ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড: সম্ভাবনা কি ফসকে যাচ্ছে?

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা
আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২১: ৫৭

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম বয়সের (১৫-৬৪ বছর) এবং প্রায় ৩০ শতাংশই কিশোর-কিশোরী ও তরুণ। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি বিরল সুযোগ— ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। অর্থাৎ, যখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি হয়, তখন উৎপাদন, উদ্ভাবন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। জনসংখ্যাবিদদের মতে, ২০৪০ সালের পর ধীরে ধীরে এই সুবিধা কমতে শুরু করবে। ফলে বর্তমান সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে— এই সময়কে আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারছি?

জনমিতিক লভ্যাংশ কেবল সংখ্যার বিষয় নয়

শুধু তরুণ মানুষের সংখ্যা বেশি হলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পাওয়া যায় না। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম কিংবা আয়ারল্যান্ড তাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের অভাব, দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই সুযোগ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ নয়, বরং ‘ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন’-এ পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটছে— সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

আন্দোলনমুখর শিক্ষার্থী সমাজ: কী বার্তা দিচ্ছে?

গত কয়েক বছরে দেশের শিক্ষার্থীরা একের পর এক আন্দোলনে নেমেছে। কোটা সংস্কার, নিরাপদ সড়ক, বিশ্ববিদ্যালয় সংকট, ভর্তি পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষা, এমনকি সম্প্রতি বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন নিয়েও তারা প্রতিবাদ করেছে।

গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদ নাগরিক অধিকার। শিক্ষার্থীরা অন্যায়, বৈষম্য বা অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বলবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন প্রতিবাদই নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন সেটি শিক্ষা, মানসিক বিকাশ এবং দক্ষতা অর্জনের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে দীর্ঘ সময় কাটানো, পরীক্ষা পেছানো, শিক্ষাবর্ষের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক মেরুকরণ তরুণদের ভবিষ্যৎকে জটিল করে তোলে।

এই বাস্তবতা জনমিতিক লভ্যাংশের জন্যও উদ্বেগের কারণ।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে?

সম্প্রতি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পরবর্তীতে এইচএসসি বা সমমানের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। অর্থাৎ, ভর্তি হলেও তারা মাঝপথে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আবার ফরম পূরণ করেও পরীক্ষা দিচ্ছে না চার থেকে পাঁচ শতাংশ শিক্ষার্থী।

প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কোথায় যাচ্ছে?

কেউ কর্মসংস্থানের সন্ধানে, কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিতে, কেউ পারিবারিক সংকটে, আবার কেউ হতাশা, আসক্তি বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে শিক্ষা ছেড়ে দিচ্ছে। এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কোনো ডেটাবেজ, দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান বা নীতিগত মূল্যায়ন খুব একটা চোখে পড়ে না।

একটি দেশ যখন জানেই না তার শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণরা কোথায়, কী করছে এবং কী ঝুঁকিতে রয়েছে— তখন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি: দক্ষতার হাতিয়ার, নাকি বিভ্রান্তির মাধ্যম?

বাংলাদেশের তরুণরা প্রযুক্তি ব্যবহারে অত্যন্ত দ্রুত। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ।

যদি প্রযুক্তি হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রোগ্রামিং, গবেষণা, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, ভাষা শিক্ষা বা উদ্ভাবনের মাধ্যম, তবে সেটি অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। কিন্তু যদি অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় উদ্দেশ্যহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংঘাত বা আসক্তিমূলক বিনোদনে, তবে একই প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতার পরিবর্তে সময় ও মনোযোগ নষ্ট করবে।

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে দক্ষতাহীন তরুণদের জন্য শ্রমবাজার আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

জুলাই ২০২৪-এর পর নতুন বাস্তবতা

জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। সেই আন্দোলনে তরুণদের সাহস, নেতৃত্ব ও সংগঠনের ক্ষমতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে।

কিন্তু আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তরুণদের দ্রুত শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা।

ইতিহাস বলে, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রগুলো সাধারণত তরুণদের শিক্ষা ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে ফিরে যেতে উৎসাহিত করে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উত্তেজনা কোনো সমাজের জন্য টেকসই নয়।

বাংলাদেশেও সেই রূপান্তরের প্রয়োজন ছিল এবং এখনও রয়েছে।

পরিবার ও সমাজের নীরব সংকট

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে পরিবারে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের আচরণ, পড়াশোনায় অনীহা, অতিরিক্ত অনলাইন নির্ভরতা, রাগ, অসহিষ্ণুতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এই সংকটের সবটাই রাজনৈতিক নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক পরিবর্তন, পারিবারিক যোগাযোগের দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রভাব।

এসব বিষয়ে সমন্বিত গবেষণা, কাউন্সেলিং এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিমালা এখন সময়ের দাবি।

কী বলছেন গবেষক?

যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক-গবেষক রবিউল আলমের মতে, জুলাই-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষক, শিক্ষার্থী-অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাঁর পর্যবেক্ষণে, অনেক তরুণের মধ্যে যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিবর্তে আবেগপ্রবণতা ও অস্থিরতা বেড়েছে। এটি সামাজিক সহনশীলতা ও মূল্যবোধের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

তার মতে, এখনও সময় আছে। তরুণদের শক্তিকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করতে শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, উদ্ভাবন, ক্রীড়া এবং দক্ষতা উন্নয়নে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করতে হবে।

এখন কী করা প্রয়োজন?

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এজন্য কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি—

  • শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায়ে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা,
  • দক্ষতা উন্নয়নকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা,
  • প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতিভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ,
  • শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবা জোরদার করা,
  • শান্তিপূর্ণ নাগরিক অংশগ্রহণ ও নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা,
  • গবেষণাভিত্তিক যুবনীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা।

শেষ কথা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস, নদী কিংবা পোশাকশিল্প নয়— সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই প্রজন্মকে যদি দক্ষ, উদ্ভাবনী ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে জনমিতিক লভ্যাংশ দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস বদলে দিতে পারে। কিন্তু যদি শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, বেকারত্ব, অস্থিরতা, দক্ষতার ঘাটতি ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিভাজন অব্যাহত থাকে, তবে এই একই তরুণ জনগোষ্ঠী সম্ভাবনার পরিবর্তে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কোনো স্বয়ংক্রিয় অর্জন নয়। এটি অর্জন করতে হয় সুশাসন, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের ইতিবাচক শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সামনে এখনও সেই সুযোগ রয়েছে। এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

পুঁজিবাজার ধনাত্মক ধারায়: ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতা ও আস্থাহীনতার পর দেশের পুঁজিবাজার আবার ধনাত্মক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। জাতীয় বাজেটে কর-সুবিধা ও নীতি-সহায়তার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে দৃশ্যমান। তবে এ ইতিবাচক ধারা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

১৪ দিন আগে

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটুকু সহায়ক?

ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতিসুদহার ১০ শতাংশ (অপরিবর্তিত) এবং এসএলএফ ১১ শতাংশ (অপরিবর্তিত) রাখা হয়েছে। তবে এসডিএফ ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এ নীতির ফলে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি কমবে, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে শুরু করবে।

১৪ দিন আগে

ভাষা ও রাজনীতি— কী শেখাচ্ছেন এই প্রজন্মকে?

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো— এই ভাষা কেবল বেনামি অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পী, শিক্ষক, লেখক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও জনপ্রিয় অনলাইন ব্যক্তিত্বদের মধ্যেও এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে কী ধরনের ভাষা ও সংস্কৃতির উদাহরণ রেখে যাচ্ছি?

১৫ দিন আগে

বিশ্বকাপের উল্লাস: বিনোদন ও বিশ্বাসের সীমারেখা

কিন্তু যখন এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে ধর্মীয় প্রতীক, ঈমানের পরিচয় কিংবা পবিত্র বিশ্বাসকে বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানো হয়, তখন বিষয়টি আর শুধুমাত্র খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন এটি বিবেক, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

১৫ দিন আগে