি এখনো বন্ধুর পথে অনেক দূর যেতে হবে? রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধী, স্বদেশ-স্বাধীনতার বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ের ছদ্মবেশীদের প্রকাশিত স্বরূপ আবারও ঢেকে দেওয়ার দায়িত্ব কি তাদেরই সুবিধাবাদী সহযোগীরা নিয়ে নেবে?

এখন সামনের কিছু জরুরি চ্যালেঞ্জ

  • গত ১৫-১৬ মাসে স্বদেশ-স্বাধীনতা ও একাত্তরের চেতনার বিরুদ্ধে যে আঘাত এসেছে, তা সম্পূর্ণ ধুয়ে-মুছে রাষ্ট্র বাংলাদেশের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
  • গত ১৫-১৬ মাসে রাষ্ট্র বাংলাদেশে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, সেই ক্ষতের সমাধান ও করণীয় নির্ধারণ করা।
  • স্বদেশ-স্বাধীনতা তথা বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়ে রাষ্ট্র বাংলাদেশের শত্রু-মিত্রদের চিনে রাখা এবং সে অনুযায়ী দেশকে রক্ষা করার বৃহৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।
  • গত ১৫-১৬ মাসে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির নানা কৌশল ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সজাগ থাকা— কে, কারা, কীভাবে এই নিশ্চয়তায় দায়িত্ব নেবেন, সেটি নির্ধারণ করা।
  • স্বাধীনতাবিরোধী ছাত্র বা রাজনৈতিক শক্তি সুযোগ পেলেই আবার রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের গৌরব ধ্বংসের লীলায় মাতবে না— এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়ার কেউ আছে কি?
  • এরই মধ্যে সুবিধাবাদী চরিত্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাধীনতা-পক্ষের মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ আছে কি?
  • এরই মধ্যে চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ঘৃণিত স্বরূপ ঢাকতে যারা তৎপর, তাদের ব্যাপারেও সাবধান থাকা জরুরি।

রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ভাষা আন্দোলন ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়। এই দীর্ঘ সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে জনগণের ম্যান্ডেটকে গুরুত্ব দিতে হবে। তা উপেক্ষা করলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে।

তাই রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের গৌরবময় মাহাত্ম্যের সঙ্গে যারা বেইমানি করেছে, তাদের চিনে রাখা জরুরি। তাদের মিষ্টি কথার বর্ণচোরা ফাঁদে পা দেবেন না। কারণ তারা এরই মধ্যেই তাদের ধারালো দাঁত-নখর দেখিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

আজ হয়তো তা গুটিয়ে রেখেছে, কিন্তু অস্ত্র তারা ফেলে দেয়নি— সুযোগ পেলেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে রাষ্ট্র বাংলাদেশের শরীর ও স্বাধীনতার পক্ষে মানুষের মননকে রক্তাক্ত করবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বিকৃত ইতিহাস, অনুর্বর জাতি, অসুস্থ মস্তিষ্ক

বিপরীতভাবে, ইতিহাস যখন বিকৃত হয়— ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অবহেলার কারণে— তখন একটি জাতি ধীরে ধীরে তার শেকড় হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে বিদ্যমান।

৪ দিন আগে

অমর একুশের বইমেলা: সত্যিই কি প্রাণের কথা বলে?

অর্থাৎ এ পর্যন্ত তিনবার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে; এবারেরটি হবে চতুর্থ। তবে নির্বাচনের কারণে বইমেলা কখনো বন্ধ থাকেনি। ১৯৭৯ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা চলেছে। ১৯৯১ সালেও মেলা চলেছে পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে। ১৯৯৬ সালেও একই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ১৯৭৯ সালের মেলাটি কিছুটা ব্যতিক

৫ দিন আগে

আমরা সবাই গাধা…

যতদিন শাসনব্যবস্থা মানুষকে রাজকীয় যন্ত্রের বিনিময়যোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য করবে, ততদিন এ দেশ বহু রাজার, শোষিত প্রজার দেশ হয়েই থাকবে— আর নাগরিকরা চিরকালই গলা মিলিয়ে গান গাইতে বাধ্য হবে— আমরা সবাই গাধা…

৮ দিন আগে

নির্বাচনের তিন দিন আগে এমন চুক্তি না করলে কি মাথায় বাজ পড়বে?

প্রকৃতপক্ষে দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি থাকত, তাহলে সরকার এর ব্যাখ্যা দিতে পারত। আমরা জাতীয় উন্নয়ন বা অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক দেখি না।

১০ দিন আগে