বইমেলা দেড় মাস এগিয়ে আনা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত

সাঈদ বারী
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১: ৫৮

অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি মেলা নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তার প্রতীক, ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় স্মৃতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে ওঠে বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির মিলনমেলা।

কিন্তু বৃহস্পতিবার ঘোষণা এসেছে— দেড় মাস এগিয়ে ১৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে মাসব্যাপী একুশে বইমেলা। এ সিদ্ধান্ত লেখক, প্রকাশক ও পাঠকমহলে তীব্র প্রশ্ন ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এটি নিছক একটি সময়সূচির পরিবর্তন নয়, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে অযৌক্তিকভাবে বিপন্ন করার প্রয়াস।

লেখকদের সংকট

বছরের শেষ প্রান্তে লেখকরা সাধারণত তাদের নতুন বইয়ের কাজ শেষ করেন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতেও অনেকে পাণ্ডুলিপি লিখেন, সম্পাদনা করে চলেন। হঠাৎ সময় এগিয়ে দিলে অধিকাংশ বই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যারা কোনোভাবে শেষ করবেন, তাদের বইও তাড়াহুড়ো করে প্রকাশকের হাতে যাবে।

এর ফলে প্রুফরিডিং, সম্পাদনা, কভার ডিজাইন— সবই হবে অগোছালো ও মানহীন। অথচ একটি বইয়ের পূর্ণতা কেবল লেখকের কলমে নয়; প্রুফ সংশোধন, কভার নির্মাণ, নান্দনিক মুদ্রণ— সব মিলিয়েই বই হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ। এই প্রক্রিয়া সংকুচিত হলে সৃজনশীলতার মান ক্ষুণ্ণ হওয়াই স্বাভাবিক।

প্রকাশকদের দুরবস্থা

প্রকাশনা শিল্প এ দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও প্রাণবন্ত খাতগুলোর একটি। মেলা দেড় মাস আগে হলে প্রকাশকরা পড়বেন চরম চাপের মুখে। সীমিত সময়ে বিপুল পরিমাণ বই ছাপাতে গিয়ে ছাপাখানায় অস্বাভাবিক ভিড় হবে, ছাপার ভুল বাড়বে।

এর সঙ্গে যুক্ত হবে প্রচারের সীমাবদ্ধতা। কোনো বই পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন বাজারজাতকরণ, আলোচনার সৃষ্টি ও প্রচার। সময় সংকোচনের কারণে সেই কাজ হবে অপ্রতুল, ফলে বিক্রিও প্রভাবিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন লেখক ও প্রকাশক উভয়েই।

পাঠকের হতাশা

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে পাঠকের। তাড়াহুড়া করে ছাপানো বই হবে মানহীন— বানান ভুল, অস্পষ্ট ছাপা, খারাপ বাঁধাই কিংবা অনুজ্জ্বল কভার বইকে পাঠকের কাছে আকর্ষণহীন করে তুলবে। মেলায় এসে পাঠক যদি হতাশ হন, তবে তাদের আগ্রহ ও আস্থা কমে যাবে। এতে বইমেলার প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।

যৌক্তিক প্রশ্ন

তাহলে প্রশ্ন জাগে— কোন যুক্তিতে মেলার সময় এগিয়ে আনা হলো? লেখক, প্রকাশক, পাঠক— সবার স্বার্থের পরিপন্থি এ সিদ্ধান্তে সাংস্কৃতিক অঙ্গন কীভাবে উপকৃত হবে?

বরং যদি মেলা ৮ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাসব্যাপী আয়োজন করা হয়, তবে লেখক-প্রকাশক পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারবেন, মানসম্মত বই প্রকাশ হবে, পাঠকও পাবেন এক প্রাণবন্ত উৎসবের স্বাদ।

একুশের চেতনা ও বইমেলা

অমর একুশে বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি। একুশের শহিদরা শিখিয়েছেন— সত্য, শৃঙ্খলা ও মান রক্ষায় আপস করা যায় না। তাই বইমেলাও হতে হবে যথাযথ পরিকল্পনা ও সততার সঙ্গে। বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম বা অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত একুশের চেতনার পরিপন্থি।

অমর একুশে বইমেলা আমাদের জাতির ইতিহাস ও চেতনার ধারক। এখানেই লেখক তাদের চিন্তা ও সাহিত্যকর্ম পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন, আর পাঠক খুঁজে পান জ্ঞানের নতুন দিগন্ত। মেলা হয়ে ওঠে মুক্তচিন্তা, নতুন ধারার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার উৎসব। তাই মেলাকে প্রাণবন্ত ও মর্যাদাপূর্ণ রাখতে যথেষ্ট প্রস্তুতি অপরিহার্য।

অতএব একুশে গ্রন্থমেলাকে দেড় মাস এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিছক ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও গৌরবের উপর অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ। এই তড়িঘড়ি আয়োজনের ফলে বইমেলার মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

আমাদের দাবি স্পষ্ট— বইমেলার সময় দেড় মাস এগিয়ে আনার পরিবর্তে পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমে ৮ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা আয়োজন করা হোক। তবেই আমরা ভাষা শহিদদের যথার্থ শ্রদ্ধা জানাতে পারব এবং একুশের চেতনায় সমুজ্জ্বল রাখব অমর একুশে বইমেলাকে।

লেখক: প্রধান নির্বাহী, সূচীপত্র

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

আমরা সবাই যখন লুটেরা— একটি আত্মসমালোচনার সময়

গণপরিবহন, শ্রমবাজার, কৃষি— প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত উৎপাদক বা ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, শ্রমিক তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পান না, কিন্তু মধ্যবর্তী একটি শ্রেণি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে লাভবান হয়। এটি একটি অসম অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিফলন।

৫ দিন আগে

আমাদের প্রেস-লেখক-পাঠক প্রস্তুত, এখন সময় নীতিমালা প্রস্তুতের

প্রকাশক ও উদ্যোক্তা প্রকৌশলী মেহেদী হাসান অমিকন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং বাংলাপ্রকাশ ও লেকচার পাবলিকেশন্স পিএলসির প্রকাশক। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প ও অমর একুশে বইমেলা নিয়ে রাজনীতি ডটকমের মুখোমুখি হয়েছেন জ্ঞান-অর্থনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা মেহেদী হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহরিয়ার শরিফ।

৮ দিন আগে

ঈদের দিন: কোরআন-হাদিসে বর্ণিত আমল ও তাৎপর্য

ঈদুল ফিতর কেবল একটি উৎসব নয়; এটি একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, একটি নৈতিক শিক্ষা, একটি সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। কোরআন ও হাদিসের আলোকে যদি আমরা ঈদের দিনকে যথাযথভাবে পালন করতে পারি, তাহলে এটি আমাদের জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

৯ দিন আগে

ঈদযাত্রায় স্বস্তির খোঁজে

ঈদযাত্রার ভোগান্তি কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়, এটি একটি ব্যবস্থাগত দুর্বলতার ফল। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। অভিযান নয়, প্রয়োজন একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো— যেখানে নিয়মই হবে প্রধান নিয়ন্ত্রক, ব্যক্তি নয়।

৯ দিন আগে