মহাকাশ

ডার্ক ম্যাটার কী আলো কিংবা বরফের মতো?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

বিশ্বজগৎ আমাদের চোখে যেমন দেখা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি রহস্যময়। আমরা যা দেখি—তারা, গ্রহ, গ্যালাক্সি—এসবের ভর বা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়ে মহাবিশ্বের গতি বা আচরণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞানীরা তাই বহুদিন ধরেই ধারণা করে আসছেন, ‘ডার্ক ম্যাটার’ নামে এক অদৃশ্য বস্তু আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। চোখে দেখা যায় না, স্পর্শ করা যায় না, আলো বা শক্তি বিকিরণ করে না—তবু তার প্রভাব ছড়িয়ে আছে মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণে।

এই রহস্যময় পদার্থটির উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের দুই পদার্থবিজ্ঞানী গুয়ানমিং লিয়াং ও রবার্ট কল্ডওয়েল একটি নতুন ও চমকপ্রদ তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, ডার্ক ম্যাটার আসলে এমন কণার তৈরি, যেগুলো বিগ ব্যাংয়ের পর প্রথম দিকে ছিল একেবারেই ভরহীন—আলোর মতো দ্রুতগতিতে ছুটে বেড়ানো কণা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এরা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে গিয়ে ভারী হয়ে ওঠে এবং মহাবিশ্বে ঘনীভূত বস্তু হিসেবে রূপ নেয়।

এই ধারণাটি প্রচলিত ডার্ক ম্যাটার তত্ত্বের সঙ্গে একেবারেই বিপরীত। রবার্ট কল্ডওয়েলের ভাষায়, “এটা ডার্ক ম্যাটার নিয়ে প্রচলিত চিন্তার ঠিক বিপরীত। সাধারণত ডার্ক ম্যাটারকে মনে করা হয় ঠান্ডা ও ভারী কণার সমষ্টি, কিন্তু আমরা বলছি এটি প্রথমে ছিল আলো বা আলোর মতো দ্রুত কণা।”

এই তত্ত্বের ভিত্তি রয়েছে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগের ঘটনা—যখন মহাবিশ্ব ছিল দাঁতের ফাঁকে আটকে যাওয়া একটি ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো ছোট। সে সময় মহাবিশ্বে চলছিল কোয়ান্টাম পার্টি—সব ধরনের কণা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিল, এক বিশাল শক্তি ও গতি নিয়ে। পদার্থবিজ্ঞানীদের পরিচিত ন্যাম্বু-জোনা-লাসিনিও (Nambu–Jona-Lasinio) মডেল অনুযায়ী, তখনকার কিছু ‘ডির্যাক ফার্মিয়ন’ (Dirac fermion) নামের কণা একত্রে জোড়া বাঁধতে পারত, অনেকটা সুপারকন্ডাক্টরের ইলেকট্রন জোড়ার মতো।

গুয়ানমিং লিয়াং ও রবার্ট কল্ডওয়েলের গবেষণায় নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তাপমাত্রার ভারসাম্যহীনতা বিবেচনা করা হয়েছে। তাঁদের মতে, যদি কিছু উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন ডির্যাক ফার্মিয়ন কণার মধ্যে সঙ্গতিহীনতা থাকে, তাহলে তারা নিজেদের অতিরিক্ত শক্তিকে ভরে রূপান্তরিত করে ঠান্ডা ও ধীরগতির কণায় পরিণত হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় গরম কণা যেন রূপ নেয় শিলাবৃষ্টির মতো বরফকণায়।

গুয়ানমিং লিয়াং বলেন, “আমাদের গাণিতিক মডেলের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—এটি যেভাবে শক্তির হঠাৎ পতন ঘটিয়ে উচ্চ-ঘনত্ব থেকে নিম্ন শক্তির ডার্ক ম্যাটারে পরিণত হয়, সেটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল।”

এই তত্ত্বটি একটি নতুন প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারে—বিগ ব্যাংয়ের সময় যে বিশাল পরিমাণ শক্তি ছিল, তার বেশিরভাগ কোথায় গেল? লিয়াং ব্যাখ্যা করেন, “ডার্ক ম্যাটারের ঘনত্ব থেকেই মহাবিশ্বের কাঠামোগত ভর তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এমন একটি প্রক্রিয়াও থাকা দরকার, যেখানে শক্তির ঘনত্ব নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। আমাদের মডেলটা এই দুটি বিষয়কে খুব সরলভাবে একত্রে ব্যাখ্যা করে।”

তাঁর মতে, এই মডেলের সৌন্দর্য হলো এর সরলতা—এটি কার্যকর করতে আলাদা করে বড় কোনো কাঠামো বানাতে হয় না, বরং মৌলিক কণাগুলোর আচরণ থেকেই সব ব্যাখ্যা করা যায়।

তবে শুধু সুন্দর তত্ত্ব হলেই চলবে না, সেটি পরীক্ষিত হতে হবে। ভালো খবর হলো—এই তত্ত্ব পরীক্ষার সুযোগ বর্তমান বৈজ্ঞানিক উপাত্তেই আছে। মহাবিশ্বের প্রাচীনতম আলো বা ‘কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড’-এ যদি এই কণাগুলোর ঠান্ডা হওয়ার প্রমাণ থাকে, তাহলে এই তত্ত্বের পক্ষে বড় ধরনের যুক্তি তৈরি হবে।

রবার্ট কল্ডওয়েল বলেন, “এটি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। আমরা ডার্ক ম্যাটার নিয়ে চিন্তার এক নতুন পথ দেখাচ্ছি, এবং সম্ভবত এটি শনাক্ত করারও উপায় দিচ্ছি।”

এ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস’ নামের একটি স্বনামধন্য বিজ্ঞান জার্নালে। ডার্ক ম্যাটার নিয়ে পৃথিবীর নানা গবেষণাগার ও মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় নতুন করে উত্তেজনার সঞ্চার হয়েছে এই তত্ত্বকে ঘিরে। ভবিষ্যতে এই তত্ত্ব প্রমাণিত হলে, আমরা হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটির পর্দা উন্মোচন দেখতে পারব।

এখনকার মতো আমাদের বুঝতে হবে—যা এক সময় আলোর গতিতে ছুটে বেড়াত, সেটাই হয়তো ঠান্ডা হয়ে আমাদের চারপাশে ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে। আর সেই অদৃশ্য ছায়াই নিয়ন্ত্রণ করছে পুরো মহাবিশ্বের ভারসাম্য।

সূত্র: ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

জোছনা আর হারিকেন-কুপির আলোয় জমল হারানো পুঁথি পাঠের আসর

বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমেও মানুষের আগ্রহে কমতি নেই। আয়োজকরা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ, আর উঠোনে কুপি ও হারিকেনের আলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক আবহ।

২৫ দিন আগে

প্রেমের নাটক-সিনেমার নির্মাণ-সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে আইনি নোটিশ

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সামাজিক নৈরাজ্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দেশে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং পারি

২৭ আগস্ট ২০২৬

এথিকের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়ন ২২ আগস্ট, বিশেষ প্রদর্শনী

এথিকের প্রথম প্রযোজনা ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ নতুন আঙ্গিকে নির্দেশনা দিয়েছেন মিন্টু সরদার। নাটকটির শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে মঞ্চ ও নেপথ্যে যুক্ত থাকা ১০০ জন কলাকুশলীকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে।

২০ আগস্ট ২০২৬

বাংলা নাটকের রূপকার সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯৪৯ সালের এ দিনে সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা মরহুম ফিরোজা খাতুন।

১৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement