বাংলাদেশের ওপর ২ যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব

সাইমন মোহসিন

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সূচনায় একই সময়ে দুটি যুদ্ধের ঝড় উঠেছে— ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সরাসরি হামলা এবং আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক প্রতিক্রিয়া। এ দুই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল, অর্থনৈতিক প্রবাহ এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের মতো আমদানি ও রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই দ্বিগুণ ঝুঁকি নিছক ভূরাজনৈতিক সংবাদ নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা।

বাংলাদেশ এই দুই সংকটের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অভিঘাতের পরিধির ভেতরেই অবস্থান করছে। সর্বোত্তম পরিস্থিতিতে যদি সংঘাতগুলো সীমাবদ্ধ থাকে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বিস্তারে না গড়ায়, তবে ঢাকা তার দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশল বজায় রাখতে পারবে— কঠোর কোনো পক্ষ না নিয়ে পশ্চিমা অংশীদার, উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখে।

এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ উদ্যোগগুলো চলমান থাকবে, জ্বালানি বাজার প্রাথমিক অস্থিরতার পর স্থিতিশীল হবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাবও মোটামুটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকবে। তবে সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তখন উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি অর্থনৈতিক— বিশেষ করে জ্বালানি নির্ভরতার কারণে। প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর তেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের দামের যেকোনো স্থায়ী বৃদ্ধি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াবে, ভর্তুকির চাপ বাড়াবে এবং এমন সময়ে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করবে, যখন অনেক পরিবার এরই মধ্যে চাপে রয়েছে।

যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়ে বা উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়, তাহলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে দ্রুত মূল্যচাপ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর প্রতিক্রিয়া খাদ্যদ্রব্যের দাম, উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।

রেমিট্যান্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ক্ষেত্র। উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় সেখানে অর্থনৈতিক মন্দা, নিরাপত্তায় বিঘ্ন বা শ্রমবাজার সংকোচন হলে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর বা উপসাগরীয় নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে সামুদ্রিক বিমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাত— বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।

দীর্ঘতর সরবরাহ সময় ও উচ্চতর লজিস্টিক ব্যয় এমন এক সময়ে চাপ তৈরি করবে, যখন বৈশ্বিক চাহিদাই অনিশ্চিত। অর্থাৎ বাংলাদেশের ঝুঁকি যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটতা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি, শ্রম ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে গভীর সংযুক্তির মধ্যেই নিহিত।

দেশীয় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে সংঘাত কত দূর গড়ায় তার ওপর। যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত থাকে, তবে বাংলাদেশে জনমত আবেগপ্রবণ হলেও তা ব্যবস্থাপনাযোগ্য পর্যায়ে থাকবে এবং সরকার আন্তর্জাতিক আইন ও সংযমের আহ্বান জানিয়ে তার প্রচলিত অবস্থান বজায় রাখতে পারবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে রাজপথে বিক্ষোভ, আদর্শিক উত্তেজনা এবং অনলাইন উগ্র বর্ণনার বিস্তার ঘটতে পারে।

তবে বাস্তবে বড় ঝুঁকি মতাদর্শ নয়, অর্থনৈতিক অভিঘাত। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি থেকে যদি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ে, তাহলে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট, রপ্তানি খাতে শ্রম অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হতে পারে।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকার মূল চ্যালেঞ্জ হবে ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত পরিবেশে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে পশ্চিমা প্রত্যাশা, উপসাগরীয় সংবেদনশীলতা এবং চীনা কৌশলগত আগ্রহ— সব দিক থেকেই চাপ বাড়তে পারে।

একই সময়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা হিসাবকে জটিল করতে পারে এবং আঞ্চলিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের গতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত অনুমান হলো— সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সরাসরি সামরিক নয়; বরং বাজার, অভিবাসন ও জনমতের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আসবে।

স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো সীমাবদ্ধ কিন্তু স্থায়ী অস্থিরতা। যদি ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা উপসাগরীয় বড় সংকটে রূপ নেয় এবং একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়া অস্থির থাকে, তবে বাংলাদেশ আবারও তীব্র বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই সংঘাত থেকে উদ্ভূত বহুমাত্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা। সীমিত উত্তেজনার ক্ষেত্রে দেশে প্রভাব নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকবে; তবে যদি সংকট বিস্তৃত হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে, তাহলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের ক্ষতি, বাণিজ্য ব্যাঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়বে।

এই পরিস্থিতিতে ঢাকার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা হলো সতর্ক কূটনীতি, অর্থনৈতিক সংযম এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যচাপের নিবিড় পর্যবেক্ষণ। ইতিহাস প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য কোনো বিকল্প নয়— এটাই দেশের স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম স্বার্থের একমাত্র নিরাপত্তার মানদণ্ড।

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) হঠাৎ করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক (OPEC) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে।

৫ দিন আগে

রাষ্ট্রনায়কের সততা ও নেতৃত্বই টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি

সুশাসন, যাকে আমরা রাষ্ট্রপরিচালনার কার্যকর পদ্ধতি বলি, সেটি মূলত সেই কাঠামো যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নীতিমালা বাস্তবায়ন ও নাগরিক সেবার মান নির্ধারিত হয়। যখন এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক উন্নয়ন এক

৫ দিন আগে

শ্রমজীবীদের অধিকার কিতাবে থাকলেও গোয়ালে নেই

পহেলা মে এক দিনের আন্দোলনের ফসল নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে কিছুটা প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে এই দিনে। কাজেই ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ শ্রমিকের মর্যাদা বৃদ্ধি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন।

৬ দিন আগে

দখলদারির ছাত্র রাজনীতি ও নতুন বাংলাদেশের শঙ্কা

বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একসময়ের মিত্র জামায়াত-শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে যে সংঘাত চলছে, তা কিছুটা একাত্তরের বিভাজন বা আদর্শিক হলেও এর মূল কারণ ‘দখলদারি’। ছাত্র রাজনীতির উপযোগিতা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।

৮ দিন আগে