ডিজিটাল সেবা

প্রথম অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট: কতটা বদলেছে সেবার চিত্র?

শানজীদা শারমিন

বাংলাদেশের নাগরিক সেবা এখন এক নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করছে—প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব। এই রূপান্তরের অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে ই-পাসপোর্ট সেবা, যা সাধারণ মানুষের পাসপোর্ট প্রাপ্তিকে করে তুলেছে আগের চেয়ে অনেক সহজ, দ্রুত এবং আধুনিক।

রংপুরের ফাতেমা জামান একজন দৃঢ়চেতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী; চোখে তার উচ্চশিক্ষার আলোর দ্যুতি, আর মনে এক অন্যরকম দূরত্ব পেরোনোর ইচ্ছে। সুইডেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ পাওয়ায় জীবনে প্রথমবার পাসপোর্ট করতে হয় তাকে।

আরেকজন ঢাকার রাশেদ শাহনেওয়াজ ব্যবসার ব্যস্ততা টেনে চলা এক পরিণত মানুষ; যার পুরনো পাসপোর্ট একসময় বহু গন্তব্যের সঙ্গী ছিল, এবার সময় এসেছে সেটিকে নবায়ন করার—একটু দ্রুত, একটু সহজে, পরিবারের কথা মাথায় রেখে।

এই দুইজনই বন্ধু ও স্বজনদের পরামর্শে অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করেন।

প্রথম ধাপ: অনলাইন আবেদন

দুজনেই আবেদন করেন www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে।

ফাতেমা প্রথমবার পাসপোর্ট করতে গিয়ে বাংলায় লেখা স্পষ্ট নির্দেশনা ও ‘ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন’ বোতামে ক্লিক করে সহজেই অ্যাকাউন্ট খোলেন।

রাশেদ নবায়নের জন্য নির্দিষ্ট অপশন ব্যবহার করেন। পুরনো পাসপোর্ট নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিলে আগের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফর্মে চলে আসে। নতুন করে কেবল পেশা ও বর্তমান ঠিকানা যোগ করতে হয়।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড

ফাতেমা আপলোড করেন—

  • জাতীয় পরিচয়পত্র (এটি না থাকলে ফাতেমার অবশ্য জন্ম সনদ বা এসএসসি সার্টিফিকেটের স্ক্যান কপি দেওয়া লাগতো)।
  • জন্ম সনদের স্ক্যান কপি
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি (JPEG, 40mm x 50mm, সর্বোচ্চ 300 KB)
  • ইউটিলিটি বিলের স্ক্যান কপি

ছবির ফরম্যাট ফাতেমার অবশ্য কিছু সমস্যা হয়। সেটি তিনি জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে ফোন করেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পান।

রাশেদ আপলোড করেন—

  • পুরনো পাসপোর্টের স্ক্যান কপি (প্রথম পৃষ্ঠা)
  • নতুন ছবি
  • জাতীয় পরিচয়পত্রের স্ক্যান কপি

বর্তমান ঠিকানা লিখতে গিয়ে রাশেদও একটি ছোট ভুল করেন। ভুল তথ্য সংশোধনে রাশেদ লাইভ চ্যাটে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিক সমাধানও পান।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া

ফাতেমা রংপুর পাসপোর্ট অফিসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেন। নির্ধারিত দিনে অফিসে গিয়ে আঙুলের ছাপ, ছবি ও চোখের স্ক্যান দেন—পরিবেশ ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সেবামুখী।

রাশেদ ঢাকার আগারগাঁও অফিসে দুপুরের একটি স্লট বেছে নেন। ব্যক্তিগত ও পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও এই প্রক্রিয়াটি সহজ ও দ্রুত হওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট হন।

ফি পরিশোধ ও রসিদ গ্রহণ

ফাতেমা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অনলাইনে ফি পরিশোধ করেন এবং মোবাইলে রসিদের কনফার্মেশন পান।

রাশেদ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে সরকারি গেটওয়ের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করেন এবং রসিদ ডাউনলোড করে রেখে দেন।

ওয়েবসাইটে ফি এবং প্রক্রিয়াকরণের সময় দুইজনের কারও চোখই এড়ায় না স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা তথ্য- সাধারণ প্রসেসিংয়ে ২১ থেকে ৩০ দিন এবং এক্সপ্রেস প্রসেসিংয়ে ৭ থেকে ১০ দিন।

স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং ও পাসপোর্ট সংগ্রহ

ফাতেমা ওয়েবসাইটে ট্র্যাকিং নম্বর ব্যবহার করে আবেদন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন। এক সময় এসএমএসে জানতে পারেন তার পাসপোর্ট প্রস্তুত।

রাশেদও ওয়েবসাইটে লগইন করে তার পাসপোর্টের প্রস্তুতির সর্বশেষ অবস্থা জেনে যান এবং নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন।

এই প্ল্যাটফর্মটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও তথ্য সংরক্ষণে অত্যন্ত সুরক্ষিত। সরকারি পরিবেশে এমন প্রযুক্তিসম্পন্ন সেবা এই দুইজনের কাছেই ছিল স্বপ্নের মতো।

সবাইকে সঙ্গে নেওয়ার প্রচেষ্টা

যেসব অঞ্চলে ইন্টারনেট বা প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বলতা রয়েছে, সেখানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) থেকে সহায়তা নিয়ে ই-পাসপোর্ট আবেদন করা সম্ভব।

এর বাইরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের উদ্যোগে ১০০-রও বেশি সরকারি সেবা নিয়ে চালু হচ্ছে ‘নাগরিক সেবা বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন আউটলেট। চলমান ডিজিটাল সেন্টারগুলোকেও এতে যুক্ত করা হবে। সেখানেও পাওয়া যাবে উল্লিখিত সেবাটি। ফলে, প্রযুক্তির সুবিধা কেবল শহরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে এই পরিবর্তন।

ই-পাসপোর্ট এখন শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়, বরং নাগরিক অধিকার চর্চার একটি আধুনিক রূপ।

ফাতেমার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এবং রাশেদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যে নির্ভরতা তারা এই সেবার ওপর রেখেছেন, সেটি তথ্যপ্রযুক্তিকে বাংলাদেশের সরকারি সেবার রূপান্তরেরই সরকারি সেবার রূপান্তরেরই গল।

এই সেবা শুধু সময় বা খরচ কমায়নি—এটি নাগরিকের আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন আর রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি করেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গড়ে উঠছে এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে লাইনের অপেক্ষা নয়, বরং ক্লিকেই ছোঁয়া যায় গন্তব্য।

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

জোছনা আর হারিকেন-কুপির আলোয় জমল হারানো পুঁথি পাঠের আসর

বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমেও মানুষের আগ্রহে কমতি নেই। আয়োজকরা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ, আর উঠোনে কুপি ও হারিকেনের আলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক আবহ।

১৮ দিন আগে

প্রেমের নাটক-সিনেমার নির্মাণ-সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে আইনি নোটিশ

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সামাজিক নৈরাজ্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দেশে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং পারি

১৯ দিন আগে

এথিকের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়ন ২২ আগস্ট, বিশেষ প্রদর্শনী

এথিকের প্রথম প্রযোজনা ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ নতুন আঙ্গিকে নির্দেশনা দিয়েছেন মিন্টু সরদার। নাটকটির শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে মঞ্চ ও নেপথ্যে যুক্ত থাকা ১০০ জন কলাকুশলীকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে।

২০ আগস্ট ২০২৬

বাংলা নাটকের রূপকার সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯৪৯ সালের এ দিনে সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা মরহুম ফিরোজা খাতুন।

১৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement